সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
Home Blog Page 6

পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারে ৮১% পর্যন্ত দরবৃদ্ধির সম্ভাবনা

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারে ৪৪ থেকে ৮১ শতাংশ পর্যন্ত দরবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে বিনিয়োগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএএল বাংলাদেশ। ব্যাংক খাতে সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণ কার্যক্রমে পুনরুদ্ধার ঘটলে আর্থিকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকগুলো বেশি ঋণ বিতরণ ও বাজার হিস্যা বাড়ানোর সুযোগ পাবে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ক্ষেত্রে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংককে সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

‘ব্যাংকিং অন দ্য নেক্সট সাইকেল’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে সিএএল বাংলাদেশ বলেছে, সম্পদের গুণগত মান, মূলধন পর্যাপ্ততা, তহবিল সংগ্রহের সক্ষমতা এবং ঋণ বিতরণের সামর্থ্য বিবেচনায় ১৪টি ব্যাংক চলমান সংকট মোকাবিলা করে পরবর্তী প্রবৃদ্ধির ধাপে প্রবেশের জন্য তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষায়, এসব ব্যাংক ‘সাইকেল-রেডি’ বা ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত। ব্যাংক খাতের আর্থিক পুনর্বিন্যাসের ফলে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ঋণ কার্যক্রম পরিচালনায় চাপে পড়বে, তখন শক্তিশালী ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণে বাড়তি সুযোগ পেতে পারে।

গত ৫ অক্টোবরের শেয়ারদরকে ভিত্তি ধরে পাঁচ ব্যাংকের সম্ভাব্য লক্ষ্যদর নির্ধারণ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ারের লক্ষ্যদর ১১৭ টাকা ৪৫ পয়সা। ওই দিন শেয়ারটির সমাপনী দর ছিল ৬৫ টাকা। সে হিসাবে সম্ভাব্য দরবৃদ্ধি ৮০ দশমিক ৭ শতাংশ। সিটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে ২৯ টাকা ৭০ পয়সা সমাপনী দরের বিপরীতে লক্ষ্যদর নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮ টাকা ৩৬ পয়সা। এতে সম্ভাব্য দরবৃদ্ধি ৬২ দশমিক ৮ শতাংশ।

এ ছাড়া ইস্টার্ন ব্যাংকের শেয়ারের লক্ষ্যদর ৩৪ টাকা ৩৮ পয়সা, যা ২২ টাকা ৮০ পয়সা সমাপনী দরের তুলনায় ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের শেয়ারের লক্ষ্যদর ৬৭ টাকা ২৫ পয়সা, যেখানে ভিত্তিমূল্য ছিল ৪৫ টাকা ৫০ পয়সা। এতে সম্ভাব্য দরবৃদ্ধি ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে, ৩৮ টাকা ৮০ পয়সা সমাপনী দরের বিপরীতে পূবালী ব্যাংকের লক্ষ্যদর ৫৫ টাকা ৮৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে শেয়ারটির সম্ভাব্য দরবৃদ্ধি ৪৪ শতাংশ। এসব হিসাবের মধ্যে নগদ লভ্যাংশ থেকে সম্ভাব্য আয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

ব্যাংক খাতের সামগ্রিক দুর্বলতার মধ্যেও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার পেছনে ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশন সংরক্ষণের কঠোর নীতিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে সিএএল বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এসব নীতির ফলে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার পার্থক্য আরও স্পষ্ট হচ্ছে। যেসব ব্যাংকের সম্পদের মান ভালো, মূলধন পর্যাপ্ত এবং আমানত সংগ্রহের সক্ষমতা বেশি, তারা তুলনামূলক দুর্বল ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে আমানত ও ঋণগ্রহীতা আকৃষ্ট করতে পারে।

গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রভিশন ঘাটতি ছিল ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। সংকটে থাকা ১০টি ব্যাংকের কাছে কেন্দ্রীভূত ছিল মোট খেলাপি ঋণের ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ, ব্যাংক খাতের সম্পদের গুণগত সমস্যার বড় অংশ নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত রয়েছে। এর বিপরীতে, সিএএল বাংলাদেশের চিহ্নিত ১৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের মধ্যম অনুপাত ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।

এই ১৪ ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ছিল ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ, যা গবেষণায় বিবেচিত ১২ দশমিক ৫ শতাংশের মানদণ্ডের চেয়ে বেশি। ওই মানদণ্ডের অতিরিক্ত মূলধনের পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির ধারণা, অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি ফিরে এলে এবং ঋণের চাহিদা বাড়লে এই অতিরিক্ত মূলধন ঋণ বিতরণ সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে।

সিএএল বাংলাদেশের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ১২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে ২০২৬ সালের জুনের তুলনায় বেসরকারি খাতের ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। এই সম্ভাব্য ঋণ সম্প্রসারণের ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ আসতে পারে গবেষণায় চিহ্নিত ১৪টি ব্যাংক থেকে। ফলে ঋণের চাহিদা পুনরুদ্ধার হলে এসব ব্যাংকের আয় ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়তে পারে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ঋণ কার্যক্রমের পুনরুদ্ধার শুরুতে ব্যক্তি পর্যায়ের ঋণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (এসএমই) অর্থায়ন, ভোক্তা ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে গতি আসতে পারে। পরবর্তী সময়ে করপোরেট ঋণ, আমদানি অর্থায়ন এবং বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং সেবার চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব খাতে আগে থেকেই শক্তিশালী অবস্থানে থাকা ব্যাংকগুলো তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেতে পারে।

ব্যাংকভিত্তিক বিশ্লেষণে ব্র্যাক ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি, এসএমই খাতে শক্তিশালী অবস্থান এবং মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশে অংশীদারত্বকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে সিএএল বাংলাদেশ। সিটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ড, পেমেন্ট সেবা ও খুচরা ব্যাংকিং ব্যবসা ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধির সুফল এনে দিতে পারে। ইস্টার্ন ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওতে পর্যাপ্ত প্রভিশন এবং লেনদেনভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রমকে প্রবৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

অন্যদিকে, পূবালী ব্যাংকের দেশজুড়ে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঋণ সম্প্রসারণে সুবিধা দিতে পারে। ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের কম খরচের আমানত সংগ্রহ এবং বিস্তৃত বিতরণ নেটওয়ার্ককে অতিরিক্ত তারল্য ঋণে রূপান্তরের সক্ষমতা হিসেবে দেখছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। এসব বৈশিষ্ট্য ব্যাংকগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণ ও মুনাফা বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে জোরালো করতে পারে।

তবে ব্যাংক খাতের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ঝুঁকিমুক্ত নয় বলে সতর্ক করেছে সিএএল বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি লোকসানে ছিল। এ ছাড়া ১৯টি ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত আইনগত ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে গিয়েছিল। দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংকট থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে চাপ ছড়িয়ে পড়া, তারল্য ব্যবস্থাপনায় সমস্যা এবং সামগ্রিক আস্থার সংকট শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সুদহারের সীমাবদ্ধতাও ব্যাংকগুলোর মুনাফায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ঋণ ও আমানতের ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার বিধান কার্যকর হলে ব্যাংকগুলোর নিট সুদ আয় বা নেট ইন্টারেস্ট মার্জিন সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৫৫টি ব্যাংকের সুদহারের ব্যবধান নির্ধারিত সীমার ওপরে ছিল। এর মধ্যে ‘সাইকেল-রেডি’ হিসেবে চিহ্নিত ১৪টি ব্যাংকের ১৩টিও রয়েছে। ফলে আর্থিকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোকেও সুদ আয় ও তহবিল ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষায় বাড়তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।

এ ছাড়া বড় করপোরেট ঋণগ্রহীতাদের কাছে ঋণ কেন্দ্রীভূত থাকাও গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। কোনো বড় ঋণ পুনর্গঠন বা পুনঃশ্রেণীকরণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে অতিরিক্ত প্রভিশন রাখতে হতে পারে। এতে মুনাফা কমে যাওয়ার পাশাপাশি মূলধনের ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ব্যাংক খাতের সংস্কার ও ঋণ প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারে উল্লেখযোগ্য দরবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে সিএএল বাংলাদেশ। তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত লক্ষ্যদর নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি, ঋণের প্রকৃত চাহিদা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, সুদহারের পরিবর্তন এবং ব্যাংকগুলোর সম্পদের মানের ওপর নির্ভর করবে এসব সম্ভাবনার বাস্তবায়ন। ফলে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শেয়ারের মূল্যায়নের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন ও ঝুঁকিগুলোও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

দারিদ্র্য-বৈষম্যে চাপে অর্থনীতি

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
বাংলাদেশের অর্থনীতির সহনশীলতা নিয়ে প্রশংসা থাকলেও এর আড়ালে বাড়ছে দারিদ্র্য, আয়বৈষম্য ও সাধারণ পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা। স্থবির বিনিয়োগ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং রফতানি খাতে সীমিত বহুমুখীকরণ অর্থনীতির অন্তর্নিহিত দুর্বলতাকে আরও প্রকট করে তুলছে। সরকারি দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে থাকা বিপুলসংখ্যক মানুষ যেকোনো অর্থনৈতিক অভিঘাতে আবার দারিদ্র্যের মুখে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নতুন পরিকল্পনা বা কমিশন গঠনের পরিবর্তে দ্রুত কাঠামোগত সংস্কার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গত শনিবার বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) প্রকাশনা ‘স্টেট অব দ্য রিয়েল ইকোনমি: ডাইনামিকস অব রিভার্সালস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এসব উদ্বেগ উঠে আসে। অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত গবেষণায় দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি, আয়বৈষম্য বৃদ্ধি এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ার চিত্র তুলে ধরা হয়।
পিপিআরসির গবেষণা অনুযায়ী, দেশে মাঝারি দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২৭ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ, মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে চরম দারিদ্র্যের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অন্যদিকে, ব্যয়ভিত্তিক গিনি সহগ ২০২২ সালের শূন্য দশমিক ৩৩৪ থেকে বেড়ে শূন্য দশমিক ৪৩৬-এ পৌঁছেছে। আয় ও সম্পদের বণ্টনে বৈষম্য বৃদ্ধির পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রার মানের ব্যবধানও যে বাড়ছে, এসব পরিসংখ্যানে তার প্রতিফলন ঘটেছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট পরিবারের প্রায় ১৮ শতাংশ, এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, যাদের আয় দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে। প্রকৃত আয় না বাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য এবং চিকিৎসাসহ অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এই জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। ফলে সামান্য আয়হানি, চাকরি হারানো কিংবা আকস্মিক চিকিৎসা ব্যয়ও তাদের দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, দেশের অর্থনীতি এখন পরিবারগুলোর আর্থিক দুর্দশা, দুর্বল মূলধনী বিনিয়োগ এবং মন্থর প্রবৃদ্ধির একটি কাঠামোগত ফাঁদে আটকে রয়েছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এটি কেবল সাময়িক অর্থনৈতিক মন্দার সমস্যা নয়; বরং অর্থনীতির বিদ্যমান কাঠামো ও নীতিগত দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকট। এ অবস্থায় নতুন কমিশন গঠন কিংবা আরও নীতিপত্র তৈরির পরিবর্তে মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
পরিবারের আর্থিক সংকটের অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় অর্ধেক পরিবারের অন্তত একজন সদস্য দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত। নিয়মিত ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে এসব পরিবারের আয়ের বড় অংশ খরচ হয়ে যাচ্ছে। এতে সঞ্চয়ের সুযোগ কমছে, দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো কঠিন হচ্ছে এবং ঋণনির্ভরতা বাড়ছে। ফলে চাকরি হারানো, অসুস্থতা কিংবা মূল্যস্ফীতির মতো আকস্মিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার আর্থিক সক্ষমতাও অনেক পরিবারের অবশিষ্ট নেই।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি। গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির গতি কম থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের সামান্য ওপরে থাকতে পারে এবং পরবর্তী কয়েক বছরও প্রবৃদ্ধির গতি দুর্বল থাকার আশঙ্কা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি উচ্চপর্যায়ে থাকলে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়বে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগের মতো কার্যকরভাবে দারিদ্র্য কমাতে পারছে না। বিশ্বব্যাংকের গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি জানান, বাংলাদেশে দারিদ্র্য নিরসনে প্রবৃদ্ধির স্থিতিস্থাপকতা প্রায় শূন্য দশমিক ৯, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় প্রায় ১ দশমিক ৫। অর্থাৎ, প্রবৃদ্ধির সঙ্গে দারিদ্র্য হ্রাসের যে সম্পর্ক থাকার কথা, বাংলাদেশে তা তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
এ কারণে শুধু মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে অর্থনীতির সাফল্য বিচার না করে প্রবৃদ্ধির কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র এবং সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রভাব মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, আয়বৈষম্য কমানো এবং প্রবৃদ্ধির সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো এখন অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
আয়বৈষম্যের গভীরতা বোঝাতে তিনি পালমা অনুপাতের বিষয়টিও তুলে ধরেন। সমাজের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের আয়ের সঙ্গে সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশ মানুষের আয়ের তুলনামূলক চিত্র নির্দেশক এই অনুপাত ২০২২ সালের ৩ দশমিক ২ থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৭ হয়েছে বলে জানান তিনি। এর অর্থ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলমান থাকলেও তার সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না।
অর্থনীতির এই দুর্বলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্থবিরতা। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে না পারলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আদায় কম থাকায় সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ানোও কঠিন হয়ে পড়ছে। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, সরকারের উন্নয়ন ও সামাজিক প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও রাজস্ব সংগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হবে।
শ্রমবাজারের সংকটও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। বিশ্বব্যাংকের উপাত্তের বরাত দিয়ে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ২৯ শতাংশ। শিক্ষার সঙ্গে শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের চাহিদার অসামঞ্জস্য এবং দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি তরুণদের কর্মসংস্থানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার, শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাক্রমের সমন্বয় এবং উৎপাদনশীল খাতে বহুমুখীকরণের ওপর জোর দেন তিনি।
রফতানি খাতের সীমিত বহুমুখীকরণও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে উঠে এসেছে। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, দুই দশক ধরে তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন রফতানি খাত গড়ে তোলার আলোচনা চললেও কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট রফতানিতে তৈরি পোশাকের অংশ আগে ৭৩ থেকে ৭৫ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৮৪ থেকে ৮৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

চামড়া, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তিসহ সম্ভাবনাময় অন্যান্য খাতকে বিকল্প রফতানি উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সেগুলোর সক্ষমতা প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। একটি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার পরিবর্তন, বাণিজ্যনীতি কিংবা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় দেশের রফতানি আয়কে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এ কারণে নতুন রফতানি খাত গড়ে তোলার পাশাপাশি কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকেও বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন এফবিসিসিআই প্রশাসক। তাঁর মতে, শুধু ডিগ্রি বা সনদনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে কর্মসংস্থানের সংকট দূর করা সম্ভব নয়। প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সাফল্য কতজন প্রশিক্ষণার্থী বাস্তবে চাকরি পাচ্ছেন বা উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হচ্ছেন, তার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি অনুমোদন ও সেবা পেতে দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দ্রুত, স্বচ্ছ ও ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জঁ পেম অর্থনীতির প্রধান দুর্বলতাগুলো কাটাতে বাণিজ্য, সরকারি অর্থব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি খাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, বেসরকারি খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য শ্রমবাজার ও শিক্ষাব্যবস্থাকে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
অন্যদিকে, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের দুরবস্থার বিষয়টি তুলে ধরেন। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা না থাকায় এই খাতের শ্রমিকদের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। তৈরি পোশাক খাতে নারীদের কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে কৃষি ও পরিবেশবান্ধব খাতে বিকল্প কর্মসংস্থান, শিশু যত্নকেন্দ্র এবং লিঙ্গসংবেদনশীল বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. এম এ সাত্তার মণ্ডল বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেলেই দেশের অর্থনীতি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে—এমন ধারণার ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। আন্তর্জাতিক অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা দূর করতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কৃষির আধুনিকায়নে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। রাসায়নিক সার ও বীজের ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সামগ্রিক দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বাংলাদেশের সামনে বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রতিযোগিতা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে শুধু বাণিজ্যসুবিধার ওপর নির্ভর করে রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে। পণ্যের গুণগত মান, উৎপাদনশীলতা, দক্ষ জনশক্তি ও নতুন বাজার তৈরির সক্ষমতাই ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠবে।
সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি তৈরি, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং শাসনব্যবস্থার সংস্কার—এই পাঁচটি স্তম্ভের ভিত্তিতে সমন্বিত উত্তরণকালীন সমঝোতা বা ‘ট্রানজিশন কমপ্যাক্ট’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে পিপিআরসি।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, বাংলাদেশের বর্তমান সংকট শুধু প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবারের ক্রমবর্ধমান আর্থিক অনিরাপত্তা, কর্মসংস্থানের ঘাটতি, আয়বৈষম্য, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। এসব সমস্যার সমাধানে নীতিগত ঘোষণা ও পরিকল্পনার পাশাপাশি বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার, কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় অর্থনীতির সহনশীলতার আড়ালে জমে থাকা চাপ আরও গভীর সংকটে রূপ নিতে পারে।

ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে সোনালী আঁশ, দরবৃদ্ধিতে রতনপুর স্টিল

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবস রোববার (১৮ অক্টোবর) দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনের শীর্ষে উঠে এসেছে সোনালী আঁশ। এদিন কোম্পানিটির ১৪ কোটি ৫৩ লাখ ৪২ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। অন্যদিকে, দরবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল রতনপুর স্টিল এবং দরপতনের শীর্ষে অবস্থান করেছে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ।
ডিএসইর লেনদেনের তথ্য অনুযায়ী, দিনের মোট লেনদেনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আইপিডিসি। কোম্পানিটির ১২ কোটি ৫৯ লাখ ৫০ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। ১২ কোটি ১০ লাখ ৮০ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পেপার প্রসেসিং অ্যান্ড প্যাকেজিং (পিটিএল)।
লেনদেনের শীর্ষ দশ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আরও রয়েছে এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, সোনারগাঁও টেক্সটাইলস, পূবালী ব্যাংক, সায়হাম টেক্সটাইল মিলস, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ এবং ফার্স্ট প্রাইম ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড।
এদিকে, দিনের দরবৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষে ছিল রতনপুর স্টিল। কোম্পানিটির শেয়ারদর আগের কার্যদিবসের তুলনায় ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ বা ৬০ পয়সা বেড়ে ৬ টাকা ৯০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।
দরবৃদ্ধির তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ফার্স্ট প্রাইম ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড। দিন শেষে ফান্ডটির ইউনিটদর ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ বা ২ টাকা বেড়ে ৩০ টাকা ৯০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ফিনিক্স ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটদর ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ বা ২০ পয়সা বেড়ে হয়েছে ৩ টাকা ৪০ পয়সা।
দরবৃদ্ধির শীর্ষ দশ প্রতিষ্ঠানের অন্যগুলো হলো বিআইএফসি, সোনারবাংলা ইন্স্যুরেন্স, আইপিডিসি, বিডি ফাইন্যান্স, সামোরিতা হাসপাতাল, মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজ ও সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারদর যথাক্রমে ৫ দশমিক ৮৮, ৫ দশমিক ৭৪, ৫ দশমিক ১৫, ৪ দশমিক ৭২, ৪ দশমিক ৭০, ৪ দশমিক ৩৩ ও ৩ দশমিক ৬০ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে, রোববার ডিএসইতে সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ। কোম্পানিটির শেয়ারদর ৫ দশমিক ২২ শতাংশ বা ৭০ পয়সা কমে ১২ টাকা ৭০ পয়সায় নেমেছে।
দরপতনের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা আইসিবি এএমসিএল সোনালী ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটদর ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ বা ৪০ পয়সা কমে ৭ টাকা ৯০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা সান লাইফ ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ বা ২ টাকা ৩০ পয়সা কমে হয়েছে ৪৯ টাকা ২০ পয়সা।
দরপতনের শীর্ষ দশ প্রতিষ্ঠানের অন্যগুলো হলো ন্যাশনাল পলিমার, অ্যাপোলো ইস্পাত, শুরউইড, রিজেন্ট টেক্সটাইল, ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স, গোল্ডেন সন ও ইনটেক। প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারদর যথাক্রমে ৪ দশমিক ২১, ৪ দশমিক ১৭, ৪ দশমিক ০০, ৩ দশমিক ৯২, ৩ দশমিক ৯১, ৩ দশমিক ৭৪ ও ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমেছে।

লভেলোর শেয়ার কারসাজি : ৫ পক্ষকে ৩৫.৯২ লাখ টাকা জরিমানা

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
তৌফিকা ফুডস অ্যান্ড লভেলো আইসক্রিম পিএলসির শেয়ারে সিরিজ ট্রেডিং ও কৃত্রিমভাবে দর বাড়ানোর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় একটি মার্চেন্ট ব্যাংক, একটি করপোরেট প্রভিডেন্ট ফান্ড ও তিন ব্যক্তিকে মোট ৩৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তদন্তে উঠে এসেছে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আন্তঃসংযুক্ত বিও হিসাবের মাধ্যমে কোম্পানিটির মোট লেনদেনের উল্লেখযোগ্য অংশ সম্পন্ন করে শেয়ারের দাম প্রভাবিত করা হয়েছিল।
বিএসইসির ১৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এনফোর্সমেন্ট আদেশ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৬ মে থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত লভেলোর শেয়ার লেনদেনে অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করে ডিএসই। এ সময় কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ৭৮ টাকা ৯০ পয়সা থেকে বেড়ে ৯৮ টাকা ৬০ পয়সায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ, মাত্র ৩৫ দিনের ব্যবধানে শেয়ারটির দাম বাড়ে প্রায় ২৫ শতাংশ।
ডিএসইর তদন্তে দেখা যায়, সিবিসি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড এবং লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের মালিক ঝুয়াং লিফেংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিও হিসাবের মধ্যে সমন্বিত লেনদেনের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল। এই নেটওয়ার্কে ছিল সিবিসি ক্যাপিটাল, লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড এমপ্লয়িজ কন্ট্রিবিউটরি প্রভিডেন্ট ফান্ড (ইসিপিএফ), লিজ ফ্যাশনের অর্থ প্রধান এইচ এম রুবাইয়াত, তাঁর স্ত্রী শায়লা আক্তার এবং প্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (প্ল্যানিং) রাজন কুমার সাহা।
তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আলোচ্য সময়ে লভেলোর মোট শেয়ার লেনদেনের ২২ দশমিক ৩০ শতাংশ সম্পন্ন করে। বাজারে কৃত্রিমভাবে লেনদেনের গতি তৈরি এবং শেয়ারের দাম প্রভাবিত করতে তারা ৯ লাখ ৬৭ হাজার ১২৫টি শেয়ার নিয়ে ১৩টি ম্যাচড বা সার্কুলার ট্রানজেকশন সম্পন্ন করে। এ ধরনের লেনদেনে একই ব্যক্তি বা পারস্পরিকভাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বিতভাবে শেয়ার কেনাবেচা করা হয়, যা বাজারে প্রকৃত চাহিদা ও সরবরাহ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি করতে পারে।
বিএসইসির আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব লেনদেনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো ২ কোটি ২৪ লাখ টাকার বাস্তবায়িত মূলধনি মুনাফা বা রিয়ালাইজড ক্যাপিটাল গেইন এবং ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকার অবাস্তবায়িত মূলধনি মুনাফা বা আনরিয়ালাইজড ক্যাপিটাল গেইন অর্জন করে। ফলে শেয়ারের স্বাভাবিক দর নির্ধারণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও বিভ্রান্তি তৈরির ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।
এ ঘটনায় লিজ ফ্যাশন ইসিপিএফকে সর্বোচ্চ ১৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সিবিসি ক্যাপিটালকে জরিমানা করা হয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া এইচ এম রুবাইয়াতকে ৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা, শায়লা আক্তারকে ৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং রাজন কুমার সাহাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর দুটি ধারা লঙ্ঘনের দায়ে এ জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। বিএসইসির আদেশ অনুযায়ী, কৃত্রিম ও বিভ্রান্তিকর লেনদেন সৃষ্টির দায়ে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক পক্ষের ওপর ১ লাখ টাকা করে জরিমানা ধার্য করা হয়েছে। পাশাপাশি শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ওপর অতিরিক্ত অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়।
এনফোর্সমেন্ট শুনানিতে অভিযুক্ত পক্ষগুলো নিজেদের দায় এড়াতে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরে। তাদের কেউ কেউ দাবি করেন, পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব মার্চেন্ট ব্যাংকের ওপর ন্যস্ত ছিল। কেউ সিকিউরিটিজ আইন সম্পর্কে অজ্ঞতার কথা বলেন, আবার কেউ ধর্মীয় তীর্থযাত্রার কারণে সাময়িক অনুপস্থিতির বিষয়টি সামনে আনেন। অন্যদিকে, সিবিসি ক্যাপিটালের পরিচালনা পর্ষদ দাবি করে, প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন সাময়িক বরখাস্তকৃত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার অননুমোদিত পদক্ষেপের কারণে এসব লেনদেন হয়েছিল।
তবে এসব যুক্তি গ্রহণ করেনি বিএসইসি। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির অবস্থান হলো, কোনো হিসাবধারী বা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ আইন ও বিধিবিধান মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পেতে পারে না। পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অন্য প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত করা কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অননুমোদিত পদক্ষেপের অজুহাত দেখিয়েও আইন লঙ্ঘনের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
জরিমানার অর্থ আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে বিএসইসির অনুকূলে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুঁজি বাজারে স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রাখতে শেয়ারের দাম প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে সমন্বিত লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। লভেলোর শেয়ার নিয়ে বিএসইসির এই আদেশে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায় নির্ধারণের পাশাপাশি বাজারে কৃত্রিম লেনদেনের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।

বীমা দাবির টাকা থেকে নতুন পলিসির প্রিমিয়াম কাটা যাবে না

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
বীমাগ্রহীতা বা নমিনির প্রাপ্য বীমা দাবির অর্থ থেকে নতুন পলিসির প্রিমিয়াম কাটা কিংবা বীমার টাকা পাওয়ার শর্ত হিসেবে নতুন পলিসি কিনতে বাধ্য করা যাবে না। এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মেয়াদোত্তীর্ণ বীমা দাবি, মৃত্যুদাবি ও সারভাইভাল বেনিফিটের অর্থ সম্পূর্ণভাবে বীমাগ্রহীতা বা নমিনির ব্যাংক হিসাবে এককালীন স্থানান্তর করতে হবে। প্রযোজ্য সরকারি রাজস্ব ছাড়া অন্য কোনো অর্থ বা ফি এ ক্ষেত্রে কর্তন করা যাবে না। বীমার প্রাপ্য অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে নতুন পলিসি কেনার শর্ত আরোপ কিংবা নতুন পলিসির প্রিমিয়াম বাবদ অর্থ সমন্বয় করাও নিষিদ্ধ।
আইডিআরএর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কিছু লাইফ বীমা কোম্পানি বীমা দাবি পরিশোধের সময় গ্রাহক বা নমিনিকে একই কোম্পানির নতুন পলিসি কেনার শর্ত দিচ্ছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরোনো পলিসির প্রাপ্য অর্থ থেকে নতুন পলিসির প্রিমিয়াম কেটে অবশিষ্ট টাকা গ্রাহককে দেওয়া হচ্ছে। এতে বীমাগ্রহীতাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি বীমা খাতের প্রতি গ্রাহকদের অসন্তুষ্টি বাড়ছে।
নতুন নির্দেশনায় বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে নির্ধারিত সময়সীমা মেনে চলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যে বীমা দাবির সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে নতুন পলিসি কেনার শর্ত আরোপ বা প্রিমিয়ামের অর্থ সমন্বয়ের কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের কার্যক্রমকে আইন লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তবে বীমা দাবি পরিশোধের সময়সীমা অনুযায়ী নতুন পলিসি ইস্যুর ক্ষেত্রে পৃথক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ বীমা দাবির অর্থ সম্পূর্ণ পরিশোধ করা হলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের নামে একই কোম্পানির নতুন পলিসি ইস্যুতে কোনো বাধা থাকবে না।
অন্যদিকে, নির্ধারিত ৯০ দিনের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বীমা দাবির অর্থ পরিশোধ করা হলে, অর্থ পরিশোধের সর্বশেষ তারিখ থেকে পরবর্তী ৩০ দিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের নামে নতুন পলিসি ইস্যু করতে পারবে না ওই বীমা কোম্পানি।
এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ বীমা দাবির অর্থ ১২০ দিন বা তার বেশি সময় পরে পরিশোধ করা হলে, অর্থ পরিশোধের সর্বশেষ তারিখ থেকে পরবর্তী ১৮০ দিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের নামে নতুন পলিসি ইস্যুতে নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
আইডিআরএ জানিয়েছে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে জনস্বার্থে এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। নির্দেশনাটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
নতুন এ নির্দেশনার মাধ্যমে বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে গ্রাহকের প্রাপ্য অর্থের পূর্ণাঙ্গ পরিশোধ নিশ্চিত করা এবং দাবি পরিশোধের সঙ্গে নতুন পলিসি বিক্রির শর্ত জুড়ে দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে চায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

একক অনলাইন পোর্টালে ট্রেড লাইসেন্স ও একই দিনে যৌথ পরিদর্শন – বাণিজ্যমন্ত্রী

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
ব্যবসায়ীদের সময় ও ব্যয় সাশ্রয় এবং প্রশাসনিক ভোগান্তি কমাতে একক অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স প্রদান এবং একই দিনে একাধিক সরকারি সংস্থার যৌথ পরিদর্শন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি বিদেশি কর্মীদের কাজের অনুমোদন ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র নবায়নের প্রক্রিয়া সহজ করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে লাইসেন্স সংগ্রহ এবং একই প্রতিষ্ঠানে একাধিক সংস্থার বারবার পরিদর্শনের কারণে সৃষ্ট জটিলতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আজ শনিবার সচিবালয়ের অর্থ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে ‘ন্যাশনাল টাস্ক ফোর্স অন ডিরেগুলেশন অ্যান্ড বিজনেস ফ্যাসিলিটেশন’-এর প্রথম সভায় এসব উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারি সেবা সহজ, স্বচ্ছ ও কার্যকর করার পাশাপাশি অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা এবং হয়রানি কমাতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার নেওয়া উদ্যোগ এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়।
সভায় জানানো হয়, বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন পৃথক ব্যবস্থায় ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করে। এ প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত অনলাইন পোর্টালের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা একটি নির্দিষ্ট পোর্টালে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা, আবেদন ও নির্ধারিত ফি পরিশোধের মাধ্যমে ঘরে বসেই ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করতে পারবেন।
এ ছাড়া লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ানো এবং প্রচলিত ট্রেড লাইসেন্সকে ‘বিজনেস রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট’ বা সমজাতীয় নামে রূপান্তরের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব পরিবর্তন কার্যকর হলে লাইসেন্স সংগ্রহে সময়ক্ষেপণ, প্রশাসনিক জটিলতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি কমাতে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনেও সমন্বিত ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ইনভেস্ট বাংলাদেশের নেতৃত্বে প্রস্তাবিত এ ব্যবস্থায় ভবনের নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা ও পরিবেশগত বিষয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পরিদর্শন পৃথক সময়ে না করে একই দিনে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পূর্বনির্ধারিত তারিখে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইনভেস্ট বাংলাদেশের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে যৌথভাবে পরিদর্শন করা হবে। এতে একই প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সংস্থার বারবার যাওয়ার প্রয়োজন কমবে। ফলে ব্যবসায়ীদের সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিদর্শন কার্যক্রমেও সমন্বয় বাড়বে।
সভায় আরও জানানো হয়, ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত অনুমোদন, পারমিট ও লাইসেন্স প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমে দ্বৈততা দূর করতে প্রাথমিকভাবে পাঁচটি অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব খাতে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা পর্যালোচনা করে অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য খাতেও এ উদ্যোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদেশি কর্মীদের কাজের অনুমোদন ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র নবায়নের বিদ্যমান প্রক্রিয়া নিয়েও সভায় আলোচনা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বিদেশি নাগরিকেরা বাংলাদেশে বৈধ ও নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের অধীনে কাজ করতে আসেন। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত কর পরিশোধ করে এবং তাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালকেরাও দেশের বৈধ নাগরিক। প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে দায়িত্ব নিয়ে আবেদন ও প্রয়োজনীয় প্রত্যয়ন দেওয়ার পরও নিরাপত্তা ছাড়পত্র নবায়নে অযৌক্তিক জটিলতা সৃষ্টি হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
এ সমস্যা সমাধানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বিদেশি কর্মীদের কাজের অনুমোদন এবং নিরাপত্তা ছাড়পত্র নবায়নের প্রক্রিয়া আরও সহজ, স্বচ্ছ ও কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ব্যবসা পরিচালনায় অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ, অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করা জরুরি। বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারি সেবা সহজলভ্য করার পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সভায় টাস্কফোর্সের সদস্য হিসেবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী অংশ নেন।
এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান, অর্থ বিভাগের সচিব, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি, যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) নিবন্ধক এবং অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত সেবাকে আরও গতিশীল, সহজলভ্য ও কার্যকর করতে প্রশাসনিক সংস্কার, ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ইইউ বাজারে পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১২%

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অর্থমূল্যে এ ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১৫৮ কোটি ইউরো। রপ্তানির পরিমাণ কমার পাশাপাশি পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় আয় হ্রাসের চাপ আরও বেড়েছে।
ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ১৯৩ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে ইইউ। গত বছরের একই সময়ে এ আমদানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৫০ কোটি ইউরো। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের আমদানি মূল্য কমেছে প্রায় ১৫৮ কোটি ইউরো।
পরিসংখ্যান বলছে, এ সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউর পোশাক আমদানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। তবে রপ্তানি আয়ের পতন শুধু পণ্যের পরিমাণ কমার কারণে হয়নি। পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য কমে যাওয়াও এতে বড় ভূমিকা রেখেছে। গত বছরের প্রথম আট মাসে প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য ছিল ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরোতে। অর্থাৎ, একই পরিমাণ পোশাক রপ্তানি করেও আগের তুলনায় কম আয় করছে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা।
রপ্তানির পরিমাণ ও গড় মূল্য—উভয় সূচকে নেতিবাচক প্রবণতা দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর একটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এ বাজারে আয় কমে যাওয়ার প্রভাব সামগ্রিক রপ্তানি আয়, শিল্পের মুনাফা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ওপরও পড়তে পারে।
তবে আট মাসের সামগ্রিক চিত্রের বিপরীতে আগস্ট মাসে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে ইইউর মোট পোশাক আমদানির মূল্য বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭২ শতাংশ। যদিও আমদানির পরিমাণ কমেছে শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ, গড় আমদানিমূল্য বেড়েছে ১ দশমিক ২৯ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, সাম্প্রতিক মাসে ইউরোপের পোশাক বাজারে গড় মূল্য কিছুটা বেড়েছে। তবে এক মাসের এ পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের রপ্তানি পরিস্থিতির উন্নতির ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরও তথ্য প্রয়োজন।
রপ্তানিকারকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন, প্রতিযোগী দেশের মূল্য কৌশল এবং দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাবে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির কারণে চীনের রপ্তানিকারকরা ইউরোপের বাজারে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে তারা তুলনামূলক কম দামে ক্রয়াদেশ নিচ্ছেন। এতে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের পক্ষে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, চীনের কম দামে ক্রয়াদেশ নেওয়ার প্রবণতা ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন করে তুলেছে। একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এবং উচ্চমূল্যের কারণে দেশের পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। ফলে একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে কম দামের প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয়ের চাপ—দুই দিক থেকেই রপ্তানিকারকরা চাপে রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে মুনাফা ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো নয়, রপ্তানি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও এখন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, পণ্যের গড় বিক্রয়মূল্য ক্রমাগত কমে গেলে রপ্তানির পরিমাণ বাড়লেও আয় ও মুনাফা প্রত্যাশিত হারে বাড়ে না। এ কারণে কম দামের পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উচ্চমূল্য সংযোজিত ও বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়িয়ে পণ্যের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী প্রবণতা উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বছর শেষে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই বাজার হারানোর কারণ চিহ্নিত করার পাশাপাশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
ইইউর বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগীদের পরিস্থিতি বিশ্লেষণেও রপ্তানি আয়ের এই পতনের কারণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে চীন থেকে ইইউর পোশাক আমদানি বেড়েছে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এ সময়ে দেশটি থেকে আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৭১ কোটি ইউরো। চীনের পোশাক রপ্তানির পরিমাণও বেড়েছে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। তবে দেশটির গড় রপ্তানিমূল্য কমেছে ১ দশমিক ০৪ শতাংশ। অর্থাৎ, তুলনামূলক কম দামে বেশি পরিমাণ পোশাক সরবরাহ করে চীন ইউরোপের বাজারে আয় বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে, ভিয়েতনাম থেকে ইইউর পোশাক আমদানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। দেশটি থেকে আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি ইউরো। এ সময়ে ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। কিন্তু গড় রপ্তানিমূল্য ১০ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় দেশটির মোট রপ্তানি আয় বেড়েছে। অর্থাৎ, রপ্তানির পরিমাণ কমলেও তুলনামূলক বেশি মূল্যে পোশাক বিক্রি করে ভিয়েতনাম আয় বাড়িয়েছে।
চীন ও ভিয়েতনামের এ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চীন কম দামে বেশি পণ্য বিক্রি করে আয় বাড়িয়েছে, আর ভিয়েতনাম তুলনামূলক বেশি মূল্যের পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে আয় বাড়াতে পেরেছে। বিপরীতে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ও গড় মূল্য—দুটিই কমেছে। ফলে ইউরোপের বাজারে আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
তবে ইইউর বাজারে শুধু বাংলাদেশ নয়, অন্যান্য প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক দেশও আয় কমার মুখে পড়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে তুরস্কের রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ০২ শতাংশ। দেশটি থেকে ইইউর পোশাক আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৫১০ কোটি ইউরো। ভারতের রপ্তানি আয় কমেছে ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ১১ দশমিক ০৩ শতাংশ। এ ছাড়া পাকিস্তানের আয় কমেছে ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ, মরক্কোর ৬ দশমিক ১০ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ।
এসব দেশের মধ্যে রপ্তানির পরিমাণ ও গড় মূল্যের পরিবর্তনেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। পাকিস্তানের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বাড়লেও গড় রপ্তানিমূল্য কমেছে ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। কম্বোডিয়ার রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ, কিন্তু গড় রপ্তানিমূল্য বেড়েছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। ফলে একই বাজারে বিভিন্ন দেশের রপ্তানি আয়ের পরিবর্তনের পেছনে পণ্যের পরিমাণের পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সামগ্রিকভাবে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির বর্তমান চিত্র বলছে, শুধু উৎপাদন ও রপ্তানির পরিমাণ বাড়িয়ে আগের মতো আয় বৃদ্ধি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয়, পণ্যের গুণগত মান এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে উপযুক্ত মূল্য আদায়ের সক্ষমতা—সবকিছুর ওপরই রপ্তানির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উচ্চমূল্য সংযোজিত পোশাক উৎপাদন, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও চাপে পড়তে পারে।

ব্যবসায় ১০৭ বাধা, ৩৭টিই শুল্ক-ভ্যাটে

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
দেশে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ সহজ করতে অন্তত ১০৭টি প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করেছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে ৩৭টি শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সংক্রান্ত। এ ছাড়া আয়কর, বন্ড ব্যবস্থাপনা, সরকারি অনুমোদন, বিদেশি কর্মীদের ওয়ার্ক পারমিট, ভিসা প্রাপ্তি এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার দীর্ঘসূত্রতাসহ নানা জটিলতা ব্যবসা পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) ব্যবসা সহজীকরণ বা ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সংক্রান্ত কমিটির প্রথম সভায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সামনে ব্যবসায়ীরা এসব প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরেন। সভায় কয়েকটি সমস্যা দ্রুত সমাধানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বল্প সময়ে সমাধানযোগ্য সমস্যাগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান জটিলতা ও প্রশাসনিক বাধা দূর করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ২২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত সমস্যাগুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে সমাধান এবং এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করাই কমিটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানান, ব্যবসা সহজীকরণের ক্ষেত্রে চিহ্নিত ১০৭টি সমস্যার মধ্যে ৩৭টিই শুল্ক ও ভ্যাটসংক্রান্ত। কয়েকটি সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। কমিটির প্রথম সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা এবং সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ায় ব্যবসায়ীরা আশাবাদী হয়েছেন। পরবর্তী সভায় গৃহীত পদক্ষেপগুলোর অগ্রগতি তুলে ধরা হবে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কাস্টমস, বন্ড, ভ্যাট ও আয়কর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন জটিলতা উৎপাদন ও বাণিজ্য কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। বিশেষ করে পণ্যের এইচএস কোড নির্ধারণ ও মূল্যায়নে অসংগতি, পণ্য পরীক্ষার নামে দীর্ঘসূত্রতা, বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষায় হয়রানি এবং কাঁচামালের এনটাইটেলমেন্ট অনুমোদনে জটিলতার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাড়তি সময় ও ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, এসব সমস্যার অনেকগুলো দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীদের ভোগাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হলেও কার্যকর সমাধানের ঘাটতি রয়ে গেছে। ফলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত করার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হচ্ছে না।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রমে অটোমেশনের ধীরগতি, কর ও ভ্যাটের রিফান্ড আটকে থাকা এবং নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানকে নিরীক্ষার নামে হয়রানির বিষয়ও রয়েছে। এসব জটিলতায় প্রতিষ্ঠানের অর্থ আটকে থাকার পাশাপাশি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, রাজস্ব প্রশাসনে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা কার্যকর করা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিফান্ড নিষ্পত্তি এবং নিরীক্ষা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও প্রশাসনিক জটিলতা বড় বাধা হয়ে রয়েছে। ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রূপালী চৌধুরী জানান, বিদেশি কর্মীদের ওয়ার্ক পারমিট ইস্যুতে বিলম্ব এবং ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগকারীদের সমস্যায় ফেলছে। এসব বিষয় মূলত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। বিদেশি কর্মীদের প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগলে বিনিয়োগ প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ব্যবসা পরিচালনার এসব বাধা দূর করতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সভায়। বিশেষ করে যেসব সমস্যা স্বল্প সময়ে সমাধান করা সম্ভব, সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে অনুষ্ঠেয় পরবর্তী সভায় এসব উদ্যোগের অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সভায় তাৎক্ষণিকভাবে আলোচনায় আসা উদ্যোগগুলোর মধ্যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ফায়ার ও পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমোদন পাওয়ার পরও কারখানা নির্মাণ ও কার্যক্রম শুরুর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের চূড়ান্ত ছাড়পত্রের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সময় লাগার পাশাপাশি বিনিয়োগের ব্যয়ও বাড়ে।
রূপালী চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, সভায় এ ক্ষেত্রে এমন একটি ব্যবস্থা নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যাতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় না থেকে নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে শিল্পপ্রতিষ্ঠান কার্যক্রম শুরু করতে পারে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরিদর্শন ও পরীক্ষা সম্পন্ন করে প্রতিবেদন দিতে হবে। উদ্যোগটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে অপ্রয়োজনীয় অপেক্ষা কমবে এবং নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু করা সহজ হবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের সরকারি অনুমোদনের আবেদন ও নিষ্পত্তি একটি কেন্দ্রীয় বা একক পোর্টালের মাধ্যমে সম্পন্ন করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে উদ্যোক্তাদের একাধিক দপ্তরে ঘুরতে হওয়ার প্রবণতা কমবে। একই সঙ্গে আবেদনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, নির্ধারিত সময়সীমা মেনে চলা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ হবে।
সভায় আলোচিত প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না দিলে সেটিকে অনুমোদিত হিসেবে গণ্য করার ব্যবস্থাও বিবেচনায় রয়েছে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের ধরন, নিরাপত্তা ও পরিবেশগত শর্ত এবং আইনি সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করা জরুরি। এতে ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া দ্রুত করার পাশাপাশি জনস্বার্থ ও নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডও সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত কমিটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। চিহ্নিত সমস্যাগুলো নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার কাছে পাঠিয়ে সমাধানের সময়সীমা নির্ধারণ করা গেলে দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, কমিটির কার্যক্রম শুধু সমস্যা চিহ্নিত করা ও আলোচনা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং প্রতিটি সমস্যার সমাধানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং অগ্রগতি পর্যালোচনার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। শুল্ক ও কর ব্যবস্থাপনার সংস্কার, অনুমোদন প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন, বিনিয়োগকারীদের হয়রানি বন্ধ এবং সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে দেশে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত হওয়ার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ ও শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোও সহজ হবে।

দুর্গাপূজার ছুটি সমন্বয়ে আজ ব্যাংক ও শেয়ারবাজার খোলা

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে টানা পাঁচ দিনের ছুটির সমন্বয় করতে আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও শেয়ারবাজারে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু থাকবে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ব্যাংকিং ও শেয়ার লেনদেন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে আগামী ২০ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের সব তফসিলি ব্যাংকে ছুটি থাকবে। এর সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় টানা পাঁচ দিনের বিরতি তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের ব্যাংকিং সেবা এবং শেয়ারবাজারের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও ব্যাংক ও শেয়ারবাজার খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক গত রোববার জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে ১৭ অক্টোবর শনিবার ব্যাংক খোলা রাখার নির্দেশনা দেয়।
এদিকে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কার্যক্রম সচল রাখতে সমুদ্র, স্থল ও বিমানবন্দরে অবস্থিত ব্যাংকের শাখা ও বুথগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০ থেকে ২২ অক্টোবরের সরকারি ছুটির পাশাপাশি ২৩ ও ২৪ অক্টোবরের সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও এসব শাখা ও বুথে সীমিত পরিসরে আমদানি-রফতানিসংক্রান্ত ব্যাংকিং সেবা চালু রাখতে হবে। এ জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করলেন ট্রাম্প

০

অর্থজগত ডেস্ক
রাশিয়ার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মার্কিন কংগ্রেসের উদ্যোগ আটকে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞাগুলো স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের ফলে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মস্কোর ওপর চাপ বাড়ানোর মার্কিন উদ্যোগে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় সময় শুক্রবার রাতে (১৬ অক্টোবর) এ বিষয়ে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন ট্রাম্প। আদেশে তিনি উল্লেখ করেন, কিছু নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখা যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় স্বার্থের’ অনুকূলে।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প নিজেই নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত বিলে স্বাক্ষর করে সেটিকে আইনে পরিণত করেছিলেন। আইনটি রোববার থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। তবে কার্যকরের ঠিক আগমুহূর্তে তাঁর এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাশিয়াবিষয়ক নীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের পেছনে জ্বালানির বাজারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। কয়েক দিন আগেই ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানি করবে। ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকান নাকি ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকবে।
ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা মার্কিন আইনপ্রণেতাদের বিস্মিত করেছে। নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের মধ্যেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আইনটি প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে নামকরণ করা হয়েছে। সাউথ ক্যারোলাইনার এই সিনেটর গত ১১ জুলাই মৃত্যুর আগপর্যন্ত ওয়াশিংটনে ইউক্রেনের অন্যতম কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই সমর্থন রয়েছে। তবে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের মতো অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জে পড়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।