সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

মিউচুয়াল ফান্ডে আস্থা ফেরাতে বিএসইসির আশ্বাস

অর্থজগত প্রতিবেদন

শেয়ারবাজারে মিউচুয়াল ফান্ড খাত ঘিরে সাম্প্রতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা কাটাতে ইতিবাচক অবস্থান জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা পর্যালোচনা ও সংশোধনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মাসুদ খান। আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুসরণ এবং বাজার সংশ্লিষ্টদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে এ খাতের উন্নয়নে কাজ করার ঘোষণায় নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।

সম্প্রতি বিএসইসির একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট দর ও নিট সম্পদ মূল্যে (এনএভি) ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে অধিকাংশ ফান্ডের দরেই উল্লেখযোগ্য পতন দেখা যায়। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরবর্তী ইতিবাচক অবস্থান এবং অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর গত সপ্তাহে অনেক ফান্ডই সেই ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্পষ্ট বার্তা এ খাতের বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সাধারণত মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের বাজারদর নির্ধারণে ফান্ডের সম্পদ মূল্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফান্ডের বিনিয়োগ, আয়, নগদ প্রবাহ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর এর মূল্যায়ন নির্ভর করে। তবে বাস্তবে শেয়ারের মতো মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট দরও সব সময় নিট সম্পদ মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ওঠানামা করে না। ফান্ডের মূলধন, বিনিয়োগ কৌশল, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও সুনাম এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও ইউনিটের বাজারদরে প্রভাব ফেলে।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে মিউচুয়াল ফান্ডের অবমূল্যায়নের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির শেয়ার প্রকৃত সম্পদ মূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দরে লেনদেন হচ্ছে। এমনকি ঋণাত্মক সম্পদ মূল্য থাকা সত্ত্বেও কিছু দুর্বল কোম্পানির শেয়ার উচ্চ দরে কেনাবেচা হতে দেখা যাচ্ছে। বিপরীতে, অধিকাংশ মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট তাদের প্রকৃত নিট সম্পদ মূল্যের তুলনায় অনেক কম দরে লেনদেন হচ্ছে। হাতেগোনা কয়েকটি ফান্ডের ইউনিট এনএভির সামান্য ওপরে থাকলেও সিংহভাগ ফান্ডই উল্লেখযোগ্য অবমূল্যায়নের শিকার।

অথচ অতীতে দেশের শেয়ারবাজারে এমন সময়ও গেছে, যখন মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট তাদের নিট সম্পদ মূল্যের পাঁচ থেকে সাত গুণ বেশি দরে লেনদেন হয়েছে। সেই বিবেচনায় বর্তমান পরিস্থিতিকে এ খাতের সম্ভাবনার তুলনায় বড় ধরনের মূল্যায়ন ঘাটতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, মৌলিক সূচক ও সম্পদ মূল্যের ভিত্তিতে বিচার করলে অনেক মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট বিনিয়োগের আকর্ষণীয় পর্যায়ে রয়েছে। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে ফান্ড ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

এদিকে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের নিয়ন্ত্রক কাঠামো আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০২৫’ পর্যালোচনা সংক্রান্ত মতবিনিময় সভা। এতে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, বিধিমালা পর্যালোচনা ও সংশোধনের ক্ষেত্রে বাজার অংশীজনদের মতামত কমিশনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা বিবেচনায় নিয়ে এ খাতের জন্য কার্যকর ও বাস্তবসম্মত নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা হবে।

তিনি বলেন, দেশের শেয়ারবাজারকে আরও গতিশীল, টেকসই ও বিনিয়োগবান্ধব করতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। শুধু ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভর করে শেয়ারবাজারের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে মিউচুয়াল ফান্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান আরও বলেন, মিউচুয়াল ফান্ড খাতের উন্নয়ন ছাড়া শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বিকাশ সম্ভব নয়। তাই বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এ খাতের উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

মতবিনিময় সভায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল), মিউচুয়াল ফান্ডের ট্রাস্টি, কাস্টোডিয়ান এবং সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভায় বিদ্যমান বিধিমালার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক কাঠামো আরও কার্যকর করার বিষয়ে প্রস্তাব ও মতামত তুলে ধরা হয়।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মিউচুয়াল ফান্ড কেবল বিনিয়োগের একটি মাধ্যম নয়, বরং শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি পেশাদার সম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে। ফলে এ খাতের দুর্বলতা পুরো শেয়ারবাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তাদের মতে, মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট দর ও প্রকৃত সম্পদ মূল্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের ব্যবধান কমাতে হলে শুধু বিধিমালা সংশোধন যথেষ্ট নয়; সম্পদ ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়ন, নিয়মিত তথ্য প্রকাশ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর নজরদারিও প্রয়োজন। পাশাপাশি ফান্ডগুলোর বিনিয়োগ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও পেশাদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

সব মিলিয়ে, বিএসইসির সাম্প্রতিক আশ্বাস মিউচুয়াল ফান্ড খাতের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে বাস্তবসম্মত বিধিমালা প্রণয়ন এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে এ খাতে নতুন করে আস্থা তৈরি হতে পারে। এতে শুধু মিউচুয়াল ফান্ডের বাজারই নয়, সামগ্রিক শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের পরিধি বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথও সুগম হতে পারে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত