সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

৩৫৫ দিনের জটিলতা ভেঙে ১৪ দিনে ব্যবসা

অর্থজগত প্রতিবেদন
বাংলাদেশে ব্যবসা শুরুর দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া সহজ করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কোম্পানি নিবন্ধনের পর একের পর এক লাইসেন্স, ছাড়পত্র ও অনুমোদনের পেছনে সময় না দিয়ে উদ্যোক্তারা যাতে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকেই প্রয়োজনীয় সেবার জন্য আবেদন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে চালু করা হচ্ছে স্বতন্ত্র ‘বিজনেস আইডি’ ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে ব্যবসা শুরুর সময় বর্তমানের কয়েক মাস থেকে কমিয়ে মাত্র ১৪ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সংস্কার উদ্যোগটি বাস্তবায়নে যৌথভাবে কাজ করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইনভেস্ট বাংলাদেশ। ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবার একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাবিজ’-এর আওতায় তৈরি করা হচ্ছে ১৪ দিনের ‘বিজনেস রেডিনেস প্যাকেজ’। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বর্তমানে একটি কোম্পানি নিবন্ধনের পর বাস্তবে ব্যবসা শুরু করতে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স, ছাড়পত্র ও অনুমোদন সংগ্রহে গড়ে ৩৫৫ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়াটি ১৮০ দিনেও শেষ হয় না।
বর্তমান ব্যবস্থায় কোম্পানি নিবন্ধনের পর উদ্যোক্তাকে ট্রেড লাইসেন্স, করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন, ব্যাংক হিসাব খোলাসহ ব্যবসার ধরন অনুযায়ী অগ্নিনিরাপত্তা ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নিতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিভিন্ন খাতভিত্তিক লাইসেন্স ও অনুমোদন। একটি অনুমোদন পাওয়ার সঙ্গে অন্যটির পূর্বশর্ত জড়িত থাকায় পুরো প্রক্রিয়াটি অনেক সময় একটির পর একটি ধাপ পেরিয়ে এগোতে হয়।
এই জটিলতার বড় প্রভাব পড়ে আমদানি-নির্ভর ব্যবসায়। প্রয়োজনীয় কিছু লাইসেন্স ও ছাড়পত্র আবার আমদানি নিবন্ধন সনদ বা আইআরসি পাওয়ার পূর্বশর্ত। ফলে যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল কিংবা অন্যান্য উপকরণ আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খুলতেও উদ্যোক্তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। ব্যবসা শুরুর প্রথম পর্যায়েই দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগের গতি কমে এবং প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু পিছিয়ে যায়।
নতুন ব্যবস্থার মূল পরিবর্তন হবে এই ধারাবাহিক নির্ভরতা ভেঙে দেওয়া। ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য নাহিয়ান রহমান রচির মতে, সব কমপ্লায়েন্স বাতিল করার পরিবর্তে ব্যবসা শুরুর আগে যেসব শর্ত বাধ্যতামূলক, সেগুলোর কিছু যৌক্তিকভাবে কমানো হবে। কিছু শর্ত ব্যবসা শুরুর পর পূরণের সুযোগ দেওয়া হবে এবং যেসব প্রক্রিয়া পাশাপাশি সম্পন্ন করা সম্ভব, সেগুলো সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে।
এর কেন্দ্রে থাকবে একটি ইউনিক বিজনেস আইডি। কোনো উদ্যোক্তা কোম্পানি নিবন্ধনের জন্য আবেদন করলেই তার জন্য একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি হবে। পরবর্তী সময়ে ওই আইডি ব্যবহার করেই বিভিন্ন লাইসেন্স, ছাড়পত্র ও অনুমোদনের আবেদন করা যাবে। ফলে প্রতিটি সংস্থার কাছে একই তথ্য ও নথি আলাদাভাবে জমা দেওয়ার প্রয়োজন কমে আসবে।
একবার জমা দেওয়া তথ্য বিজনেস আইডির সঙ্গে যুক্ত থাকবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো সেই তথ্য ব্যবহার করতে পারবে। এতে একই উদ্যোক্তাকে বারবার একই কাগজপত্র জমা দেওয়ার ঝামেলা থেকে মুক্ত করার পাশাপাশি তথ্যের পুনরাবৃত্তিও কমবে।
শুধু আবেদন করার সুবিধাই নয়, নতুন ব্যবস্থায় পুরো ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার একটি ডিজিটাল রেকর্ডও তৈরি হবে। কোন অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, কোনটি বাকি, কোনো আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে কিংবা কোথায় আটকে আছে—এসব তথ্য উদ্যোক্তা একটি ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে দেখতে পারবেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কাছেও প্রক্রিয়াটির অগ্রগতি দৃশ্যমান থাকবে।
এর ফলে কোনো উদ্যোক্তা প্রাথমিক অনুমোদন নিয়ে ব্যবসার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে পরবর্তী কমপ্লায়েন্স সম্পন্ন না করলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও বিষয়টি জানতে পারবে। প্রয়োজনে পরিদর্শন বা যৌথ পরিদর্শনের মাধ্যমে পরবর্তী শর্ত পূরণ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকবে।
কমপ্লায়েন্স থাকবে, কমবে জটিলতা
সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনটি নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রথমত, প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্সের মান কমানো হবে না। দ্বিতীয়ত, ব্যবসা শুরুর পুরো প্রক্রিয়াকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। তৃতীয়ত, ব্যবসা শুরুর আগেই পূরণ করতে হয় এমন পূর্বশর্তের সংখ্যা পর্যালোচনা করে যৌক্তিকভাবে কমানো হবে এবং কিছু শর্ত পরবর্তী পর্যায়ে নেওয়া হবে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ব্যবসা শুরু করার পুরো প্রক্রিয়ার ধাপগুলো চিহ্নিত করে কোন জায়গায় কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তার ম্যাপিং শেষ করেছে। কিছু ক্ষেত্রে বিধিমালা পরিবর্তনের কাজও শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানি নিবন্ধন পুরোপুরি অনলাইনে নেওয়া, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা এবং লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার কাজ এগিয়ে চলছে।
ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট বা বিল্ডের চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান মনে করেন, ১৪ দিনে ব্যবসা শুরুর লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে পরিকল্পনার পাশাপাশি ডিজিটাল অবকাঠামোর সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, উদ্যোক্তা যেন অনলাইনে আবেদন করার পর প্রতিটি ধাপের অগ্রগতি ও পরবর্তী করণীয় জানতে পারেন, এমন একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা প্রয়োজন। সার্ভার ধীর হয়ে যাওয়া, সিস্টেম অচল হওয়া কিংবা তথ্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
ট্রেড লাইসেন্সের প্রয়োজন কতটা
নতুন উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। আবুল কাসেম খানের মতে, শুধু ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার বদলে একটি একক ব্যবসায়িক পরিচয় নম্বরের মাধ্যমে ব্যবসার বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
তার যুক্তি, একই পরিচয় নম্বর ব্যবহার করে উদ্যোক্তা অনলাইন ব্যবসা পরিচালনা, আমদানি-রফতানি, ব্যাংক হিসাব খোলা এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবা গ্রহণ করতে পারলে আলাদা আলাদা পরিচয় ও লাইসেন্সের প্রয়োজন কমবে। বিশেষ করে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ার পর কয়েক দশক আগে তৈরি অনেক নিয়ম ও লাইসেন্স বর্তমান অর্থনীতির বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের জন্য কোন কোন লাইসেন্স সবচেয়ে বেশি সময় ও হয়রানির কারণ হচ্ছে, তা খাতভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে চিহ্নিত করে অপ্রয়োজনীয় অনুমোদন বাদ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা। তাদের যুক্তি, দেশে বসে বিদেশে কোম্পানি খোলা তুলনামূলক সহজ হলেও নিজ দেশে ব্যবসা শুরু করতে যদি দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তাহলে বিনিয়োগের পরিবেশে তার প্রভাব পড়ে।
পুরোনো উদ্যোগের পর নতুন করে গতি
ইউনিক বিজনেস আইডি চালুর ধারণাটি অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০২১ সালে দেশের সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে একটি ইউনিক বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন ব্যবস্থার আওতায় আনার সুপারিশ করেছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সেই সুপারিশ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হলেও পরবর্তী সময়ে উদ্যোগটির দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
এরপর ২০২২ সালে ই-কমার্স ব্যবসার জন্য ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা ডিবিআইডি চালু করা হয়। তবে নতুন প্রস্তাবিত ব্যবস্থা শুধু ই-কমার্স নয়, সামগ্রিক ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার লক্ষ্যেই তৈরি হচ্ছে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানিয়েছে, ব্যবসা শুরুর সংস্কারের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের পর পর্যায়ক্রমে খাতভিত্তিক লাইসেন্সিং ব্যবস্থাও সহজ করা হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বাধীন কমিটি ইতোমধ্যে কয়েকটি অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করেছে।
সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী এক মাসের মধ্যে সংস্কারের কিছু প্রাথমিক ফল দৃশ্যমান করার লক্ষ্য রয়েছে। ছয় থেকে সাত মাসের মধ্যে বড় একটি অংশ বাস্তবায়ন এবং প্রায় এক বছরের মধ্যে পুরো ব্যবস্থাকে কার্যকর রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যবসা শুরুর সময় ৩৫৫ দিন থেকে ১৪ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্য তাই শুধু একটি নতুন ডিজিটাল আইডি চালুর বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু সংস্থার দীর্ঘদিনের অনুমোদন কাঠামো, বিধিমালা, লাইসেন্স ব্যবস্থা এবং সরকারি সেবার সমন্বিত ডিজিটাল রূপান্তর। উদ্যোগটি বাস্তবে কতটা দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে কার্যকর হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা শুরুর পরিবেশে এই সংস্কার কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত