সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

ধীর প্রবৃদ্ধির ফাঁদে বাংলাদেশ

অর্থজগত প্রতিবেদন
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছর—দুই বছরেই দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। তবে ২০২৮ অর্থবছরে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়ে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে।

মঙ্গলবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে দেশের অর্থনীতির এই চিত্র উঠে এসেছে। ‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রফতানি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে।

বিশ্বব্যাংক ২০২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আগের হিসাবের তুলনায় ১ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬ অর্থবছরের পূর্বাভাসও শূন্য দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়েছে। অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাটির প্রত্যাশা আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে।

সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে, ২০২৩ সাল থেকেই বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতি ধীরে ধীরে কমছে। এর পেছনে জ্বালানি ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কারণে বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বেড়েছে।

অর্থনীতির দুর্বলতার আরেকটি বড় দিক হলো বিনিয়োগ ও রফতানির গতি কমে যাওয়া। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ব্যয় বৃদ্ধি উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে।

ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও অর্থনীতির গতি ফেরানোর পথে বড় বাধা হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। ঋণখেলাপির এই উচ্চ হার ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা, নতুন বিনিয়োগে অর্থায়ন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

রাজস্ব খাতেও পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং। জিডিপির তুলনায় বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ ৮ দশমিক ৩ শতাংশে রয়েছে, যা বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন। ২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে জিডিপির ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে, যেখানে আগের অর্থবছরে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার কারণে সরকারের উন্নয়ন ও বিনিয়োগ ব্যয়ও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তবে অর্থনীতির বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তির চিত্র রয়েছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উন্নতির কারণে বৈদেশিক লেনদেনের চাপ কিছুটা কমেছে। ফলে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে নানা দুর্বলতা থাকলেও বৈদেশিক খাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমের মতে, অর্থনীতিকে দীর্ঘস্থায়ী মন্দার ঝুঁকি থেকে বের করে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফেরাতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ব্যবস্থা এবং জ্বালানি খাতে দ্রুত ও বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। অর্থনীতির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার ক্ষেত্রেও এসব সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংস্থাটি।

অর্থনৈতিক ধীরগতির সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রভাব পড়েছে দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ অর্থবছরে দেশের দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত থমকে গেছে এবং নারীদের কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

দারিদ্র্য মোকাবিলায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এসব সুবিধা দরিদ্র মানুষের একটি বড় অংশের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক এখনো কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। ফলে বিদ্যমান সহায়তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে সুবিধা পৌঁছানোকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক অর্থনৈতিক চিত্র অবশ্য তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা সামান্য কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। সংস্থাটি মনে করছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বিস্তৃত ব্যবহার এ অঞ্চলের উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাসে বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা পুনর্গঠন। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কমানো, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা এবং সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়াতে না পারলে প্রবৃদ্ধির গতি দ্রুত ফেরানো কঠিন হতে পারে। ২০২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়ার পূর্বাভাস থাকলেও অর্থনীতিকে টেকসই উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে নিতে কাঠামোগত সংস্কারই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত