অর্থজগত প্রতিবেদন
তৌফিকা ফুডস অ্যান্ড লভেলো আইসক্রিম পিএলসির শেয়ারে সিরিজ ট্রেডিং ও কৃত্রিমভাবে দর বাড়ানোর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় একটি মার্চেন্ট ব্যাংক, একটি করপোরেট প্রভিডেন্ট ফান্ড ও তিন ব্যক্তিকে মোট ৩৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তদন্তে উঠে এসেছে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আন্তঃসংযুক্ত বিও হিসাবের মাধ্যমে কোম্পানিটির মোট লেনদেনের উল্লেখযোগ্য অংশ সম্পন্ন করে শেয়ারের দাম প্রভাবিত করা হয়েছিল।
বিএসইসির ১৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এনফোর্সমেন্ট আদেশ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৬ মে থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত লভেলোর শেয়ার লেনদেনে অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করে ডিএসই। এ সময় কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ৭৮ টাকা ৯০ পয়সা থেকে বেড়ে ৯৮ টাকা ৬০ পয়সায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ, মাত্র ৩৫ দিনের ব্যবধানে শেয়ারটির দাম বাড়ে প্রায় ২৫ শতাংশ।
ডিএসইর তদন্তে দেখা যায়, সিবিসি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড এবং লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের মালিক ঝুয়াং লিফেংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিও হিসাবের মধ্যে সমন্বিত লেনদেনের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল। এই নেটওয়ার্কে ছিল সিবিসি ক্যাপিটাল, লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড এমপ্লয়িজ কন্ট্রিবিউটরি প্রভিডেন্ট ফান্ড (ইসিপিএফ), লিজ ফ্যাশনের অর্থ প্রধান এইচ এম রুবাইয়াত, তাঁর স্ত্রী শায়লা আক্তার এবং প্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (প্ল্যানিং) রাজন কুমার সাহা।
তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আলোচ্য সময়ে লভেলোর মোট শেয়ার লেনদেনের ২২ দশমিক ৩০ শতাংশ সম্পন্ন করে। বাজারে কৃত্রিমভাবে লেনদেনের গতি তৈরি এবং শেয়ারের দাম প্রভাবিত করতে তারা ৯ লাখ ৬৭ হাজার ১২৫টি শেয়ার নিয়ে ১৩টি ম্যাচড বা সার্কুলার ট্রানজেকশন সম্পন্ন করে। এ ধরনের লেনদেনে একই ব্যক্তি বা পারস্পরিকভাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বিতভাবে শেয়ার কেনাবেচা করা হয়, যা বাজারে প্রকৃত চাহিদা ও সরবরাহ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি করতে পারে।
বিএসইসির আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব লেনদেনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো ২ কোটি ২৪ লাখ টাকার বাস্তবায়িত মূলধনি মুনাফা বা রিয়ালাইজড ক্যাপিটাল গেইন এবং ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকার অবাস্তবায়িত মূলধনি মুনাফা বা আনরিয়ালাইজড ক্যাপিটাল গেইন অর্জন করে। ফলে শেয়ারের স্বাভাবিক দর নির্ধারণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও বিভ্রান্তি তৈরির ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।
এ ঘটনায় লিজ ফ্যাশন ইসিপিএফকে সর্বোচ্চ ১৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সিবিসি ক্যাপিটালকে জরিমানা করা হয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া এইচ এম রুবাইয়াতকে ৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা, শায়লা আক্তারকে ৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এবং রাজন কুমার সাহাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর দুটি ধারা লঙ্ঘনের দায়ে এ জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। বিএসইসির আদেশ অনুযায়ী, কৃত্রিম ও বিভ্রান্তিকর লেনদেন সৃষ্টির দায়ে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক পক্ষের ওপর ১ লাখ টাকা করে জরিমানা ধার্য করা হয়েছে। পাশাপাশি শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ওপর অতিরিক্ত অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়।
এনফোর্সমেন্ট শুনানিতে অভিযুক্ত পক্ষগুলো নিজেদের দায় এড়াতে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরে। তাদের কেউ কেউ দাবি করেন, পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব মার্চেন্ট ব্যাংকের ওপর ন্যস্ত ছিল। কেউ সিকিউরিটিজ আইন সম্পর্কে অজ্ঞতার কথা বলেন, আবার কেউ ধর্মীয় তীর্থযাত্রার কারণে সাময়িক অনুপস্থিতির বিষয়টি সামনে আনেন। অন্যদিকে, সিবিসি ক্যাপিটালের পরিচালনা পর্ষদ দাবি করে, প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন সাময়িক বরখাস্তকৃত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার অননুমোদিত পদক্ষেপের কারণে এসব লেনদেন হয়েছিল।
তবে এসব যুক্তি গ্রহণ করেনি বিএসইসি। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির অবস্থান হলো, কোনো হিসাবধারী বা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ আইন ও বিধিবিধান মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পেতে পারে না। পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অন্য প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত করা কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অননুমোদিত পদক্ষেপের অজুহাত দেখিয়েও আইন লঙ্ঘনের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
জরিমানার অর্থ আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে বিএসইসির অনুকূলে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুঁজি বাজারে স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রাখতে শেয়ারের দাম প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে সমন্বিত লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। লভেলোর শেয়ার নিয়ে বিএসইসির এই আদেশে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায় নির্ধারণের পাশাপাশি বাজারে কৃত্রিম লেনদেনের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।


