সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

ব্যবসায় ১০৭ বাধা, ৩৭টিই শুল্ক-ভ্যাটে

অর্থজগত প্রতিবেদন
দেশে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ সহজ করতে অন্তত ১০৭টি প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করেছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে ৩৭টি শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সংক্রান্ত। এ ছাড়া আয়কর, বন্ড ব্যবস্থাপনা, সরকারি অনুমোদন, বিদেশি কর্মীদের ওয়ার্ক পারমিট, ভিসা প্রাপ্তি এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার দীর্ঘসূত্রতাসহ নানা জটিলতা ব্যবসা পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) ব্যবসা সহজীকরণ বা ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সংক্রান্ত কমিটির প্রথম সভায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সামনে ব্যবসায়ীরা এসব প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরেন। সভায় কয়েকটি সমস্যা দ্রুত সমাধানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বল্প সময়ে সমাধানযোগ্য সমস্যাগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান জটিলতা ও প্রশাসনিক বাধা দূর করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ২২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত সমস্যাগুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে সমাধান এবং এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করাই কমিটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানান, ব্যবসা সহজীকরণের ক্ষেত্রে চিহ্নিত ১০৭টি সমস্যার মধ্যে ৩৭টিই শুল্ক ও ভ্যাটসংক্রান্ত। কয়েকটি সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। কমিটির প্রথম সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা এবং সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ায় ব্যবসায়ীরা আশাবাদী হয়েছেন। পরবর্তী সভায় গৃহীত পদক্ষেপগুলোর অগ্রগতি তুলে ধরা হবে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কাস্টমস, বন্ড, ভ্যাট ও আয়কর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন জটিলতা উৎপাদন ও বাণিজ্য কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। বিশেষ করে পণ্যের এইচএস কোড নির্ধারণ ও মূল্যায়নে অসংগতি, পণ্য পরীক্ষার নামে দীর্ঘসূত্রতা, বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষায় হয়রানি এবং কাঁচামালের এনটাইটেলমেন্ট অনুমোদনে জটিলতার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাড়তি সময় ও ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, এসব সমস্যার অনেকগুলো দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীদের ভোগাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হলেও কার্যকর সমাধানের ঘাটতি রয়ে গেছে। ফলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত করার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হচ্ছে না।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রমে অটোমেশনের ধীরগতি, কর ও ভ্যাটের রিফান্ড আটকে থাকা এবং নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানকে নিরীক্ষার নামে হয়রানির বিষয়ও রয়েছে। এসব জটিলতায় প্রতিষ্ঠানের অর্থ আটকে থাকার পাশাপাশি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, রাজস্ব প্রশাসনে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা কার্যকর করা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিফান্ড নিষ্পত্তি এবং নিরীক্ষা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও প্রশাসনিক জটিলতা বড় বাধা হয়ে রয়েছে। ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রূপালী চৌধুরী জানান, বিদেশি কর্মীদের ওয়ার্ক পারমিট ইস্যুতে বিলম্ব এবং ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগকারীদের সমস্যায় ফেলছে। এসব বিষয় মূলত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। বিদেশি কর্মীদের প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগলে বিনিয়োগ প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ব্যবসা পরিচালনার এসব বাধা দূর করতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সভায়। বিশেষ করে যেসব সমস্যা স্বল্প সময়ে সমাধান করা সম্ভব, সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে অনুষ্ঠেয় পরবর্তী সভায় এসব উদ্যোগের অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সভায় তাৎক্ষণিকভাবে আলোচনায় আসা উদ্যোগগুলোর মধ্যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ফায়ার ও পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমোদন পাওয়ার পরও কারখানা নির্মাণ ও কার্যক্রম শুরুর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের চূড়ান্ত ছাড়পত্রের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সময় লাগার পাশাপাশি বিনিয়োগের ব্যয়ও বাড়ে।
রূপালী চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, সভায় এ ক্ষেত্রে এমন একটি ব্যবস্থা নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যাতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় না থেকে নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে শিল্পপ্রতিষ্ঠান কার্যক্রম শুরু করতে পারে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরিদর্শন ও পরীক্ষা সম্পন্ন করে প্রতিবেদন দিতে হবে। উদ্যোগটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে অপ্রয়োজনীয় অপেক্ষা কমবে এবং নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু করা সহজ হবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের সরকারি অনুমোদনের আবেদন ও নিষ্পত্তি একটি কেন্দ্রীয় বা একক পোর্টালের মাধ্যমে সম্পন্ন করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে উদ্যোক্তাদের একাধিক দপ্তরে ঘুরতে হওয়ার প্রবণতা কমবে। একই সঙ্গে আবেদনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, নির্ধারিত সময়সীমা মেনে চলা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ হবে।
সভায় আলোচিত প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না দিলে সেটিকে অনুমোদিত হিসেবে গণ্য করার ব্যবস্থাও বিবেচনায় রয়েছে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের ধরন, নিরাপত্তা ও পরিবেশগত শর্ত এবং আইনি সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করা জরুরি। এতে ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া দ্রুত করার পাশাপাশি জনস্বার্থ ও নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডও সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত কমিটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। চিহ্নিত সমস্যাগুলো নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার কাছে পাঠিয়ে সমাধানের সময়সীমা নির্ধারণ করা গেলে দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, কমিটির কার্যক্রম শুধু সমস্যা চিহ্নিত করা ও আলোচনা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং প্রতিটি সমস্যার সমাধানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং অগ্রগতি পর্যালোচনার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। শুল্ক ও কর ব্যবস্থাপনার সংস্কার, অনুমোদন প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন, বিনিয়োগকারীদের হয়রানি বন্ধ এবং সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে দেশে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত হওয়ার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ ও শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোও সহজ হবে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত