অর্থজগত প্রতিবেদন
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে গতি কমে আসা, আমদানি-রফতানি কার্যক্রম সংকুচিত হওয়া এবং আয় বাড়ানোর সীমিত সুযোগের প্রভাব পড়েছে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মুনাফায়। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে কার্যরত এসব ব্যাংকের সম্মিলিত নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। আর আগের ছয় মাসের তুলনায় মুনাফা কমেছে ৩৮ শতাংশ। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, শক্তিশালী মূলধন ও পর্যাপ্ত তারল্য থাকা সত্ত্বেও বৈদেশিক বাণিজ্যনির্ভর ব্যাংকিং কার্যক্রমের দুর্বলতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না বিদেশি ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩২১ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ মুনাফা ছিল ২ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নিট মুনাফা কমেছে ৪৯৪ কোটি টাকা। আর গত বছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করেছিল ব্যাংকগুলো। সেই তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মুনাফা কমেছে ১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।
ব্যাংকগুলোর মুনাফায় এই পতন কেবল আয় কমে যাওয়ার হিসাব নয়; বরং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসায়িক লেনদেনের সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের গভীর সম্পর্কেরও প্রতিফলন। আমদানি-রফতানি কার্যক্রমের মাধ্যমে বিদেশি ব্যাংকগুলো উল্লেখযোগ্য আয় করে থাকে। পণ্য আমদানির ঋণপত্র খোলা, রফতানি আয় দেশে আনা, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা তাদের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এসব কার্যক্রমে গতি কমে গেলে ব্যাংকগুলোর আয়ও চাপে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কর-পূর্ববর্তী সম্মিলিত মুনাফা হয়েছে ৩ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ আয় ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং আগের ছয় মাসের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ কম। একই সময়ে সম্পদ ও মূলধনের বিপরীতে মুনাফার হারও হ্রাস পেয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর হাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ ও মূলধন থাকলেও সেগুলো ব্যবহার করে আগের মতো আয় তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর আয় বাড়ানোর সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারকদের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় মেটাতে বেশি বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হওয়ায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সীমাবদ্ধতায় শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে উৎপাদন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ঋণ, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং বাণিজ্যিক সেবা থেকে আয়ও কমছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের মতে, ব্যাংক খাত বর্তমানে কঠিন সময় অতিক্রম করছে। আয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ায় ব্যাংকগুলোর মুনাফা অর্জনের সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। খেলাপি ঋণ ও সমস্যাগ্রস্ত সম্পদের পরিমাণ বেড়ে গেলে ব্যাংকের আয় থেকে সম্ভাব্য ক্ষতি সামাল দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
আমানতে শক্তি, ঋণ বিতরণে স্থবিরতা
বিদেশি ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমলেও আমানতের ভিত্তি এখনো শক্তিশালী। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে এসব ব্যাংকের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৩৭৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা দেশের ব্যাংক খাতের মোট আমানতের প্রায় ৪ শতাংশ। তুলনামূলক ছোট পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও বৈদেশিক বাণিজ্য ও করপোরেট ব্যাংকিংয়ে তাদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।
দেশীয় ব্যাংকগুলোর বড় অংশ যেখানে সাধারণ গ্রাহক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণির ঋণগ্রহীতাকে সেবা দেয়, সেখানে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম মূলত করপোরেট গ্রাহককেন্দ্রিক। বহুজাতিক কোম্পানি, বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান এসব ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহক। তাদের আমানতের বড় অংশ চলতি হিসাব, সঞ্চয়ী হিসাব ও নিবাসী বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে জমা থাকে। ফলে তুলনামূলক কম খরচে তহবিল সংগ্রহের সুযোগ পায় ব্যাংকগুলো।
তবে আমানতের শক্তিশালী ভিত্তি ঋণ বিতরণে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারছে না। ২০২৬ সালের জুন শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের স্থিতি ছিল ৪৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। এক বছর আগে এর পরিমাণ ছিল ৪৮ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।
ঋণ বিতরণে এমন ধীরগতি ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন অর্থায়নের চাহিদা, ব্যাংকগুলোর ঋণ অনুমোদনের নীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। আমানত সংগ্রহের সক্ষমতা থাকলেও নতুন ঋণের পরিমাণ না বাড়লে সুদ ও অন্যান্য ব্যাংকিং সেবা থেকে আয় সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। বিশেষত করপোরেট ব্যাংকিংয়ে বড় অঙ্কের লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে এর প্রভাব উল্লেখযোগ্য হতে পারে।
রফতানি আয় প্রত্যাবাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
মুনাফা কমলেও দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের অর্থপ্রবাহ সচল রাখতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে ৩৯৫ কোটি ডলারের রফতানি আয় দেশে এসেছে। দেশের মোট রফতানি আয়ের ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে এ ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে।
একই সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৪৬২ কোটি ডলারের আমদানি মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে, যা দেশের মোট আমদানি ব্যয়ের ১৩ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ দেশের মোট আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পরিচালিত হচ্ছে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে।
রফতানি আয় দেশে আনার ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশ আমদানি মূল্য পরিশোধের তুলনায় বেশি হলেও এই দুই প্রবাহের ব্যবধান দিয়ে সরাসরি তাদের বৈদেশিক মুদ্রার নিট অবদান নির্ধারণ করা যায় না। কারণ, লেনদেনের সময়, অর্থপ্রবাহের প্রকৃত পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনও এতে প্রভাব ফেলে।
তবে রফতানি আয় প্রত্যাবাসন, আমদানি অর্থায়ন ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক লেনদেন পরিচালনায় এসব ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। ফলে তাদের মুনাফা কমে যাওয়াকে শুধু ব্যাংকগুলোর নিজস্ব ব্যবসায়িক পরিস্থিতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়; দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
খেলাপি ঋণ বাড়লেও মূলধনে স্বস্তি
মুনাফা কমার পাশাপাশি বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হারও বেড়েছে। ২০২৬ সালের জুন শেষে এ হার দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে। এক বছর আগে তা ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ ঋণের মানে কিছুটা অবনতি হয়েছে। তবে দেশীয় ব্যাংকগুলোর তুলনায় বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে কম বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বড় করপোরেট ঋণগ্রহীতা, বহুজাতিক কোম্পানির সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং তুলনামূলক ভালো ঋণমানসম্পন্ন রফতানিমুখী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার কারণে এসব ব্যাংকের ঋণঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে। পাশাপাশি ঋণ অনুমোদনে সতর্কতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কারণে তাদের সম্পদের মানও অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থানে রয়েছে।
মূলধনের দিক থেকেও বিদেশি ব্যাংকগুলো শক্ত অবস্থানে রয়েছে। জুন শেষে তাদের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক ২১ শতাংশে। একই সময়ে টিয়ার-১ মূলধনের অনুপাত ছিল প্রায় ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এই অনুপাতগুলো ব্যাংকগুলোর আর্থিক ক্ষতি মোকাবিলা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির বিপরীতে সুরক্ষা বজায় রাখার সক্ষমতা নির্দেশ করে।
তারল্য পরিস্থিতিও সন্তোষজনক। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদের প্রায় অর্ধেকই তরল সম্পদ। পাশাপাশি গ্রাহক আমানতের পরিমাণ মোট ঋণের তুলনায় ২৮ শতাংশের বেশি। এসব সূচক থেকে বোঝা যায়, মুনাফা কমলেও ব্যাংকগুলো তাৎক্ষণিক তারল্যসংকট কিংবা মূলধন ঘাটতির মুখে পড়েনি।
২০২৬ সালের জুন শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ১০ হাজার ৬২১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ মুনাফার নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্যেও তাদের সম্পদের ভিত্তি বড় রয়েছে।
সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ আয় বাড়ানো
দেশে কার্যরত ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক ৬৭টি শাখার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেশের মোট আমানত ও ঋণে তাদের অংশ সীমিত হলেও বৈদেশিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং সেবায় তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এসব ব্যাংকের আয় ও মুনাফার ধারাবাহিকতা দেশের বাণিজ্যিক লেনদেনের পরিবেশের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যমান মূলধন ও আমানতের ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে আয় বাড়ানো। এ ক্ষেত্রে বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, শিল্প উৎপাদনে গতি ফেরানো এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নের চাহিদা বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি ঋণের মান বজায় রেখে নতুন ঋণ বিতরণ বাড়ানো এবং করপোরেট ব্যাংকিংয়ের বাইরে আয়বর্ধক সেবার সুযোগ সম্প্রসারণও প্রয়োজন হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, বিদেশি ব্যাংকগুলোর মুনাফা হ্রাস আর্থিক ভিত্তির তাৎক্ষণিক দুর্বলতার চেয়ে আয় সৃষ্টির সুযোগ সংকুচিত হওয়ার বিষয়টিই বেশি স্পষ্ট করছে। তবে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ও খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে মুনাফা পুনরুদ্ধার কঠিন হতে পারে। শক্তিশালী মূলধন ও পর্যাপ্ত তারল্য ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা করলেও টেকসই মুনাফার জন্য শেষ পর্যন্ত বৈদেশিক বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোই গুরুত্বপূর্ণ।


