সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

মাতারবাড়ীতে ৭০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র

অর্থজগত প্রতিবেদন
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে অব্যবহৃত জমিতে ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ করা অব্যবহৃত জমির একাংশে এ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এতে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। প্রায় ৬০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) ইতোমধ্যে বিবেচনার জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল)। কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রস্তাবটি পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়া এগোবে।

সিপিজিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নজমুল হক রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে জানান, মাতারবাড়ীর ২×৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন আল্ট্রা সুপারক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমানার মধ্যে থাকা ১৭১ একর অব্যবহৃত জমিতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করা হবে।

প্রকল্পের খসড়া ডিপিপি অনুযায়ী, এর মোট ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৬০৪ কোটি ৯৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থেকে ৪২ কোটি ৮৭ লাখ ৬ হাজার টাকা, প্রকল্প ঋণ হিসেবে ৫৩২ কোটি ৩৯ লাখ ১২ হাজার টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ২৯ কোটি ৭১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা জোগান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি) বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সুবিধা কাঠামোর আওতায় প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করবে। এ অর্থায়ন কাঠামোয় ৩৫ কোটি ইউরো ঋণ এবং ৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরো অনুদান সহায়তা রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধি, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে।

প্রকল্পটির অন্যতম বিশেষ দিক হলো বিদ্যমান অবকাঠামো ও অব্যবহৃত জমির ব্যবহার। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময় ছাই সংরক্ষণের জন্য প্রায় ৬৩০ একর জমি বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র ১০৫ একর জমিতে ছাইয়ের পুকুর নির্মাণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৫২৫ একর জমি এখনো অব্যবহৃত রয়েছে। প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য এ জমির একটি অংশ ব্যবহার করা হবে।

এ ছাড়া বিদ্যমান ছাইয়ের পুকুরের চারপাশে প্রায় ১৪ মিটার উঁচু সুরক্ষা বাঁধ থাকায় নতুন করে বাঁধ নির্মাণের প্রয়োজন হবে না। ফলে জমি অধিগ্রহণ ও কিছু অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় এড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় সৌর ফটোভোলটাইক (পিভি) মডিউল, ইনভার্টার এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সরঞ্জাম স্থাপন করা হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে নিকটবর্তী মাতারবাড়ী ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র পর্যন্ত এক কিলোমিটার দীর্ঘ ১৩২ কেভি ওভারহেড সঞ্চালন লাইন নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে।

পাশাপাশি মাতারবাড়ী ও চকরিয়া ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রের মধ্যে ১৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বিতীয় সার্কিটের ওভারহেড কন্ডাক্টর স্থাপন করা হবে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে মাতারবাড়ীতে তিনটি এবং চকরিয়ায় একটি—মোট চারটি ১৩২ কেভি এয়ার ইনসুলেটেড সুইচগিয়ার (এআইএস) বে নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাছাকাছি অবস্থান প্রকল্প বাস্তবায়নে বাড়তি সুবিধা দেবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ। এতে বিদেশ থেকে আমদানি করা সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি দ্রুত খালাস ও প্রকল্প এলাকায় পরিবহন করা সম্ভব হবে।

উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সম্পন্ন সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রথমে ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছিল। পরবর্তী মূল্যায়নে প্রকল্পটির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে ৭০ মেগাওয়াট করার সুপারিশ করা হয়।

পরিকল্পনা কমিশনের বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম প্রধান মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম বাসসকে জানান, প্রকল্পের খসড়া প্রস্তাব নিয়ে শিগগিরই পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, প্রকল্পটি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে।

তবে প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে কয়েকটি বিষয়ে ব্যাখ্যা ও সংশোধন চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এর মধ্যে রয়েছে একই ধরনের চলমান ও সম্পন্ন প্রকল্পের সঙ্গে তুলনা করে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান সরঞ্জামের প্রস্তাবিত ব্যয় যাচাই, অর্থায়ন কাঠামোর বিষয়ে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণ বাড়ানো।

কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রকল্পটি আর্থিকভাবে বাস্তবসম্মত মনে হলেও মোট ব্যয়ের মাত্র ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ নিজস্ব অর্থায়নের প্রস্তাব করেছে সিপিজিসিবিএল। এ পরিমাণ প্রায় ২৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। প্রকল্পে সংস্থাটির আর্থিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টি পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সৌর পিভি মডিউল ও ইনভার্টারের গুণগত মান এবং বাজারদর যাচাই করা হবে। যানবাহন, অফিস সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র কেনার জন্য প্রস্তাবিত ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকার বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিশন। মোটরসাইকেলের সংখ্যা ‘লট’ হিসেবে উল্লেখ না করে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে।

দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বর্তমান অবস্থার বিস্তারিত তথ্যও চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। সরকারি-বেসরকারি খাতের মোট উৎপাদন সক্ষমতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা এবং বিদ্যমান সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা সংস্থা ও অবস্থানভিত্তিকভাবে তুলে ধরতে বলা হয়েছে।

দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটির গুরুত্ব রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বর্তমানে ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ দেশে মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎসের সক্ষমতা ১ হাজার ৯৩৪ দশমিক ৫৪ মেগাওয়াট, যা মোট উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সাত নম্বর লক্ষ্য—সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি নিশ্চিত করার সঙ্গেও প্রকল্পটি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিদেশি অর্থায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নতুন ও অননুমোদিত প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণ নিষ্পত্তি ও প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে প্রকল্পটির অনুমোদন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। এতে মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অব্যবহৃত জমি কাজে লাগিয়ে জাতীয় গ্রিডে নতুন করে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত