সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারে ৮১% পর্যন্ত দরবৃদ্ধির সম্ভাবনা

অর্থজগত প্রতিবেদন
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারে ৪৪ থেকে ৮১ শতাংশ পর্যন্ত দরবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে বিনিয়োগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএএল বাংলাদেশ। ব্যাংক খাতে সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণ কার্যক্রমে পুনরুদ্ধার ঘটলে আর্থিকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকগুলো বেশি ঋণ বিতরণ ও বাজার হিস্যা বাড়ানোর সুযোগ পাবে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ক্ষেত্রে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংককে সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

‘ব্যাংকিং অন দ্য নেক্সট সাইকেল’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে সিএএল বাংলাদেশ বলেছে, সম্পদের গুণগত মান, মূলধন পর্যাপ্ততা, তহবিল সংগ্রহের সক্ষমতা এবং ঋণ বিতরণের সামর্থ্য বিবেচনায় ১৪টি ব্যাংক চলমান সংকট মোকাবিলা করে পরবর্তী প্রবৃদ্ধির ধাপে প্রবেশের জন্য তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষায়, এসব ব্যাংক ‘সাইকেল-রেডি’ বা ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত। ব্যাংক খাতের আর্থিক পুনর্বিন্যাসের ফলে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ঋণ কার্যক্রম পরিচালনায় চাপে পড়বে, তখন শক্তিশালী ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণে বাড়তি সুযোগ পেতে পারে।

গত ৫ অক্টোবরের শেয়ারদরকে ভিত্তি ধরে পাঁচ ব্যাংকের সম্ভাব্য লক্ষ্যদর নির্ধারণ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ারের লক্ষ্যদর ১১৭ টাকা ৪৫ পয়সা। ওই দিন শেয়ারটির সমাপনী দর ছিল ৬৫ টাকা। সে হিসাবে সম্ভাব্য দরবৃদ্ধি ৮০ দশমিক ৭ শতাংশ। সিটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে ২৯ টাকা ৭০ পয়সা সমাপনী দরের বিপরীতে লক্ষ্যদর নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮ টাকা ৩৬ পয়সা। এতে সম্ভাব্য দরবৃদ্ধি ৬২ দশমিক ৮ শতাংশ।

এ ছাড়া ইস্টার্ন ব্যাংকের শেয়ারের লক্ষ্যদর ৩৪ টাকা ৩৮ পয়সা, যা ২২ টাকা ৮০ পয়সা সমাপনী দরের তুলনায় ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের শেয়ারের লক্ষ্যদর ৬৭ টাকা ২৫ পয়সা, যেখানে ভিত্তিমূল্য ছিল ৪৫ টাকা ৫০ পয়সা। এতে সম্ভাব্য দরবৃদ্ধি ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে, ৩৮ টাকা ৮০ পয়সা সমাপনী দরের বিপরীতে পূবালী ব্যাংকের লক্ষ্যদর ৫৫ টাকা ৮৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে শেয়ারটির সম্ভাব্য দরবৃদ্ধি ৪৪ শতাংশ। এসব হিসাবের মধ্যে নগদ লভ্যাংশ থেকে সম্ভাব্য আয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

ব্যাংক খাতের সামগ্রিক দুর্বলতার মধ্যেও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার পেছনে ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশন সংরক্ষণের কঠোর নীতিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে সিএএল বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এসব নীতির ফলে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার পার্থক্য আরও স্পষ্ট হচ্ছে। যেসব ব্যাংকের সম্পদের মান ভালো, মূলধন পর্যাপ্ত এবং আমানত সংগ্রহের সক্ষমতা বেশি, তারা তুলনামূলক দুর্বল ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে আমানত ও ঋণগ্রহীতা আকৃষ্ট করতে পারে।

গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রভিশন ঘাটতি ছিল ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। সংকটে থাকা ১০টি ব্যাংকের কাছে কেন্দ্রীভূত ছিল মোট খেলাপি ঋণের ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ, ব্যাংক খাতের সম্পদের গুণগত সমস্যার বড় অংশ নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত রয়েছে। এর বিপরীতে, সিএএল বাংলাদেশের চিহ্নিত ১৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের মধ্যম অনুপাত ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।

এই ১৪ ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ছিল ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ, যা গবেষণায় বিবেচিত ১২ দশমিক ৫ শতাংশের মানদণ্ডের চেয়ে বেশি। ওই মানদণ্ডের অতিরিক্ত মূলধনের পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির ধারণা, অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি ফিরে এলে এবং ঋণের চাহিদা বাড়লে এই অতিরিক্ত মূলধন ঋণ বিতরণ সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে।

সিএএল বাংলাদেশের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ১২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে ২০২৬ সালের জুনের তুলনায় বেসরকারি খাতের ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। এই সম্ভাব্য ঋণ সম্প্রসারণের ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ আসতে পারে গবেষণায় চিহ্নিত ১৪টি ব্যাংক থেকে। ফলে ঋণের চাহিদা পুনরুদ্ধার হলে এসব ব্যাংকের আয় ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়তে পারে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ঋণ কার্যক্রমের পুনরুদ্ধার শুরুতে ব্যক্তি পর্যায়ের ঋণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (এসএমই) অর্থায়ন, ভোক্তা ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে গতি আসতে পারে। পরবর্তী সময়ে করপোরেট ঋণ, আমদানি অর্থায়ন এবং বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং সেবার চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব খাতে আগে থেকেই শক্তিশালী অবস্থানে থাকা ব্যাংকগুলো তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেতে পারে।

ব্যাংকভিত্তিক বিশ্লেষণে ব্র্যাক ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি, এসএমই খাতে শক্তিশালী অবস্থান এবং মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশে অংশীদারত্বকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে সিএএল বাংলাদেশ। সিটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ড, পেমেন্ট সেবা ও খুচরা ব্যাংকিং ব্যবসা ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধির সুফল এনে দিতে পারে। ইস্টার্ন ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওতে পর্যাপ্ত প্রভিশন এবং লেনদেনভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রমকে প্রবৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

অন্যদিকে, পূবালী ব্যাংকের দেশজুড়ে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঋণ সম্প্রসারণে সুবিধা দিতে পারে। ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের কম খরচের আমানত সংগ্রহ এবং বিস্তৃত বিতরণ নেটওয়ার্ককে অতিরিক্ত তারল্য ঋণে রূপান্তরের সক্ষমতা হিসেবে দেখছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। এসব বৈশিষ্ট্য ব্যাংকগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণ ও মুনাফা বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে জোরালো করতে পারে।

তবে ব্যাংক খাতের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ঝুঁকিমুক্ত নয় বলে সতর্ক করেছে সিএএল বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি লোকসানে ছিল। এ ছাড়া ১৯টি ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত আইনগত ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে গিয়েছিল। দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংকট থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে চাপ ছড়িয়ে পড়া, তারল্য ব্যবস্থাপনায় সমস্যা এবং সামগ্রিক আস্থার সংকট শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সুদহারের সীমাবদ্ধতাও ব্যাংকগুলোর মুনাফায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ঋণ ও আমানতের ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার বিধান কার্যকর হলে ব্যাংকগুলোর নিট সুদ আয় বা নেট ইন্টারেস্ট মার্জিন সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৫৫টি ব্যাংকের সুদহারের ব্যবধান নির্ধারিত সীমার ওপরে ছিল। এর মধ্যে ‘সাইকেল-রেডি’ হিসেবে চিহ্নিত ১৪টি ব্যাংকের ১৩টিও রয়েছে। ফলে আর্থিকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোকেও সুদ আয় ও তহবিল ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষায় বাড়তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।

এ ছাড়া বড় করপোরেট ঋণগ্রহীতাদের কাছে ঋণ কেন্দ্রীভূত থাকাও গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। কোনো বড় ঋণ পুনর্গঠন বা পুনঃশ্রেণীকরণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে অতিরিক্ত প্রভিশন রাখতে হতে পারে। এতে মুনাফা কমে যাওয়ার পাশাপাশি মূলধনের ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ব্যাংক খাতের সংস্কার ও ঋণ প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারে উল্লেখযোগ্য দরবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে সিএএল বাংলাদেশ। তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত লক্ষ্যদর নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি, ঋণের প্রকৃত চাহিদা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, সুদহারের পরিবর্তন এবং ব্যাংকগুলোর সম্পদের মানের ওপর নির্ভর করবে এসব সম্ভাবনার বাস্তবায়ন। ফলে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শেয়ারের মূল্যায়নের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন ও ঝুঁকিগুলোও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত