সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

লোকসানের চাপে ডাক বিভাগ, রূপান্তরের পথে ৫ হাজার আউটলেট

অর্থজগত প্রতিবেদন
একসময় মানুষের যোগাযোগের প্রধান ভরসা ছিল ডাকঘর। দূর গ্রামের স্বজনের কাছে চিঠি পাঠানো, মানি-অর্ডারে টাকা পাঠানো কিংবা সরকারি নথি হাতে পাওয়ার জন্য ডাক বিভাগের ওপরই নির্ভর করতে হতো সাধারণ মানুষকে। সময়ের পরিবর্তনে সেই নির্ভরতার জায়গা দখল করেছে মোবাইল ফোন, ডিজিটাল আর্থিক সেবা ও বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান। অথচ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহর পর্যন্ত বিস্তৃত ডাক বিভাগের অবকাঠামো এখনো রয়ে গেছে। রয়েছে বিপুলসংখ্যক কর্মী, হাজার হাজার ডাকঘর, বিস্তীর্ণ জমি এবং দেশজুড়ে যোগাযোগের একটি প্রতিষ্ঠিত নেটওয়ার্ক। কিন্তু এই বিশাল সক্ষমতাকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগিয়ে আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে জনসেবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় রাজস্ব আয় বাড়াতে পারছে না ডাক অধিদপ্তর। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে এবার পুরোনো ডাকঘরকেন্দ্রিক ব্যবস্থাকে আধুনিক লজিস্টিকস ও ই-কমার্স সেবায় রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। এর অংশ হিসেবে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করে আগামী পাঁচ বছরে ৫ হাজারের বেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি আউটলেট গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ডাক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির পেছনে সরকারের ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। বিপরীতে আয় হয়েছে প্রায় ২৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ব্যয় ও আয়ের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৮৭ কোটি টাকা। এর আগের পাঁচ বছরের আর্থিক চিত্রও একই ধরনের চাপের ইঙ্গিত দেয়। ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে ডাক বিভাগের মোট ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ১৮ কোটি টাকা। এ সময়ে আয় হয়েছে ১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। ফলে পাঁচ বছরে মোট আর্থিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা।
তবে ডাক বিভাগের এই আর্থিক চিত্রকে কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারি যোগাযোগ, গুরুত্বপূর্ণ নথি বিতরণ, পাসপোর্ট ও বিভিন্ন পরিচয়পত্র পৌঁছে দেওয়া এবং আর্থিক সেবার সুযোগ বিস্তারে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা রয়েছে। বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান যেখানে মূলত লাভজনক রুট ও ব্যবসাকেন্দ্রকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, সেখানে ডাক বিভাগকে দেশব্যাপী সেবা বজায় রাখতে হয়। ফলে একদিকে জনসেবার দায়বদ্ধতা, অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় মেটাতে আয় বাড়ানোর প্রয়োজন—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন অধিদপ্তরের বড় চ্যালেঞ্জ।
ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিকে গতিশীল করা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যেই ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল চালু করা হচ্ছে। পার্সেল পরিবহন ও বিতরণের পরিমাণ বাড়লে ডাকঘরের আয়ও বাড়বে এবং দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
পুরোনো ডাকঘরকে নতুন ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কে রূপান্তরের পরিকল্পনা
সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার ও ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত জুলাইয়ে আটটি আউটলেটের মাধ্যমে ফ্র্যাঞ্চাইজি কার্যক্রমের সূচনা হয়। এর মধ্যে চারটি ঢাকায় এবং চারটি ঢাকার বাইরে স্থাপন করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ধাপে ধাপে এই নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় বেসরকারি উদ্যোক্তারা নিজস্ব বিনিয়োগে ডাকসেবা কেন্দ্র পরিচালনা করবেন। চিঠিপত্র ও পার্সেল বুকিং, ই-কমার্সের পণ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ এবং গ্রাহকসেবার মতো কার্যক্রম থাকবে তাঁদের দায়িত্বে। অন্যদিকে ডাক অধিদপ্তর সরবরাহ করবে নিজস্ব নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সুযোগ ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস সহায়তা।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে এসব আউটলেট শুধু চিঠি বা পার্সেল বুকিংয়ের কেন্দ্র হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এগুলোকে ই-কমার্স পণ্য সংগ্রহের স্থান, স্থানীয় ডেলিভারি হাব, পেমেন্ট সেন্টার এবং পার্সেল বিতরণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। এতে একদিকে বিদ্যমান অবকাঠামোর ব্যবহার বাড়বে, অন্যদিকে নতুন শাখা স্থাপনে সরকারের সরাসরি বিনিয়োগের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কমতে পারে।
আগামী পাঁচ বছরে ৫ হাজারের বেশি আউটলেট চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এই পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ, সেবার মান, পার্সেল পরিবহনের দক্ষতা এবং গ্রাহকদের আস্থা অর্জনের ওপর। শুধু আউটলেটের সংখ্যা বাড়ালেই আয় বাড়বে না; প্রতিটি কেন্দ্রকে কার্যকর ব্যবসায়িক ইউনিটে পরিণত করতে হবে।
কর্মসংস্থান নিয়েও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালুর ফলে বর্তমান কর্মীদের চাকরি বহাল থাকবে। স্থায়ী কর্মীদের পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক ডেলিভারিম্যান ও আউটসোর্সিং কর্মীরাও এই কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারবেন। অধিদপ্তরের মতে, এতে বিদ্যমান কর্মীবাহিনীকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
দেশের অনেক গ্রামীণ ডাকঘর আগে থেকেই খণ্ডকালীন বা চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এসব কর্মী এক্সট্রা-ডিপার্টমেন্টাল বা ইডি স্টাফ হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে স্থায়ী কর্মীদের বড় অংশ সদর দপ্তর, সার্কেল অফিস ও বড় ডাকঘরগুলোতে দায়িত্ব পালন করেন। ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থায় এই বিদ্যমান কাঠামোর সঙ্গে নতুন বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সমন্বয় করতে হবে।
বিপুল অবকাঠামো, কিন্তু কাজে লাগছে না পুরো সক্ষমতা
প্রায় ৪০ হাজার কর্মী, ৯ হাজার ৮৪৮টি ডাকঘর এবং প্রায় ৪৩৯ একর জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে ডাক অধিদপ্তরের বিশাল নেটওয়ার্ক। দেশের এমন অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় ডাকঘর রয়েছে, যেখানে বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত কিংবা অনুপস্থিত। কিন্তু যোগাযোগপ্রযুক্তির পরিবর্তন এবং চিঠিপত্রের ব্যবহার কমে যাওয়ায় বহু শাখার নিয়মিত কাজ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
ভোলার চরফ্যাশনের দুলারহাট ডাকঘরের চিত্র এ সমস্যার একটি উদাহরণ। জরাজীর্ণ ভবনের বাইরে মরিচা ধরা পোস্টবক্স, অথচ ভেতরে চারটি কক্ষের মধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র একটি। সেখানে ২৪ বছর ধরে কর্মরত পিয়ন রফিকুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন এ ডাকঘরে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি চিঠি আসে। এসব চিঠির বড় অংশই ব্যাংক, এনজিও ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আইনি নোটিশ।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ ও উপ-ডাকঘরে ভবন, জমি ও জনবল থাকলেও দৈনন্দিন কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। কোথাও চিঠি আদান-প্রদান কমেছে, কোথাও আর্থিক লেনদেনের ধরন বদলেছে, আবার কোথাও পর্যাপ্ত বাণিজ্যিক কাজ না থাকায় অবকাঠামোর বড় অংশ অব্যবহৃত থাকছে।
অন্যদিকে ই-কমার্সের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে পণ্য সংগ্রহ, গুদামজাতকরণ, পরিবহন ও গ্রাহকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার বাজার বড় হয়েছে। এই বাজারে বেসরকারি কুরিয়ার ও লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। সংশ্লিষ্ট তথ্যে এ খাতের বাজারের আকার প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বিপরীতে ডাক বিভাগের বার্ষিক আয় মাত্র ২৫২ কোটি টাকার মতো।
যদিও দুই অঙ্কের মধ্যে সরাসরি তুলনা করতে হলে সেবার ধরন ও আয়ের হিসাবের পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন, তবু ব্যবধানটি ডাক বিভাগের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে। ডাক বিভাগের আয় শুধু চিঠি ও পার্সেল পরিবহন থেকে আসে না; সঞ্চয়পত্র, সরকারি ডাকটিকিট এবং দাপ্তরিক চিঠিপত্র-সংক্রান্ত ফিও এর অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ নতুন বাণিজ্যিক সেবা সম্প্রসারণের সুযোগ থাকলেও প্রচলিত আয়ের উৎসগুলো প্রত্যাশিত মাত্রায় বিস্তৃত হচ্ছে না।
এই অবস্থায় অব্যবহৃত ডাকঘরগুলোকে স্থানীয় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের পণ্য সংগ্রহ, প্যাকেজিং, বুকিং ও পরিবহনের কেন্দ্র হিসেবে এসব ডাকঘর ব্যবহার করা গেলে বিদ্যমান অবকাঠামো থেকেই নতুন আয়ের পথ তৈরি হতে পারে। তবে সে জন্য শুধু ভবন বা কাউন্টার সচল করাই যথেষ্ট নয়; নির্ভরযোগ্য পরিবহন, সময়মতো পণ্য পৌঁছানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
স্পিড পোস্টে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
প্রথাগত ডাকসেবার বাইরে পার্সেল ব্যবসা সম্প্রসারণের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে স্পিড পোস্টকে গুরুত্ব দিচ্ছে অধিদপ্তর। ২০১৮ সালে চালু হওয়া এই সেবা লজিস্টিকস ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যাশিত জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। এখন নতুনভাবে সেবাটি সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে।
নতুন ব্যবস্থায় ঢাকার মধ্যে ২৪ ঘণ্টা এবং জেলা শহরগুলোতে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ডেলিভারি নিশ্চিত করা গেলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অনলাইন বিক্রেতা এবং ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে বাড়তি পার্সেল পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত আট মাসে স্পিড পোস্টের মাধ্যমে প্রায় ৮৫০ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের মধ্যে সেবাটির ব্যবহারও বাড়ছে। তবে এই পরিমাণকে টেকসই প্রবৃদ্ধিতে রূপ দিতে হলে পণ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে শেষ পর্যায়ের ডেলিভারি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন।
ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, লজিস্টিকস ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে স্পিড পোস্ট আগে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। এখন সেবাটিকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি পার্সেল পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অধিদপ্তরের বিস্তৃত কার্যক্রমের পরিসরও কম নয়। প্রায় ১৮ হাজার কাউন্টারের মাধ্যমে বছরে আনুমানিক ৫ কোটি ডাকসামগ্রী প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। গত দুই অর্থবছরে প্রায় ৫৬ লাখ পাসপোর্ট, ৭ লাখ মৌজা ম্যাপ ও খতিয়ান এবং ১৫ লাখ টেলিফোন বিল বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত ১০ লাখের বেশি ড্রাইভিং লাইসেন্স ও ৭ কোটির বেশি স্মার্ট কার্ড পৌঁছে দিয়েছে ডাক বিভাগ।
এসব কার্যক্রম দেখায়, চিঠিপত্রের ব্যবহার কমলেও গুরুত্বপূর্ণ নথি ও সরকারি সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ডাক বিভাগের ভূমিকা রয়েছে। এই বিদ্যমান সক্ষমতার সঙ্গে ই-কমার্স পণ্য বিতরণ যুক্ত করা গেলে একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একাধিক ধরনের সেবা দেওয়া সম্ভব।
ডিজিটাল সেবায় অগ্রগতি, তবু বদলে যাচ্ছে গ্রাহকের চাহিদা
ডাক বিভাগের ব্যবসায়িক মডেলে পরিবর্তনের পেছনে প্রযুক্তিগত রূপান্তরও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক চিঠির ব্যবহার কমেছে। তার জায়গায় বেড়েছে ডিজিটাল যোগাযোগ। একইভাবে মানি-অর্ডারের প্রচলন কমেছে বিকাশ, নগদসহ মোবাইল আর্থিক সেবা এবং ব্যাংক ট্রান্সফারের বিস্তারের কারণে।
তবে সব ধরনের ডাকসেবায় একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। বাণিজ্যিক চিঠি, সরকারি নথি এবং পার্সেল পরিবহনের চাহিদা এখনো রয়েছে। ডাক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশে পাঠানো ডাকের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১৬ টন। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২৪৩ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ০৪ শতাংশ।
এ প্রবৃদ্ধি ডাক বিভাগের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক ডাকের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও সামগ্রিক আর্থিক ঘাটতি কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে সেবাটির ব্যয়, মাশুল ও কার্যক্রম পরিচালনার দক্ষতার ওপর।
প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ প্রায় সব ডাক কার্যক্রম এখন নিজস্ব ডেলিভারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সফটওয়্যারের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ডাকসামগ্রীর অবস্থান শনাক্ত করা এবং বিতরণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সুযোগ বেড়েছে। গ্রাহকদের কাছে সেবার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পার্সেল ট্র্যাকিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দারাজসহ বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের ফলে কিছু ডাকঘরে পার্সেল-সংক্রান্ত কাজও আসতে শুরু করেছে। কিন্তু কর্মকর্তাদের মতে, নতুন এই আয়ের উৎসগুলো এখনো পুরো নেটওয়ার্কের সক্ষমতা ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট নয়। কাজের পরিমাণ কম থাকায় কিছু উপ-ডাকঘরে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনও কমে এসেছে।
এখানেই ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের কার্যকারিতা যাচাইয়ের প্রশ্নটি সামনে আসে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা যদি স্থানীয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী গ্রাহক সংগ্রহ, পণ্য বুকিং ও বিতরণ পরিচালনা করতে পারেন, তাহলে কম ব্যবহৃত ডাকঘরগুলোকেও নতুন করে সক্রিয় করা সম্ভব। তবে বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণ, সেবার মান এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
আধুনিকায়নে বিনিয়োগ বাড়ছে, ব্যয়ের চাপও বড়
ডাক বিভাগের নেটওয়ার্ককে আধুনিক করতে পরিবহন, ডিজিটাল অবকাঠামো ও ডেলিভারি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। মেইল ভ্যান ও বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের অবস্থান শনাক্ত করতে ভেহিকেল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে পরিবহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, রুট ব্যবস্থাপনা এবং পণ্য পৌঁছানোর সময় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
মহাপরিচালকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাঠপর্যায়ের কার্যালয়গুলোতে ৫০০টি ডেস্কটপ কম্পিউটার, ৫০০টি ইউপিএস, ১০টি ল্যাপটপ এবং ৬ হাজার অ্যান্ড্রয়েড ফোন বিতরণ করা হয়েছে। ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নের কাছ থেকে পাওয়া ৪৩টি ডেলিভারি ভ্যান ও ৮০টি ইলেকট্রিক বাইকও বহরে যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি ৩৩টি জেলা ডাকঘর নির্মাণ এবং ১০০টি উপজেলা ডাকঘর সংস্কার করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে ই-কমার্স লজিস্টিকস, কোল্ড চেইন সুবিধা, পার্সেল ট্র্যাকিং, দ্রুত হোম ডেলিভারি, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। পাশাপাশি ডিজিটাল ঠিকানা ব্যবস্থা, অনলাইনে ডাক জীবনবিমা ও সঞ্চয় সেবা, বিল পরিশোধ এবং সরকারি তথ্যসেবা চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
বিশেষ করে কোল্ড চেইন সুবিধা চালু করা গেলে দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত আম, জামদানি ও হস্তশিল্প শহরের ক্রেতাদের কাছে কিংবা বিদেশের বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ডাক বিভাগের নেটওয়ার্ক সহায়ক হতে পারে। এতে স্থানীয় উৎপাদকদের বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়বে এবং ডাক বিভাগের জন্যও বাণিজ্যিক আয়ের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।
তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রয়োজন। অথচ সংস্থাটির মোট ব্যয়ের বড় অংশই বেতন ও পেনশন পরিশোধে চলে যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে বেতন ও পেনশন খাতে ব্যয় হয়েছে ৮১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৮ শতাংশই গেছে এই দুই খাতে। ফলে প্রযুক্তি উন্নয়ন, পরিবহন সম্প্রসারণ, ভবন সংস্কার ও নতুন ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বিনিয়োগের জন্য সীমিত অর্থ অবশিষ্ট থাকছে।
অবকাঠামো উন্নয়নে অতীতেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে। ২০২১ সালে আগারগাঁওয়ে ৯২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ডাক অধিদপ্তরের সদর দপ্তর ভবন উদ্বোধন করা হয়। এর আগে ২০১৯ সালে ঢাকায় ডাক বিভাগের কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণে ৩৭৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এসব বিনিয়োগের পাশাপাশি মূল ডাকসেবার আধুনিকায়ন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোর গতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
কারণ আধুনিক ভবন, কম্পিউটার কিংবা পরিবহন বাড়ানোই সেবার মান উন্নয়নের শেষ কথা নয়। এগুলোকে কাজে লাগিয়ে কত দ্রুত পার্সেল পৌঁছানো যাচ্ছে, গ্রাহক কত সহজে সেবা পাচ্ছেন এবং প্রতিটি কার্যক্রম থেকে কতটা আয় আসছে—সেই ফলাফলই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
জনসেবা ও বাণিজ্যিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য জরুরি
ডাক অধিদপ্তরের আর্থিক ঘাটতির পেছনে যেমন প্রথাগত ডাকসেবার সংকোচন রয়েছে, তেমনি রয়েছে এর জনসেবামূলক চরিত্র ও পরিচালন কাঠামোর সীমাবদ্ধতা। বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনক এলাকাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে এবং ব্যবসায়িক প্রয়োজন অনুযায়ী মাশুল নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু ডাক বিভাগকে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সেবা চালু রাখতে হয়। মাশুল পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও সরকারি অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।
মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম মনে করেন, ডাক অধিদপ্তরকে শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যের মাপকাঠিতে বিচার করা উচিত নয়। তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান দায়িত্ব জনগণকে সেবা দেওয়া; মুনাফা অর্জন করা নয়। ডাক মাশুল সামান্য বাড়ানোর ক্ষেত্রেও উচ্চপর্যায়ের সরকারি অনুমোদনের প্রয়োজন হয় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
এই বাস্তবতা ডাক বিভাগের সংস্কারকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে জনস্বার্থে সাশ্রয়ী সেবা বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ কমাতে আয় বাড়ানোর কার্যকর পথও তৈরি করতে হবে। এ দুই লক্ষ্যকে পরস্পরের বিপরীতে না রেখে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়াই প্রয়োজন।
ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল সেই সমন্বয়ের একটি সম্ভাব্য পথ। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ও তদারকির ওপর। উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর ব্যবসায়িক পরিবেশ, স্বচ্ছ চুক্তি, সেবার মান নির্ধারণ, প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার এবং সময়মতো ডেলিভারি নিশ্চিত করা না গেলে আউটলেটের সংখ্যা বাড়লেও প্রত্যাশিত আয় নাও আসতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যমান কর্মীদের দায়িত্ব ও নতুন উদ্যোক্তাদের কার্যক্রমের মধ্যে সুস্পষ্ট সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয়, ডাক বিভাগের শক্তি শুধু তার ভবন বা কর্মীর সংখ্যা নয়; দেশজুড়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং প্রত্যন্ত এলাকায় মানুষের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতা। এই সক্ষমতাকে আধুনিক লজিস্টিকস, ই-কমার্স ও ডিজিটাল সেবার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত সম্পদই নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে সংস্কার বিলম্বিত হলে প্রথাগত ডাকসেবার সংকোচনের সঙ্গে পরিচালন ব্যয়ের ব্যবধান আরও প্রকট হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। তাই ৫ হাজার ফ্র্যাঞ্চাইজি আউটলেটের লক্ষ্য পূরণ করার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হবে বিদ্যমান নেটওয়ার্ককে কতটা কার্যকর, গ্রাহকবান্ধব ও আর্থিকভাবে টেকসই করা যাচ্ছে। ডাক বিভাগকে জনসেবার দায়িত্ব বজায় রেখেই নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। সেই রূপান্তর কতটা সফল হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে দেশের এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত