অর্থজগত প্রতিবেদন
খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা, ঋণ আদায়ে স্থবিরতা এবং বিশাল মূলধন ঘাটতিতে গভীর আর্থিক সংকটে পড়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৩৮ শতাংশই এখন খেলাপি। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি আটকে রয়েছে মাত্র ২০ জন বড় ঋণগ্রহীতার কাছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব শীর্ষ খেলাপির কাছে বিপুল অঙ্কের পাওনা থাকলেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৩ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি ডাটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স বিভাগের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে রূপালী ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ১৯ হাজার ৮০৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৩৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকটির প্রকৃত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ২৬ কোটি টাকা।
ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের বড় অংশই কেন্দ্রীভূত রয়েছে কয়েকটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী গ্রুপের কাছে। শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে ব্যাংকটির পাওনা ৯ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা। অথচ জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ বিপুল অঙ্কের অর্থ আটকে থাকলেও তা উদ্ধারে কার্যকর অগ্রগতি নেই।
ঋণ আদায়ের চিত্রেও ক্রমাবনতির প্রবণতা স্পষ্ট। ২০২৪ সালে শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে ৪৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং ২০২৫ সালে ৩৬১ কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছিল ব্যাংকটি। কিন্তু চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আদায়ের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। অথচ ২০২৬ সালে ব্যাংকটির মোট ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে জুন পর্যন্ত আদায় হয়েছে মাত্র ৩৩০ কোটি টাকা।
রূপালী ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপিদের তালিকায় রয়েছে দেশের বেশ কয়েকটি পরিচিত শিল্প ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের কাছে ৯৯৪ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের কাছে ৯০৮ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে ব্যাংকটির। এ ছাড়া ক্রনি গ্রুপের কাছে ৮৭২ কোটি, জুট টেক্সটাইল মিলসের কাছে ৭২৪ কোটি, নূরজাহান গ্রুপের কাছে ৬৩০ কোটি, এইচএস কম্পোজিটের কাছে ৬২০ কোটি, মাদারীপুর স্পিনিংয়ের কাছে ৬১৮ কোটি, বদর স্পিনিংয়ের কাছে ৬০৪ কোটি, ডলি কনস্ট্রাকশনের কাছে ৫০৬ কোটি এবং সাত্তার গ্রুপের কাছে ৪০৩ কোটি টাকা আটকে রয়েছে।
অবশ্য ঋণ পুনঃতফসিলের কারণে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে খেলাপির তালিকা থেকে বের হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বসুন্ধরা পেপার মিলস, ইউনিভার্সেল মেডিকেল, বেনীটেক্স ও জুট টেক্সটাইল মিলস। তবে পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি অবস্থার পরিবর্তন হলেও ঋণের অর্থ বাস্তবে কতটা আদায় হচ্ছে, সেটিই এখন ব্যাংকটির জন্য বড় প্রশ্ন।
অন্যদিকে ঋণ আদায়ে দুর্বলতার মধ্যেও খেলাপি ঋণ অবলোপনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সালে ৫১৮ কোটি এবং ২০২৫ সালে ৪৯৪ কোটি টাকা অবলোপন করে ব্যাংকটি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই আরও ৪৯০ কোটি টাকা ব্যালান্স শিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অবলোপন করা ঋণ থেকেও অর্থ উদ্ধারের চিত্র হতাশাজনক। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এ খাত থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
আইনি প্রক্রিয়ায় আটকে থাকা ঋণের পরিমাণও বিশাল। অর্থঋণ আদালতে রূপালী ব্যাংকের ২ হাজার ৫৯৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার বিপরীতে পাওনার পরিমাণ ১২ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং অর্থ উদ্ধারে আইনি জটিলতা ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ এবং মূলধন ঘাটতির চাপের প্রভাব পড়েছে ব্যাংকটির আর্থিক ফলাফলেও। ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে ২৩৩ কোটি টাকা এবং নিট লোকসান হয়েছে ৩৯৭ কোটি টাকা। এর ফলে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বড় অঙ্কের ঋণ অনাদায়ী থাকলে ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ে। একই সঙ্গে মূলধন ঘাটতি ও লোকসানের কারণে নতুন বিনিয়োগ এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণ সরবরাহের সক্ষমতা কমে যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে এ ধরনের সংকট সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ায় ব্যাংকটির দুর্বল আর্থিক অবস্থার প্রভাব বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও শেয়ারদরেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে সংকটের মধ্যেও কৃষি খাতে ঋণ বিতরণে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে রূপালী ব্যাংক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪০০ কোটি টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫০৫ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে কৃষি খাতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকটির কার্যক্রম অব্যাহত থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যাংকটির আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর তদারকি জোরদার করেছে। প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন (পিসিএ) কাঠামোর আওতায় ব্যাংকটিকে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে নগদ অর্থ আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং আদায়ের স্থবিরতা কাটিয়ে ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


