সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

মেসির বিদায়ে নিকো পাজের আগমনী বার্তা

অর্থজগত ডেস্ক
লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির দিনে যেন একই সঙ্গে দেখা মিলল অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের। আকাশি-সাদা জার্সিতে মেসির দীর্ঘ ও বর্ণিল অধ্যায় যখন শেষের পথে, ঠিক তখনই নিকো পাজ নিজের পারফরম্যান্সে বুঝিয়ে দিলেন—মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার নেতৃত্ব দেওয়ার মতো প্রতিভা দলে তৈরি হচ্ছে।

বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচের ৬১ মিনিটে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় গোলটি তাই শুধু স্কোরলাইন বদলানোর মুহূর্ত ছিল না। সেটি হয়ে উঠেছে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রতীক। মেসির বিদায়ের আবহে নিকো পাজের সেই গোল যেন আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি প্রশ্নের উত্তরও দিয়ে গেল।

আর্জেন্টিনার পরবর্তী প্রজন্মের সম্ভাব্য ‘নাম্বার ১০’ হিসেবে এতদিন একাধিক তরুণের নাম আলোচনায় ছিল। পাউলো দিবালা, ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনো কিংবা থিয়াগো আলমাদার মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নিয়ে প্রত্যাশাও কম ছিল না। কিন্তু চলতি আন্তর্জাতিক উইন্ডোতে নিকো পাজ যেভাবে নিজেকে মেলে ধরেছেন, তাতে সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

এই সময়ে তিনটি গোল করার পাশাপাশি আরও একটি গোলে অবদান রেখেছেন পাজ। শুধু গোলসংখ্যা নয়, মাঠে তার প্রভাবও ছিল চোখে পড়ার মতো। গোল করা, সতীর্থকে গোলের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া এবং আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা—সব মিলিয়ে তিনি নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরেছেন।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে একই সময়ে গোল করা ও করানোর দক্ষতা খুব কম খেলোয়াড়ই দেখাতে পেরেছেন। মেসি ও দিয়েগো ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে এমন তুলনা স্বাভাবিকভাবেই বড় প্রত্যাশা তৈরি করে। সেই কারণেই গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাজকে ‘ভবিষ্যৎ নাম্বার ১০’ হিসেবে উল্লেখ করার বিষয়টিও বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে।

অবশ্য পাজের জন্য মেসির ছায়া নতুন কিছু নয়। প্রায় দুই বছর আগে আর্জেন্টিনা দলে অভিষেক হলেও মেসির সঙ্গে মাঠে তার খেলার সুযোগ হয়েছে মাত্র ৫৬ মিনিট। বলিভিয়ার বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচেই মেসির কাছ থেকে গোল করিয়ে নেওয়ার স্মৃতি অবশ্য এরই মধ্যে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু একজন সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে শুধু মেসির সঙ্গে সমন্বয় করলেই যে দায়িত্ব শেষ নয়, সেটি পাজও জানতেন।

নিজের গোল করার সামর্থ্য প্রমাণ করাটাই ছিল তার সামনে বড় পরীক্ষা। বেনিনের বিপক্ষে সেই পরীক্ষায় তিনি সফল হয়েছেন দৃঢ়ভাবেই।

ম্যাচের প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার আক্রমণ ছিল অনেকটাই মেসিকেন্দ্রিক। লাউতারো মার্তিনেজ থেকে হুলিয়ান আলভারেজ—আক্রমণভাগের খেলোয়াড়েরা বল পেলেই মেসিকে খুঁজছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে আর্জেন্টিনার আক্রমণ পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকা মেসির উপস্থিতিতে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু পাজ সেই প্রবাহের বাইরে গিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে খেলেছেন।

বক্সের ঠিক বাইরে ডান দিকের জায়গাটিতে বল পাওয়ার পর তিনি মেসিকে খোঁজেননি। বরং সরাসরি গোলের দিকে শট নেন। বলটি রক্ষণ ও গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বাঁক নিয়ে আর্জেন্টিনার বাম দিকের ওপরের কোণে গিয়ে জড়ায়। নিখুঁত সেই শটে ফুটে ওঠে একজন আত্মবিশ্বাসী তরুণের মানসিকতা।

গোলটির ধরনও আলাদা করে নজর কেড়েছে। মেসির ক্যারিয়ারে এমন বাঁক নেওয়া দূরপাল্লার শট বহুবার প্রতিপক্ষের জাল কাঁপিয়েছে। ২০১৪ বিশ্বকাপে ইরানের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের সেই বিখ্যাত গোলের কথাও মনে পড়ে যায়। পরিস্থিতি এক নয়, কিন্তু শটের সৌন্দর্য ও গোল করার কৌশলে মেসির ছাপ খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল না।

তবে এটিকে মেসির অনুকরণ হিসেবে দেখলে নিকো পাজের পারফরম্যান্সের গুরুত্ব কমে যায়। বরং তা হয়ে উঠেছে এক প্রজন্মের সঙ্গে আরেক প্রজন্মের প্রতীকী সংযোগ। যে মেসি প্রায় দুই দশক ধরে আর্জেন্টিনার আক্রমণের প্রধান ভরসা ছিলেন, তার বিদায়ের দিনে একজন তরুণ নিজের সামর্থ্যে দেখিয়ে দিলেন—সেই জায়গাটি একদিন নতুন কেউ পূরণ করার চেষ্টা করতে পারবেন।

মেসির জন্যও মুহূর্তটি ছিল আবেগের। আর্জেন্টিনার হয়ে তার শেষ অধ্যায়ের আবহে দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ছিল। বিশ্বকাপজয়ী দলের অনেক সদস্যই ধীরে ধীরে ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে পৌঁছাচ্ছেন। ফলে নতুন প্রজন্ম কতটা দ্রুত দায়িত্ব নিতে পারবে, সেটিই এখন আর্জেন্টিনার অন্যতম বড় প্রশ্ন।

নিকো পাজের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স সেই প্রশ্নের অন্তত একটি সম্ভাব্য উত্তর সামনে এনেছে।

মেসির যুগে আর্জেন্টিনা পেয়েছে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং একের পর এক সাফল্য। তার নেতৃত্বে দলটি দীর্ঘ অপেক্ষার পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের হারানো মর্যাদা ফিরে পেয়েছে। ফলে মেসির বিদায় কেবল একজন খেলোয়াড়ের বিদায় নয়; এটি আর্জেন্টিনার ফুটবলে একটি যুগের সমাপ্তি।

কিন্তু সেই সমাপ্তির দিনেই নিকো পাজের মতো একজন তরুণের উত্থান নতুন গল্পের সূচনা করছে। মেসি রেখে যাচ্ছেন যে উত্তরাধিকার, সেটি শুধু ট্রফি বা রেকর্ডে সীমাবদ্ধ নয়। তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সম্ভবত এমন একটি ফুটবল সংস্কৃতি, যেখানে আর্জেন্টিনার তরুণরা চাপের মধ্যেও নিজেদের প্রকাশ করার সাহস পায়।

বেনিনের বিপক্ষে পাজের গোল তাই শুধুই একটি গোল নয়। এটি ছিল দায়িত্ব বদলের প্রতীকী মুহূর্ত—মেসির পায়ের ছোঁয়ায় গড়ে ওঠা অতীতের পাশে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের এক তরুণের আত্মপ্রকাশ।

আর্জেন্টিনার অতীত মেসি, বর্তমান তারই গড়ে দেওয়া দল; আর ভবিষ্যতের সম্ভাব্য মুখগুলোর একজন নিকো পাজ। ৬১ মিনিটের সেই গোল যেন তিন কালকে একই বিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মেসির অধ্যায় শেষ হলেও আর্জেন্টিনার গল্প থামছে না—বরং নতুন নায়কের অপেক্ষায় সেটি প্রবেশ করছে নতুন এক সময়ে।

 

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত