সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

ব্যাংকঋণে সরকারের বাড়তি নির্ভরতা

অর্থজগত প্রতিবেদন
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে নতুন ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে ৬ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা নিট পরিশোধ করেছিল সরকার। রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি এবং সরকারি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে ব্যাংকঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়ছে। এতে একদিকে ব্যাংক খাতে সরকারি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর আয় ও মুনাফা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকার নিট ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে তিন মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা।
গত অর্থবছরের একই চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া ঋণের বিপরীতে সরকার নিট ৪ হাজার ২২৬ কোটি টাকা পরিশোধ করেছিল। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ বাবদ পরিশোধ করেছিল ২ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে আগের দায় কমানোর দিকে মনোযোগী ছিল সরকার। এক বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধের অবস্থান থেকে বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণে চলে আসা সরকারের অর্থায়ন পরিস্থিতির পরিবর্তনকেই তুলে ধরছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই এ লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২১ দশমিক ৬৫ শতাংশ ঋণ নেওয়া হয়ে গেছে। ফলে বছরের বাকি সময়ে সরকারের ব্যয় নির্বাহে ব্যাংকঋণের চাহিদা কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকারের ঋণ গ্রহণ বাড়ার পেছনে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারি ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে ঘাটতি পূরণে ঋণের প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় বেসরকারি খাতের উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কমার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব সংগ্রহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এ সময়ে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৫৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ। রাজস্ব আয়ের এ ঘাটতি সরকারের অর্থায়ন ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
এদিকে ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের ঋণের স্থিতিও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১৪ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা। গত জুন শেষে এ পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৯১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সরকারের ঋণের স্থিতি বেড়েছে ২৩ হাজার ২২৮ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও সরকারের ঋণ বেড়েছে। গত জুন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল ৯৪ হাজার ৫১ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ হাজার ৬৯ কোটি টাকায়। বাণিজ্যিক ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক—উভয় উৎসের ঋণ হিসাব করলে সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৯ হাজার ৭২১ কোটি টাকা।
তবে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় আপাতত সরকারের ঋণ গ্রহণে ব্যাংকগুলোর তেমন সমস্যা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসায় ব্যাংকগুলোর হাতে ঋণ দেওয়ার মতো অর্থ রয়েছে। ফলে সরকারি ঋণের চাহিদা মেটাতে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা থাকলেও এর আর্থিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, সরকারি ঋণের সুদহার কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর আয় ও মুনাফার ওপর চাপ বাড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারকে ঋণ দিয়ে যে সুদ পাওয়া যাচ্ছে, তা আমানতের বিপরীতে ব্যাংককে যে সুদ দিতে হচ্ছে, তার চেয়েও কম। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি ঋণ ব্যাংকগুলোর জন্য অর্থ বিনিয়োগের একটি মাধ্যম হলেও তা প্রত্যাশিত মুনাফা নিশ্চিত করতে পারছে না।
সামগ্রিকভাবে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি, সরকারি ব্যয়ের চাপ এবং বেসরকারি খাতের ধীরগতির মধ্যে ব্যাংকঋণের ওপর সরকারের বাড়তি নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ব্যাংকগুলো আপাতত ঋণের চাহিদা পূরণ করতে পারলেও দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকের মুনাফা এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ভারসাম্য বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত