সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

১৭ বছর পর সরকারি বন্ড বাইব্যাক

অর্থজগত প্রতিবেদন
অভ্যন্তরীণ ঋণের চাপ সামলানো এবং সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে প্রায় ১৭ বছর পর ট্রেজারি বন্ড পুনর্ক্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ৮ অক্টোবর ৬ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকার দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড কিনে নেওয়ার জন্য নিলাম আয়োজন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০০৯ সালের পর এটিই সরকারি সিকিউরিটিজ পুনর্ক্রয়ের প্রথম উদ্যোগ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘লায়াবিলিটি ম্যানেজমেন্ট অপারেশন’ (এলএমও)-এর আওতায় এ নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। নিলামে অন্তর্ভুক্ত বন্ডগুলোর বার্ষিক কুপন রেট ১২ দশমিক ৩০ শতাংশ। এসব বন্ডের মেয়াদ আগামী ৬ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল। অর্থাৎ মেয়াদপূর্তির প্রায় এক মাস আগেই সেগুলো বাজার থেকে তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নিলাম ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীরা নিজেদের হাতে থাকা বন্ড সরকারকে কী দামে বিক্রি করতে চান, তা উল্লেখ করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র জমা দেবেন। প্রাপ্ত দর যাচাই-বাছাই করে সরকার নির্ধারণ করবে কোন প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে। ঘোষিত ৬ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকার পুরো বন্ডই যে পুনর্ক্রয় করা হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বাজারের সুদের হার, ইয়েল্ড এবং বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাবিত দামের ওপর ভিত্তি করে এর চেয়ে কম পরিমাণ বন্ডও কিনতে পারে সরকার।
মূলত সরকারের ঋণ পরিশোধের সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করাই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। বর্তমানে যে ঋণের বড় অংশ নির্দিষ্ট মেয়াদপূর্তিতে একসঙ্গে পরিশোধ করতে হয়, তার চাপ কিছুটা আগেই কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধের কারণে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় যে চাপ তৈরি হতে পারে, সেটিও ভাগ করে নেওয়া সম্ভব হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় এক মাস আগে বন্ড কিনে নেওয়ায় সরকারের সুদ ব্যয়ও কিছুটা কমতে পারে। কারণ পুরো মেয়াদ পর্যন্ত ১২ দশমিক ৩০ শতাংশ কুপন হারে সুদ পরিশোধের পরিবর্তে আগেই বন্ড নিষ্পত্তি করা হলে কার্যকর সুদ ব্যয় কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর পাশাপাশি বাইব্যাকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে ব্যাংকিং খাতের তারল্যে। বন্ড বিক্রি করে বিনিয়োগকারীদের হাতে নগদ অর্থ ফিরে আসবে, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অতিরিক্ত তারল্য তৈরি করতে পারে। এর ফলে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের ইয়েল্ডের ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরি হলে ভবিষ্যতে সরকার তুলনামূলক কম সুদে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের চাপও কমতে পারে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এটিকে এখনই নিয়মিত ঋণ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে না দেখে অনেকটা পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবেই বিবেচনা করছে। বাজারে এ ধরনের পুনর্ক্রয় কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে কাজ করে এবং বিদ্যমান বাজার কাঠামোর সঙ্গে এটি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—প্রথম নিলামের মাধ্যমে সে বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হবে। গত এপ্রিল মাসে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার তুলনামূলক বেশি থাকায় তখন এ ধরনের বাইব্যাক নিলামে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
সরকারি সিকিউরিটিজ পুনর্ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এটি নতুন কোনো ধারণা নয়। এর আগে ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে সর্বশেষ এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় প্রথম দিনেই চারটি বেসরকারি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোট ৫০৩ কোটি টাকার দরপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি বন্ডের ক্ষেত্রে এমন পুনর্ক্রয় কার্যক্রম দেখা যায়নি।
নতুন নিলামে প্রাইমারি ডিলার ব্যাংকগুলো সরাসরি অংশ নিতে পারবে। অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের সঙ্গে যুক্ত প্রাইমারি ডিলারের মাধ্যমে দরপত্র জমা দিতে পারবে। সরকার যে বন্ড কিনে নেবে, তার মূল্য পরিশোধের পাশাপাশি নিষ্পত্তির তারিখ পর্যন্ত বন্ডের অর্জিত সুদও পরিশোধ করা হবে।
বাজারের জন্য এর আরেকটি তাৎপর্য হলো, বন্ডধারীদের পোর্টফোলিও পুনর্বিন্যাসের সুযোগ বাড়বে। প্রয়োজন হলে বিনিয়োগকারীরা মেয়াদপূর্তির আগেই বন্ড বিক্রি করে তারল্য সংগ্রহ করতে পারবেন। ফলে সরকারি সিকিউরিটিজের বাজারে লেনদেনের সক্রিয়তা এবং তারল্য বাড়ানোর একটি নতুন পথও তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, প্রথম দফার এই বাইব্যাক শুধু নির্দিষ্ট একটি বন্ডের মেয়াদপূর্তির চাপ কমানোর উদ্যোগ নয়; বরং সরকারি ঋণের মেয়াদ, সুদ ব্যয়, বাজারের তারল্য এবং ভবিষ্যৎ ঋণ গ্রহণের ব্যয়—এই চারটি বিষয়কে একই কাঠামোর মধ্যে পরিচালনার একটি পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ। এর সাফল্য নির্ভর করবে বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ, গ্রহণযোগ্য ইয়েল্ড এবং সরকার কতটা কার্যকরভাবে পরবর্তী সময়ে এ ব্যবস্থাকে ঋণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে তার ওপর।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত