অর্থজগত প্রতিবেদন
ব্যবসায়ীদের সময় ও ব্যয় সাশ্রয় এবং প্রশাসনিক ভোগান্তি কমাতে একক অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স প্রদান এবং একই দিনে একাধিক সরকারি সংস্থার যৌথ পরিদর্শন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি বিদেশি কর্মীদের কাজের অনুমোদন ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র নবায়নের প্রক্রিয়া সহজ করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে লাইসেন্স সংগ্রহ এবং একই প্রতিষ্ঠানে একাধিক সংস্থার বারবার পরিদর্শনের কারণে সৃষ্ট জটিলতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আজ শনিবার সচিবালয়ের অর্থ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে ‘ন্যাশনাল টাস্ক ফোর্স অন ডিরেগুলেশন অ্যান্ড বিজনেস ফ্যাসিলিটেশন’-এর প্রথম সভায় এসব উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারি সেবা সহজ, স্বচ্ছ ও কার্যকর করার পাশাপাশি অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা এবং হয়রানি কমাতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার নেওয়া উদ্যোগ এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়।
সভায় জানানো হয়, বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন পৃথক ব্যবস্থায় ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করে। এ প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত অনলাইন পোর্টালের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা একটি নির্দিষ্ট পোর্টালে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা, আবেদন ও নির্ধারিত ফি পরিশোধের মাধ্যমে ঘরে বসেই ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করতে পারবেন।
এ ছাড়া লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ানো এবং প্রচলিত ট্রেড লাইসেন্সকে ‘বিজনেস রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট’ বা সমজাতীয় নামে রূপান্তরের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব পরিবর্তন কার্যকর হলে লাইসেন্স সংগ্রহে সময়ক্ষেপণ, প্রশাসনিক জটিলতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি কমাতে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনেও সমন্বিত ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ইনভেস্ট বাংলাদেশের নেতৃত্বে প্রস্তাবিত এ ব্যবস্থায় ভবনের নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা ও পরিবেশগত বিষয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পরিদর্শন পৃথক সময়ে না করে একই দিনে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পূর্বনির্ধারিত তারিখে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইনভেস্ট বাংলাদেশের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে যৌথভাবে পরিদর্শন করা হবে। এতে একই প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সংস্থার বারবার যাওয়ার প্রয়োজন কমবে। ফলে ব্যবসায়ীদের সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিদর্শন কার্যক্রমেও সমন্বয় বাড়বে।
সভায় আরও জানানো হয়, ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত অনুমোদন, পারমিট ও লাইসেন্স প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমে দ্বৈততা দূর করতে প্রাথমিকভাবে পাঁচটি অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব খাতে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা পর্যালোচনা করে অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য খাতেও এ উদ্যোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদেশি কর্মীদের কাজের অনুমোদন ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র নবায়নের বিদ্যমান প্রক্রিয়া নিয়েও সভায় আলোচনা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বিদেশি নাগরিকেরা বাংলাদেশে বৈধ ও নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের অধীনে কাজ করতে আসেন। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত কর পরিশোধ করে এবং তাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালকেরাও দেশের বৈধ নাগরিক। প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে দায়িত্ব নিয়ে আবেদন ও প্রয়োজনীয় প্রত্যয়ন দেওয়ার পরও নিরাপত্তা ছাড়পত্র নবায়নে অযৌক্তিক জটিলতা সৃষ্টি হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
এ সমস্যা সমাধানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বিদেশি কর্মীদের কাজের অনুমোদন এবং নিরাপত্তা ছাড়পত্র নবায়নের প্রক্রিয়া আরও সহজ, স্বচ্ছ ও কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ব্যবসা পরিচালনায় অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ, অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করা জরুরি। বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারি সেবা সহজলভ্য করার পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সভায় টাস্কফোর্সের সদস্য হিসেবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী অংশ নেন।
এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান, অর্থ বিভাগের সচিব, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি, যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) নিবন্ধক এবং অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত সেবাকে আরও গতিশীল, সহজলভ্য ও কার্যকর করতে প্রশাসনিক সংস্কার, ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।


