অর্থজগত প্রতিবেদন
গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানোর পরও সংকট কাটছে না। বরং এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ দ্রুত বাড়ছে, অথচ শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি—কোথাও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কোথাও সরবরাহ কম, আবার কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে নির্ধারিত সময়ে শিল্প উৎপাদন চালানো কিংবা রান্নার চুলা জ্বালিয়ে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
ফলে একদিকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ব্যয়বহুল এলএনজি কিনতে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় শিল্প খাতকে উৎপাদন কমানো, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার এবং বাড়তি ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। অর্থাৎ গ্যাস সংকটের কারণে একই সঙ্গে বাড়ছে সরকারের আমদানি ব্যয় এবং বেসরকারি খাতের উৎপাদন ব্যয়।
এই পরিস্থিতিতে চড়া দামের স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা কমিয়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ বাড়ানোর দিকে যাচ্ছে সরকার। তুলনামূলক কম দামে নির্ধারিত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এতে আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ কমানোর সুযোগ রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি, এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, ভাসমান টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা এবং জরুরি মজুতের সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর গ্যাসব্যবস্থাকে এখনো ঝুঁকির মধ্যে রেখেছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, আমদানি বাড়িয়ে তাৎক্ষণিক ঘাটতি সামাল দেওয়া গেলেও দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন না বাড়লে এই সংকট দীর্ঘমেয়াদে আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, বিদ্যমান কূপের উৎপাদন বাড়ানো এবং সরবরাহ অবকাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানির একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
তিন মাসেই এক বছরের ভর্তুকির কাছাকাছি ব্যয়
পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকির জন্য ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। অথচ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩০ কার্গো এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের এলএনজি কেনাকাটির ব্যয়ই নির্ধারিত বার্ষিক ভর্তুকির কয়েক গুণ।
গত অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকি ছিল ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এলএনজি আমদানিতে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা গত পুরো অর্থবছরের ভর্তুকির প্রায় ৭১ শতাংশের সমান। একই ধরনের ব্যয়ের ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির প্রয়োজন ৪১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানির পরিমাণ, চুক্তিভিত্তিক সরবরাহ এবং স্পট মার্কেটের দামের পরিবর্তনের ওপর প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ নির্ভর করবে।
এই বাড়তি আর্থিক চাপ বিবেচনায় চলতি অর্থবছরে এলএনজি ভর্তুকির বরাদ্দ ২০ হাজার কোটি টাকা করার প্রয়োজনের কথা জানিয়ে জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। তবে সংশোধিত বাজেটের আগে বরাদ্দ বাড়ানোর সুযোগ নেই বলে অর্থ বিভাগ জানিয়েছে। ফলে অর্থবছরের বাকি সময়ে এলএনজি আমদানির অর্থ জোগান দেওয়া নিয়ে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এলএনজির ব্যয় যে গত কয়েক বছরে কতটা বেড়েছে, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় আমদানির পরিসংখ্যানেও। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১০ কার্গো এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪১ কার্গো এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১১ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে আমদানির পরিমাণ যেমন বেড়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারদর ও আমদানি ব্যয়ের চাপও বহুগুণে বেড়েছে।
স্পট মার্কেটে বাড়ছে ঝুঁকি
এলএনজির বাজার অন্যান্য অনেক জ্বালানির তুলনায় বেশি অস্থির। বিশেষ করে স্পট মার্কেটে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে কার্গো কেনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের সামান্য পরিবর্তনও বড় ধরনের ব্যয় তৈরি করতে পারে। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, উৎপাদনকারী দেশে সরবরাহ বিঘ্ন কিংবা শীত মৌসুমে চাহিদা বেড়ে গেলে দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগে বাংলাদেশ স্পট মার্কেট থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি প্রায় ১০ থেকে ১২ মার্কিন ডলারে কিনতে পারত। সাম্প্রতিক সময়ে সেই দাম বেড়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ ডলারে উঠেছে। চলতি অক্টোবরের জন্য কেনা কয়েকটি স্পট কার্গোর দামও প্রায় ২৭ থেকে ২৯ ডলার পর্যন্ত পড়েছে।
অন্যদিকে কিছু স্বল্পমেয়াদি ও চুক্তিভিত্তিক কার্গোর ক্ষেত্রে প্রতি এমএমবিটিইউ দাম প্রায় ২৫ দশমিক ২৬ থেকে ২৫ দশমিক ৩৫ ডলারের মধ্যে রয়েছে। এতে স্পট মার্কেটের তুলনায় চুক্তিভিত্তিক সরবরাহে কিছুটা কম খরচের সুযোগ দেখা যাচ্ছে। তবে সব কার্গোর ক্ষেত্রে একই হারে সাশ্রয় হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ ক্রয়ের সময়, সরবরাহের শর্ত, মূল্য নির্ধারণের সূত্র এবং পরিবহন ব্যয় ভিন্ন হতে পারে।
আরও বড় সমস্যা হলো, কম দামে চুক্তিভিত্তিক সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলেও কোনো কারণে সেই সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে তাৎক্ষণিক ঘাটতি মেটাতে আবার স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হয়। তখন বেশি দাম দিয়েই জ্বালানি কিনতে হয়। আবার কার্গো দেশে পৌঁছালেও ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা, আবহাওয়া বা অন্য কোনো কারণে তা জাতীয় গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব না হলে আমদানির পুরো ব্যয়ই কার্যত চাপ সৃষ্টি করে, কিন্তু তার বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত সরবরাহ পাওয়া যায় না।
স্পট কেনাকাটা কমানোর উদ্যোগ
ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ডিসেম্বর পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার পরিমাণ কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে পেট্রোবাংলা। তুলনামূলক স্থিতিশীল দামে সরবরাহ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক বাজারের নির্ভরযোগ্য ও সক্ষম সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বেশি দামের স্পট কার্গোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চুক্তিভিত্তিক সরবরাহের অংশ বাড়ানো।
তবে এই কৌশলেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নির্ধারিত সরবরাহকারী কোনো কার্গো দিতে ব্যর্থ হলে কিংবা চুক্তিভিত্তিক সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হলে জাতীয় চাহিদা পূরণে আবার স্পট মার্কেটে ফিরতে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সরকারের ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা অনেকটাই আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।
একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি বর্তমানে বন্ধ থাকলেও আগামী বছরের শুরুতে আবার চুক্তিভিত্তিক আমদানি শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে জ্বালানি বিভাগ। এটি বাস্তবায়িত হলে তুলনামূলক পূর্বানুমানযোগ্য দামে গ্যাস পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এর পাশাপাশি নতুন এলএনজি সরবরাহকারী তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। গত ২৯ আগস্ট সম্ভাব্য সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করা হয়। আবেদনের সময়সীমা কয়েক দফা বাড়িয়ে সর্বশেষ ১৯ অক্টোবর করা হয়েছে। তালিকাভুক্তির জন্য আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের অন্তত একটি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা এবং কমপক্ষে ৫ কোটি মার্কিন ডলারের আর্থিক সক্ষমতা থাকতে হবে। একক প্রতিষ্ঠান কিংবা যৌথ উদ্যোগ—দুই ধরনের আবেদনই গ্রহণযোগ্য। আগে তালিকাভুক্ত সরবরাহকারীদের নতুন করে আবেদন করার প্রয়োজন নেই।
শিল্পে গ্যাস সংকটের সরাসরি মাশুল
সরকারের জন্য এলএনজি আমদানির ব্যয় বাড়লেও শিল্প খাতে তার সুফল পুরোপুরি পৌঁছাচ্ছে না। বরং গ্যাসের চাপ ও সরবরাহের ঘাটতি উৎপাদন ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে। বিশেষ করে পোশাক ও নিটওয়্যার খাতের বিভিন্ন কারখানায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির কারণে কিছু পোশাক কারখানায় উৎপাদন একপর্যায়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। কিছু নিটওয়্যার কারখানায় উৎপাদন কমেছে ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। তবে এগুলো নির্দিষ্ট কারখানা ও উদ্যোক্তার অভিজ্ঞতা; পুরো শিল্প খাতের উৎপাদন একই হারে কমেছে—এমন সামগ্রিক হিসাব নয়।
গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে কারখানাগুলোকে উৎপাদন পরিকল্পনা বারবার পরিবর্তন করতে হচ্ছে। কোথাও একাধিক ধাপে উৎপাদন পরিচালনা করা হচ্ছে, কোথাও কম চাপের কারণে মেশিন পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এর ফলে উৎপাদনের সময় বাড়ছে এবং বাড়ছে শ্রম, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়।
নির্ধারিত সময়ে রফতানি পণ্য সরবরাহ করতে না পারার ঝুঁকিও বাড়ছে। বৈশ্বিক পোশাক বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় বাড়তি উৎপাদন ব্যয় সবসময় বিদেশি ক্রেতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে গ্যাস সংকটের মাশুল শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তার মুনাফা, নতুন বিনিয়োগ এবং শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর পড়ছে।
বিকল্প জ্বালানিতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
গ্যাসের চাপ কমে গেলে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলের মতো বিকল্প জ্বালানির দিকে যেতে হয়। এতে সরাসরি জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যায়। আবার গ্যাসের অভাবে উৎপাদন কমলেও কারখানার ভাড়া, শ্রমিকের মজুরি, ঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় একই থাকে। ফলে কম পরিমাণ পণ্যের ওপর একই স্থায়ী ব্যয় ভাগ হওয়ায় প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
এই বাড়তি ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়। রফতানি বাজারে দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে গেলে নতুন অর্ডার, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে কিছু কোম্পানি খুচরা মূল্য অপরিবর্তিত রেখে পণ্যের আকার বা পরিমাণ কমানোর মতো কৌশলও নিচ্ছে।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বড় ঘাটতি
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে বর্তমানে সর্বোচ্চ প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা যাচ্ছে। স্থানীয় গ্যাস উৎপাদনে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিলে কিংবা এলএনজি আমদানিতে কোনো বাধা তৈরি হলে সরবরাহ আরও কমে ২২৫ থেকে ২৩০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসতে পারে।
অর্থাৎ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েও এই ব্যবধান পুরোপুরি দূর করা যাচ্ছে না। ফলে এলএনজি আমদানিতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার পরও শিল্প ও আবাসিক গ্রাহকদের কাঙ্ক্ষিত সরবরাহ নিশ্চিত হচ্ছে না।
এই বাস্তবতায় সংকটটি শুধু আমদানির পরিমাণ বাড়ানোর নয়; বরং গ্যাসের পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা, দেশীয় উৎপাদন, আমদানি অবকাঠামো এবং সঞ্চালন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। কোনো একটি জায়গায় দুর্বলতা থাকলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে আমদানি করা এলএনজিও শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে পারে না।
আমদানিনির্ভরতার ফাঁদ থেকে বের হওয়ার প্রশ্ন
এলএনজি আমদানি তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাসের ঘাটতি সামাল দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলেও এটিকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওপর নির্ভরশীল এই ব্যবস্থা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ায় এবং বৈশ্বিক সংকট তৈরি হলে আমদানি ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের অস্থিরতা থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব। এজন্য পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন কূপ খনন, স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক অনুসন্ধান জোরদার এবং দ্রুত গ্যাস উত্তোলনের অবকাঠামো তৈরি করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি তাই একটি দ্বিমুখী চাপের চিত্র তুলে ধরছে—গ্যাস পেতে সরকারকে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, আবার সেই গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্প খাতকেও উৎপাদন কমিয়ে বা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আবাসিক গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি।
ফলে এলএনজি আমদানির ব্যয় কমানো নিছক বাজেট ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি এখন শিল্প উৎপাদন, রফতানি সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চুক্তিভিত্তিক আমদানি বাড়ানো সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে বড় ধরনের অগ্রগতি না হলে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও গ্যাস সংকট থেকে বের হওয়া কঠিনই থেকে যাবে।


