সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

২৩ কোম্পানির ডিভিডেন্ড ঘোষণা নেই, লোকসানে নাজুক আর্থিক ভিত্তি

অর্থজগত প্রতিবেদন
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক দুর্বলতার চিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য তালিকাভুক্ত ২৩টি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীদের কোনো ধরনের ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেনি। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই লোকসান, তারল্যসংকট ও পরিচালনগত দুর্বলতায় ভুগছে। এমনকি মুনাফা অর্জন করেও কয়েকটি কোম্পানি ডিভিডেন্ড না দেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে টানা ডিভিডেন্ড দিতে ব্যর্থ হওয়ায় চারটি প্রতিষ্ঠানকে ‘বি’ ক্যাটাগরি থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, ৩০ জুন ২০২৬ সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক ফলাফল ও ডিভিডেন্ডসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেছে তালিকাভুক্ত শতাধিক কোম্পানি। এর মধ্যে ৮২টি প্রতিষ্ঠান নগদ কিংবা স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। বিপরীতে ২৩টি কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো ডিভিডেন্ড রাখেনি। এতে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের লোকসান, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামালের উচ্চমূল্য, উৎপাদনক্ষমতার অপর্যাপ্ত ব্যবহার এবং ব্যাংকঋণের বিপরীতে বাড়তি সুদের চাপ কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে অর্জিত আয় দিয়ে ব্যবসা সচল রাখা এবং দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড দেওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না।
নো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চিনি ও সিমেন্ট খাতের কয়েকটি কোম্পানির লোকসানের পরিমাণ বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি সর্বোচ্চ ৭২ টাকা ৩২ পয়সা লোকসান করেছে জিল বাংলা সুগার মিলস। মেঘনা সিমেন্টের শেয়ারপ্রতি লোকসান ৬৩ টাকা ৬৮ পয়সা, শ্যামপুর সুগার মিলসের ৪২ টাকা ৯৪ পয়সা এবং বসুন্ধরা পেপার মিলসের ৪২ টাকা ৭৪ পয়সা। এছাড়া জুট স্পিনার্সের শেয়ারপ্রতি লোকসান ৪০ টাকা ২০ পয়সা এবং রেনউইক যজ্ঞেশ্বরের ১০ টাকা ৬৩ পয়সা।
এদিকে শেয়ারবাজারের অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশও (আইসিবি) বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৭ টাকা ৫২ পয়সা। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) ৩৭ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে কমে ৩০ টাকা ২৬ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ইউসুফ গ্লাস, আজিজ পাইপস, ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক (আইএসএন), শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ ও বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমসের (বিবিএস) লোকসান আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে।
তবে লোকসানে থাকা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মুনাফা করেও ডিভিডেন্ড না দেওয়ার ঘটনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাড়তি অসন্তোষ তৈরি করেছে। দেশবন্ধু পলিমার বিদায়ী অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ৩ টাকা ১৫ পয়সা এবং মুন্নু অ্যাগ্রো ৪ পয়সা আয় করেছে। এরপরও প্রতিষ্ঠান দুটি কোনো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেনি। ফলে কোম্পানিগুলোর আয় ও ডিভিডেন্ড নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিনিয়োগকারীরা।
এদিকে টানা ডিভিডেন্ড দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ডিএসইর নিয়ম অনুযায়ী চারটি প্রতিষ্ঠানকে ‘বি’ ক্যাটাগরি থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমস, ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক, দেশবন্ধু পলিমার ও রাষ্ট্রায়ত্ত আইসিবি। নতুন শ্রেণিবিন্যাসের ফলে এসব কোম্পানির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা মার্জিন ঋণ সুবিধা পাবেন না। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে বিনিয়োগের সুযোগ আরও সীমিত হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর লোকসান, ডিভিডেন্ড না দেওয়া এবং আর্থিক সক্ষমতার অবনতি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটকে আরও গভীর করছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক করা না গেলে বাজারের সামগ্রিক পরিবেশে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু ডিভিডেন্ড ঘোষণা না করার বিষয়টি নয়, কোম্পানিগুলোর আর্থিক দুরবস্থার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করাও জরুরি। এ জন্য দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ও পরিচালন কার্যক্রমে কার্যকর নজরদারি, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বাস্তবসম্মত পুনর্গঠন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে মুনাফা অর্জনকারী কোম্পানিগুলোর ডিভিডেন্ড নীতিতেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত