অর্থজগত প্রতিবেদন
দেশের তৈরি পোশাক খাতে বছরের সর্বোচ্চ ক্রয়াদেশ আসার মৌসুমে শ্রম অসন্তোষ ও সহিংসতায় উৎপাদন কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ায় গতকাল রোববার সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও রাজধানীর মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের অন্তত ৫২৯টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন মালিকরা। এতে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানো এবং সম্ভাব্য রফতানি কার্যাদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পোশাক শিল্প মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, এসব কারখানায় কর্মরত রয়েছেন ১০ লাখের বেশি শ্রমিক। কয়েক দিন ধরে উত্তরা ও মিরপুরে সীমিত পরিসরে বিক্ষোভ চললেও শনিবার থেকে তা সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। গতকাল পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়ে সড়ক অবরোধ, কারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় রূপ নেয়। বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় পোশাক শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ ও পর্যালোচনার জন্য ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। গতকাল শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বোর্ড গঠনের তথ্য জানিয়ে শ্রমিকদের দ্রুত কাজে ফেরার আহ্বান জানান। তবে এ উদ্যোগের পরও শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক উৎপাদন পরিস্থিতি ফেরেনি।
এদিকে শ্রম অসন্তোষের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রী, শ্রম উপদেষ্টা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠকে শিল্পকারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। শ্রমমন্ত্রী জানান, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে একটি মহল অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে কি না, সে বিষয়টিও বৈঠকে আলোচনায় এসেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আজ সোমবার কারখানা মালিকদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জরুরি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
গতকাল সকালে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের মধ্য দিয়ে রাজধানীতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ অবরোধ সরাতে গেলে সংঘর্ষ শুরু হয়। একপর্যায়ে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। সন্ধ্যায় মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার জানান, সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ১৯ জনকে আটক করা হয়েছে।
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে শ্রমিকরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করলে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একটি কারখানার গুদামসহ তিনটি স্থানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে পুলিশ বক্স এবং আনসার একাডেমির সামনে পুলিশের একটি গাড়িতেও আগুন দেওয়া হয়। পরে জেলা পুলিশ, শিল্প পুলিশ, মেট্রোপলিটন পুলিশ ও বিজিবির সদস্যদের প্রচেষ্টায় বিকেল ৩টার দিকে শ্রমিকরা মহাসড়ক ছেড়ে যান।
অন্যদিকে সাভারের হেমায়েতপুরে একেএইচ গ্রুপসহ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় একটি কারখানার নিরাপত্তা চৌকিতে অগ্নিসংযোগ, কাচের প্যানেল ভাঙচুর এবং কারখানা চত্বরে থাকা যানবাহনে হামলার ঘটনা ঘটে। আশুলিয়ায়ও ৫০টির বেশি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
শ্রম অসন্তোষের সময়কাল নিয়ে পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। কারণ, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি কিংবা মার্চ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে পরবর্তী মৌসুমের কার্যাদেশ পাওয়ার প্রধান সময়। এ সময়ে সারা বছরের মোট রফতানি কার্যাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে। নারায়ণগঞ্জভিত্তিক ফকির ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফকির কামরুজ্জামান নাহিদ বলেন, পিক সিজনে এ ধরনের অস্থিরতা দেশের পোশাক রফতানিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যেসব ক্রেতা নতুন করে কার্যাদেশ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছিলেন, তাঁরাও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন।
কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব বিদেশি ক্রেতাদের সফরেও পড়েছে। গতকাল ইউরোপের একটি দেশের ক্রেতাদের প্রতিনিধিদল দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় পোশাক কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে দীর্ঘ সময় আটকে ছিলেন। ওই কারখানার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, প্রতিনিধিদলের সদস্যদের নিরাপত্তাজনিত কোনো সমস্যা না হলেও এ ঘটনায় বাংলাদেশের শিল্পপরিবেশ সম্পর্কে তাঁদের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। ভবিষ্যতে কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা গতকাল সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানান, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিলে কিংবা কারখানায় ভাঙচুর অব্যাহত থাকলে শ্রম আইন অনুযায়ী কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুসারে এ ধরনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। আজ সোমবার থেকে উৎপাদন স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তবে শ্রমিকরা কাজে না ফিরলে প্রতিদিন কারখানা চালু রাখা মালিকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশের রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাত থেকে রফতানি আয় হয়েছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের এই শিল্পে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে কর্মসংস্থান ও রফতানি আয়—উভয় ক্ষেত্রেই ঝুঁকি বাড়বে।
অন্যদিকে শ্রমিক নেতারা বর্তমান পরিস্থিতির জন্য মজুরি বোর্ড গঠনে সরকারের বিলম্বকে দায়ী করছেন। ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুর রহমান বলেন, গত দুই মাস ধরে শ্রমিক নেতারা দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। সময়মতো বোর্ড গঠন করা হলে পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলনে স্বার্থান্বেষী মহলের অনুপ্রবেশের আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এতে আন্দোলন সহিংসতার দিকে মোড় নিতে পারে এবং শ্রমিকদের দাবিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে মজুরি নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, বোর্ড গঠনে বিলম্ব এবং শিল্পাঞ্চলে সহিংসতা তৈরি পোশাক খাতকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা এখন শিল্পসংশ্লিষ্টদের বড় চ্যালেঞ্জ। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে দেশের প্রধান রফতানি খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ কার্যাদেশে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।


