অর্থজগত প্রতিবেদন
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অর্থমূল্যে এ ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১৫৮ কোটি ইউরো। রপ্তানির পরিমাণ কমার পাশাপাশি পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় আয় হ্রাসের চাপ আরও বেড়েছে।
ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ১৯৩ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে ইইউ। গত বছরের একই সময়ে এ আমদানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৫০ কোটি ইউরো। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের আমদানি মূল্য কমেছে প্রায় ১৫৮ কোটি ইউরো।
পরিসংখ্যান বলছে, এ সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউর পোশাক আমদানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। তবে রপ্তানি আয়ের পতন শুধু পণ্যের পরিমাণ কমার কারণে হয়নি। পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য কমে যাওয়াও এতে বড় ভূমিকা রেখেছে। গত বছরের প্রথম আট মাসে প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য ছিল ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরোতে। অর্থাৎ, একই পরিমাণ পোশাক রপ্তানি করেও আগের তুলনায় কম আয় করছে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা।
রপ্তানির পরিমাণ ও গড় মূল্য—উভয় সূচকে নেতিবাচক প্রবণতা দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর একটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এ বাজারে আয় কমে যাওয়ার প্রভাব সামগ্রিক রপ্তানি আয়, শিল্পের মুনাফা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ওপরও পড়তে পারে।
তবে আট মাসের সামগ্রিক চিত্রের বিপরীতে আগস্ট মাসে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে ইইউর মোট পোশাক আমদানির মূল্য বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭২ শতাংশ। যদিও আমদানির পরিমাণ কমেছে শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ, গড় আমদানিমূল্য বেড়েছে ১ দশমিক ২৯ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, সাম্প্রতিক মাসে ইউরোপের পোশাক বাজারে গড় মূল্য কিছুটা বেড়েছে। তবে এক মাসের এ পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের রপ্তানি পরিস্থিতির উন্নতির ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরও তথ্য প্রয়োজন।
রপ্তানিকারকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন, প্রতিযোগী দেশের মূল্য কৌশল এবং দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাবে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির কারণে চীনের রপ্তানিকারকরা ইউরোপের বাজারে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে তারা তুলনামূলক কম দামে ক্রয়াদেশ নিচ্ছেন। এতে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের পক্ষে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, চীনের কম দামে ক্রয়াদেশ নেওয়ার প্রবণতা ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন করে তুলেছে। একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এবং উচ্চমূল্যের কারণে দেশের পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। ফলে একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে কম দামের প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয়ের চাপ—দুই দিক থেকেই রপ্তানিকারকরা চাপে রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে মুনাফা ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো নয়, রপ্তানি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও এখন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, পণ্যের গড় বিক্রয়মূল্য ক্রমাগত কমে গেলে রপ্তানির পরিমাণ বাড়লেও আয় ও মুনাফা প্রত্যাশিত হারে বাড়ে না। এ কারণে কম দামের পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উচ্চমূল্য সংযোজিত ও বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়িয়ে পণ্যের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী প্রবণতা উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বছর শেষে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই বাজার হারানোর কারণ চিহ্নিত করার পাশাপাশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
ইইউর বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগীদের পরিস্থিতি বিশ্লেষণেও রপ্তানি আয়ের এই পতনের কারণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে চীন থেকে ইইউর পোশাক আমদানি বেড়েছে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এ সময়ে দেশটি থেকে আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৭১ কোটি ইউরো। চীনের পোশাক রপ্তানির পরিমাণও বেড়েছে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। তবে দেশটির গড় রপ্তানিমূল্য কমেছে ১ দশমিক ০৪ শতাংশ। অর্থাৎ, তুলনামূলক কম দামে বেশি পরিমাণ পোশাক সরবরাহ করে চীন ইউরোপের বাজারে আয় বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে, ভিয়েতনাম থেকে ইইউর পোশাক আমদানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। দেশটি থেকে আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি ইউরো। এ সময়ে ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। কিন্তু গড় রপ্তানিমূল্য ১০ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় দেশটির মোট রপ্তানি আয় বেড়েছে। অর্থাৎ, রপ্তানির পরিমাণ কমলেও তুলনামূলক বেশি মূল্যে পোশাক বিক্রি করে ভিয়েতনাম আয় বাড়িয়েছে।
চীন ও ভিয়েতনামের এ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চীন কম দামে বেশি পণ্য বিক্রি করে আয় বাড়িয়েছে, আর ভিয়েতনাম তুলনামূলক বেশি মূল্যের পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে আয় বাড়াতে পেরেছে। বিপরীতে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ও গড় মূল্য—দুটিই কমেছে। ফলে ইউরোপের বাজারে আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
তবে ইইউর বাজারে শুধু বাংলাদেশ নয়, অন্যান্য প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক দেশও আয় কমার মুখে পড়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে তুরস্কের রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ০২ শতাংশ। দেশটি থেকে ইইউর পোশাক আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৫১০ কোটি ইউরো। ভারতের রপ্তানি আয় কমেছে ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ১১ দশমিক ০৩ শতাংশ। এ ছাড়া পাকিস্তানের আয় কমেছে ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ, মরক্কোর ৬ দশমিক ১০ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ।
এসব দেশের মধ্যে রপ্তানির পরিমাণ ও গড় মূল্যের পরিবর্তনেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। পাকিস্তানের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বাড়লেও গড় রপ্তানিমূল্য কমেছে ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। কম্বোডিয়ার রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ, কিন্তু গড় রপ্তানিমূল্য বেড়েছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। ফলে একই বাজারে বিভিন্ন দেশের রপ্তানি আয়ের পরিবর্তনের পেছনে পণ্যের পরিমাণের পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সামগ্রিকভাবে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির বর্তমান চিত্র বলছে, শুধু উৎপাদন ও রপ্তানির পরিমাণ বাড়িয়ে আগের মতো আয় বৃদ্ধি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয়, পণ্যের গুণগত মান এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে উপযুক্ত মূল্য আদায়ের সক্ষমতা—সবকিছুর ওপরই রপ্তানির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উচ্চমূল্য সংযোজিত পোশাক উৎপাদন, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও চাপে পড়তে পারে।


