অর্থজগত প্রতিবেদন
দেশের ব্যাংকিং খাতে আর্থিক দুর্বলতার প্রভাব এবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর ব্যয়ে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের ১০টি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক সিএসআর কার্যক্রমে ব্যয় করেছে মাত্র ১৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে এই ব্যাংকগুলোর ব্যয় ছিল ৩৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সিএসআর ব্যয় কমেছে প্রায় ১৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা বা ৫০ শতাংশ।
তবে ব্যয়ের উৎস বিশ্লেষণ করলে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি চিত্র সামনে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই ১০ ব্যাংকের সিএসআর ব্যয়ের প্রায় পুরোটাই এসেছে নিট মুনাফার বাইরে থাকা বিভিন্ন তহবিল থেকে। এর মধ্যে রয়েছে সন্দেহজনক আয়, জাকাত তহবিল এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায়কৃত ক্ষতিপূরণ। নিট মুনাফা থেকে সিএসআর ব্যয় করেছে কেবল স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, যার পরিমাণ মাত্র ৫ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা কমে যাওয়াই সিএসআর ব্যয়ে বড় ধরনের পতনের অন্যতম কারণ। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া, বিপুল প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ, মূলধন ঘাটতি এবং ঋণ বিতরণে স্থবিরতার কারণে ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা সংকুচিত হয়েছে। ফলে সামাজিক দায়বদ্ধতার কর্মসূচিতে অর্থ বরাদ্দের সক্ষমতাও কমেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের পুরো ব্যাংকিং খাত সিএসআর কার্যক্রমে ব্যয় করেছে ১১৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর—ছয় মাসে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ১৯৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় কমেছে প্রায় ৭৮ কোটি টাকা।
ব্যাংকভিত্তিক হিসাবের বাইরে সামগ্রিক চিত্রেও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর প্রাধান্য রয়েছে। জানুয়ারি-জুন সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলো সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে ১০৩ কোটি টাকা। বিদেশি ব্যাংকগুলোর ব্যয় ১৩ কোটি টাকা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ব্যয় মাত্র ১১ লাখ টাকা।
তবে সব ব্যাংক সামাজিক দায়বদ্ধতার কর্মসূচিতে অর্থ ব্যয় করেনি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ১৮টি ব্যাংক সিএসআর খাতে কোনো অর্থই দেয়নি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকও এ সময়ে সিএসআর ব্যয় করেনি।
শরিয়াহভিত্তিক ১০টি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক। এসব ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটি ব্যাংক পরবর্তী সময়ে একীভূত হয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করেছে।
গত বছরের একই সময়ে এই ১০ ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় ছিল ৩৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিট মুনাফা থেকে ব্যয় হয়েছিল ৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ২০ শতাংশ। বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থ এসেছিল সন্দেহজনক আয়, জাকাত তহবিল ও আদায়কৃত ক্ষতিপূরণ থেকে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে নিট মুনাফা থেকে সিএসআর ব্যয়ের পরিমাণ আরও নেমে এসেছে।
ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ‘সন্দেহজনক আয়’ বলতে এমন আয়কে বোঝায়, যা কোনো বিনিয়োগ বা লেনদেনের ত্রুটির কারণে শরিয়াহ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে বিবেচিত হয়। এ ধরনের অর্থ ব্যাংকের স্বাভাবিক মুনাফার অংশ হিসেবে গণ্য করা হয় না। একইভাবে ঋণ পরিশোধে বিলম্বের কারণে গ্রাহকের কাছ থেকে আদায়কৃত ক্ষতিপূরণের অর্থও ব্যাংকের মুনাফা হিসেবে দেখানো হয় না। এসব অর্থ সাধারণত পৃথক হিসাবে সংরক্ষণ করে দাতব্য ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হয়।
ফলে ইসলামী ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয়ের উৎসের ধরনটিও প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় কিছুটা আলাদা। বিশেষ করে কোনো ব্যাংকের নিট মুনাফা কমে গেলে সামাজিক দায়বদ্ধতার জন্য মুনাফা থেকে বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়। তখন শরিয়াহ অনুযায়ী দাতব্য কাজে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত অর্থই সিএসআর ধরনের কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে ওঠে।
ব্যাংকারদের মতে, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান আর্থিক সংকট সিএসআর কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম কামাল উদ্দিন জসিমের মতে, ব্যাংকের সিএসআর ব্যয়ের সক্ষমতা মূলত নিট মুনাফার সঙ্গে সম্পর্কিত। অতীতে ইসলামী ব্যাংকগুলো সামাজিক দায়বদ্ধতার বিভিন্ন কর্মসূচিতে তুলনামূলকভাবে বেশি অর্থ ব্যয় করলেও ঋণ অনিয়ম ও আর্থিক দুর্বলতার কারণে এখন অনেক ব্যাংকই সেই সক্ষমতা হারিয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থাও এই সংকটের গভীরতা নির্দেশ করছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত, ১৫টি বেসরকারি ও একটি বিদেশি ব্যাংকসহ মোট ২২টি ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা।
উচ্চ খেলাপি ঋণ, ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ, মূলধন ঘাটতি এবং দুর্বল সম্পদমান—সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোর আয় করার সক্ষমতা কমে গেছে। অনেক ব্যাংক পরিচালন পর্যায়ে মুনাফা করলেও খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন, অন্যান্য পরিচালন ব্যয় এবং সম্ভাব্য ঋণক্ষতির হিসাব সমন্বয়ের পর নিট লোকসানে চলে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মুনাফাভিত্তিক সামাজিক ব্যয়েও।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর গাইডলাইন অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে সাধারণভাবে তাদের বার্ষিক নিট মুনাফার ১ শতাংশ সিএসআর খাতে ব্যয়ের নির্দেশনা রয়েছে। একই গাইডলাইনে সিএসআর ব্যয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষায় ৩০ শতাংশ, স্বাস্থ্যসেবায় ৩০ শতাংশ, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ২০ শতাংশ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সমাজকল্যাণ, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াসহ অন্যান্য খাতে বাকি ২০ শতাংশ ব্যয়ের সুপারিশ করা হয়েছে।
কিন্তু চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের বাস্তব চিত্রে এই কাঠামোর সঙ্গে ব্যয়ের ভারসাম্য পুরোপুরি মেলেনি। মোট ১১৯ কোটি টাকার সিএসআর ব্যয়ের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবায় সর্বোচ্চ ৩৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বা ২৯ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। শিক্ষায় ব্যয় হয়েছে ২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা বা প্রায় ২০ শতাংশ। পরিবেশ সুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমন ও অভিযোজন কার্যক্রমে ব্যয় হয়েছে ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা বা ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। আর অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়েছে ৪৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৪০ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশই গেছে গাইডলাইনে নির্ধারিত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের বাইরে থাকা বিভিন্ন কার্যক্রমে। অন্যদিকে শিক্ষা ও পরিবেশ খাতে ব্যয়ের অংশ নির্দেশিত অনুপাতের তুলনায় কম।
ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিএসআর কার্যক্রমও বেশ সীমিত ছিল। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে ৩৪টি এনবিএফআই সম্মিলিতভাবে মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে। এর মধ্যে ২৬টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোনো অর্থই ব্যয় করেনি।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সিএসআর ব্যয় কমে যাওয়ার পেছনে কেবল ব্যাংকগুলোর সামাজিক কার্যক্রমে অনাগ্রহ দায়ী নয়; বরং এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত রয়েছে ব্যাংক খাতের আর্থিক সক্ষমতার অবনতি। খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতির চাপ যত বাড়ছে, ততই ব্যাংকগুলোর মুনাফা ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে। ফলে সামাজিক দায়বদ্ধতার জন্য বরাদ্দও সংকুচিত হচ্ছে।
বিশেষ করে যেসব ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল সম্পদমান, উচ্চ খেলাপি ঋণ ও লোকসানের চাপে রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সিএসআর এখন মূল ব্যবসায়িক অগ্রাধিকারের তুলনায় গৌণ হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সমাজকল্যাণের মতো খাতে ব্যাংকিং খাতের অর্থায়নের যে সামাজিক ভূমিকা থাকার কথা, সেটিও ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসছে।


