সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

টেকসই এলডিসি উত্তরণে বড় সংস্কারের উদ্যোগ

অর্থজগত প্রতিবেদন

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে জনগণ, বেসরকারি খাত, জাতিসংঘ, উন্নয়ন সহযোগী ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংককে একই কাঠামোর আওতায় এনে সমন্বিতভাবে কাজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন রপ্তানি বাজার সৃষ্টি এবং বাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণকে সংস্কারের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

রোববার সচিবালয়ে এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এসব পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য পাওয়া অতিরিক্ত তিন বছরকে শুধু সময় বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখতে চায় না সরকার। বরং এ সময়কে অর্থনীতির বিদ্যমান দুর্বলতা কাটিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি তৈরিতে কাজে লাগানো হবে।

উপদেষ্টা জানান, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র ও রপ্তানির প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ‘গ্র্যাজুয়েশন থেকে ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমি’তে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। তবে এ রূপান্তর হতে হবে টেকসই। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি সবচেয়ে বড় হওয়ায় অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।

প্রস্তুতির মেয়াদ বাড়ানোর পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিতুমীর। তাঁর মতে, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক দুর্বলতা দেশের অভ্যন্তরীণ ভঙ্গুরতা বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে সৃষ্ট বাহ্যিক চাপ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় বাড়তি সময়কে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সরকার শুরু থেকেই এলডিসি উত্তরণের পক্ষে রয়েছে বলে জানান তিনি।

সংস্কার পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে ব্যাংকিং খাত। এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অর্থায়ন সহজ করতে চায় সরকার। পাশাপাশি শিল্প ও উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর উদ্যোগও থাকবে।

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাণিজ্য সুবিধা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এসব চুক্তির মাধ্যমে বিদ্যমান বাজার সুবিধা ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে চায় বাংলাদেশ।

এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের সঙ্গে সরকারের সমন্বিত অংশীদারত্বকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতের সঙ্গে কার্যকর সমঝোতা ও সহযোগিতা ছাড়া এসব লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এলডিসি উত্তরণসংক্রান্ত আলোচনায় বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদেরও যুক্ত রাখা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত সংস্কার পরিকল্পনা সরকারের ‘থ্রি আর’ কৌশলের অংশ।

সরকারের উদ্যোগে পাঁচ পক্ষের অংশগ্রহণকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন তিতুমীর। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ উদ্যোগে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশের জনগণ, বেসরকারি খাত, জাতিসংঘ, উন্নয়ন সহযোগী এবং বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক। এমন সমন্বিত অংশীদারত্ব আগে দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার কার্যক্রমে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি)। আইএমএফের চলমান কর্মসূচিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর সহায়তাপুষ্ট সংস্কার উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় রাখার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হচ্ছে। জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে এসব সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, এর ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশের বিষয়ে আস্থা বাড়বে।

এদিকে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে জ্বালানি নিরাপত্তাকে অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে দেখছে সরকার। এ লক্ষ্যে মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে ভাসমান টার্মিনালের পাশাপাশি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়েও কাজ চলছে।

জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা ও সরবরাহের ঝুঁকি কমাতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখী করা এবং সরবরাহব্যবস্থার অপচয় ও সিস্টেম লস কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে মাতারবাড়ীকেন্দ্রিক অবকাঠামোর পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ শিল্পায়নের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন উপদেষ্টা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখাই যথেষ্ট নয়; দেশের উৎপাদন সক্ষমতা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, অবকাঠামোগত সুবিধা ও বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নও জরুরি। ফলে আগামী তিন বছরের প্রস্তুতি পর্ব বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সংস্কার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কার্যকর সমন্বয়ের ওপরই নির্ভর করবে টেকসই উত্তরণের সাফল্য।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত