সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

ভারতের বাজারে বাণিজ্য বাধা দূর করতে বাংলাদেশের জোর

অর্থজগত প্রতিবেদন
ভারতের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেও সীমান্তের বিধিনিষেধ, পণ্য প্রবেশে জটিলতা এবং বিভিন্ন অশুল্ক বাধা ব্যবসার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করে ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ করা, রফতানি প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা কাজে লাগাতে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে পাটপণ্য ও পেট ফিল্মের ওপর আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহার এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পরও বিদ্যমান শুল্কসুবিধা বহাল রাখার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের ১৬তম সভায় এসব প্রস্তাব তুলে ধরেছে বাংলাদেশ। দুই দিনব্যাপী এই বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা নিরসন, স্থলবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন, পণ্যের মানসংক্রান্ত জটিলতা কমানো এবং আঞ্চলিক পরিবহনব্যবস্থা সম্প্রসারণের বিষয়গুলো আলোচনায় স্থান পেয়েছে। গত ৮ অক্টোবর শুরু হওয়া এ সভায় দুই দেশই বাণিজ্য ও যোগাযোগের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের বিভিন্ন প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে।
বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্য ভারতের স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধিনিষেধ একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। এসব সীমাবদ্ধতার কারণে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রফতানিকারকদের পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে স্থলবন্দরভিত্তিক বিধিনিষেধ পর্যালোচনা করে তা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনার জন্য ভারতের কাছে তুলে ধরেছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি শুল্কের বাইরে যেসব প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা পণ্যের প্রবেশাধিকার সীমিত করে, সেগুলো দূর করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশি পাটপণ্য ও পলিমারভিত্তিক পেট ফিল্মের ওপর ভারতের আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়টি বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এসব পণ্যে অতিরিক্ত শুল্কের প্রভাব ভারতীয় বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতাকে কঠিন করে তুলতে পারে। ফলে শুল্ক প্রত্যাহারের উদ্যোগ সফল হলে সংশ্লিষ্ট রফতানি খাতের জন্য বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাজারসুবিধা। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন শর্ত ও প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। এ অবস্থায় ভারতের বাজারে বিদ্যমান শুল্কসুবিধা ধরে রাখা বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এ লক্ষ্যে সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড এরিয়া (সাফটা) চুক্তির আওতায় বর্তমানে পাওয়া সুবিধা উত্তরণের পরও অব্যাহত রাখার বিষয়টি আলোচনায় তুলেছে বাংলাদেশ। শুল্কসুবিধা বহাল রাখার পাশাপাশি ভারতীয় বাজারে পণ্য প্রবেশের প্রক্রিয়া সহজ করাও জরুরি। কারণ, কেবল শুল্ক কম থাকলেই রফতানি বাড়ে না; পণ্যের মান যাচাই, সনদ গ্রহণ, কাস্টমস ছাড়পত্র এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়াও ব্যবসার ব্যয় ও সময় নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
এ কারণে পণ্যের মান নির্ধারণে দুই দেশের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা এবং এক দেশের পরীক্ষার ফলাফল বা সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতির বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডসের (বিআইএস) প্রয়োজনীয় সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার প্রস্তাবও আলোচ্যসূচিতে রয়েছে। এ ধরনের জটিলতা কমানো গেলে রফতানিকারকদের সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি পণ্যের বাজারে প্রবেশের অনিশ্চয়তাও কমতে পারে।
ভারতের বাজারে প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোতে পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়ানোও বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ কৌশলের অংশ। এ ক্ষেত্রে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে নেপাল ও ভুটানে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলের সুযোগ সম্প্রসারণের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে এসব দেশে পণ্য পরিবহনের বিকল্প পথ তৈরি হবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
তবে আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সীমান্ত অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা কাটানো প্রয়োজন। স্থলবন্দরে প্রবেশপথের সক্ষমতা, ট্রাক রাখার জায়গা, গুদাম, পণ্য সংরক্ষণের শেড এবং পণ্য পরীক্ষা ও কোয়ারেন্টাইন সুবিধা পর্যাপ্ত না হলে সীমান্তে যানজট ও পণ্য খালাসে বিলম্ব তৈরি হয়। এসব সমস্যা পরিবহন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি পচনশীল পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য সরবরাহে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের সভায় ভারতের স্থল কাস্টমস স্টেশনগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে বাংলাদেশ। সীমান্তে পণ্য পরিবহন ও খালাসের সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ এবং কাস্টমস কার্যক্রমের দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে। স্থলবন্দরগুলোর কার্যক্ষমতা বাড়ানো গেলে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা কম সময়ে পণ্য পরিবহন করতে পারবেন, যা সামগ্রিক বাণিজ্য ব্যয় কমাতে সহায়ক হতে পারে।
বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়াতে দুই দেশের ব্যবসায়ী পর্যায়ে সরাসরি যোগাযোগ জোরদার করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। এ লক্ষ্যে সিইওস ফোরামকে কার্যকর করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। দুই দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, সম্ভাব্য বিনিয়োগ চিহ্নিত করা এবং বাণিজ্যিক সমস্যার সমাধানে এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে ভারতের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। বিশেষ করে তুলার সুতা ও অন্যান্য পণ্য বাংলাদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট স্থলবন্দরে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা প্রত্যাহারের বিষয়টি দেশটির আলোচ্যসূচিতে রয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে বাংলাদেশে পণ্য রফতানির প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।
দুই দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আখাউড়া-আগরতলা সংযোগসহ সংশ্লিষ্ট রুটগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ-ভারত রেল যোগাযোগের উন্নয়ন, বহুমাত্রিক পরিবহনব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং সীমান্ত হাটসংক্রান্ত বিষয়গুলোও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব উদ্যোগ কার্যকর হলে স্থলপথের পাশাপাশি রেল ও অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে পণ্য আনা-নেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভৌগোলিক নৈকট্য, বিদ্যমান পরিবহন সংযোগ এবং বড় বাজারের উপস্থিতি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের উল্লেখযোগ্য সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে শুধু বাণিজ্য চুক্তি বা শুল্কসুবিধার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। সীমান্তে পণ্য চলাচলের বিধিনিষেধ, অশুল্ক বাধা, সনদ গ্রহণের জটিলতা এবং অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর মতো সমস্যাগুলোরও কার্যকর সমাধান প্রয়োজন।
বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা ধরে রাখতে বাজারে প্রবেশের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বাণিজ্য ব্যয় নিয়ন্ত্রণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ভারতের সঙ্গে আলোচনায় উত্থাপিত প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশি রফতানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সুফল নির্ভর করবে আলোচনার সিদ্ধান্ত কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপর।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল বৈঠকে অংশ নিয়েছে। দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে স্থলবন্দর ব্যবস্থাপনা, পণ্য পরিবহন ও বাজারে প্রবেশাধিকারের সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর অগ্রগতি অর্জিত হলে তা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত