অর্থজগত প্রতিবেদন
ডিম নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে নানা ধরনের প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি রয়েছে। বিশেষ করে দেশি বা উন্মুক্ত পরিবেশে পালিত মুরগির ডিম বেশি পুষ্টিকর কি না, ব্রয়লার মুরগির ডিম খাওয়া কতটা নিরাপদ, কিংবা মুরগিকে হরমোন দেওয়া হয় কি না—এসব প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। তবে পুষ্টিবিদদের ব্যাখ্যায় এসব ধারণার অনেকটাই বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
ফ্রি-রেঞ্জ নাকি ব্রয়লার—কোন ডিমে বেশি পুষ্টি?
উন্মুক্ত পরিবেশে পালিত মুরগি এবং পোল্ট্রি ফিডে বড় হওয়া মুরগির ডিমের মধ্যে পুষ্টিগত পার্থক্য খুব বেশি নয়। দুই ধরনের ডিমেই প্রায় সমপরিমাণ প্রোটিন থাকে। ফলে শুধু প্রোটিনের চাহিদা পূরণের জন্য তুলনামূলক বেশি দাম দিয়ে ফ্রি-রেঞ্জ ডিম কেনার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন পুষ্টিবিষয়ক পরামর্শক ডা. অরুণ কুমার। তবে মুরগির খাদ্যাভ্যাসের কারণে দুই ধরনের ডিমে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখা যেতে পারে। উন্মুক্ত পরিবেশে থাকা মুরগি ঘাস, পোকামাকড়সহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ার সুযোগ পায়। এ কারণে তাদের ডিমে কিছু ক্যারোটিনয়েড ও ওমেগা-৩ তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। ডিমের কুসুমের রঙেও সেই পার্থক্যের প্রতিফলন দেখা যায়। প্রাকৃতিক খাবারের কারণে উন্মুক্ত পরিবেশে পালিত মুরগির ডিমের কুসুম সাধারণত গাঢ় হলুদ বা কমলা দেখাতে পারে। অন্যদিকে পোল্ট্রি ফিডনির্ভর মুরগির ডিমের কুসুম তুলনামূলক হালকা হতে পারে। তবে কুসুমের গাঢ় রঙকে সরাসরি বেশি প্রোটিন বা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পুষ্টির প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ক্যারোটিনয়েড মূলত প্রাকৃতিক রঞ্জক পদার্থ, যা বিভিন্ন উদ্ভিদজাত খাবারে পাওয়া যায় এবং ডিমের কুসুমে হলুদ থেকে কমলা রঙ তৈরি করতে ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ কুসুমের রঙ অনেকাংশেই মুরগির খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই পুষ্টির দিক থেকে বড় কোনো ব্যবধান না থাকায় সাধারণ ভোক্তার জন্য ব্রয়লার মুরগির ডিম খাওয়াকে ক্ষতিকর মনে করার কারণ নেই। বিশেষ করে কেবল প্রোটিনের উৎস হিসেবে ডিম খেলে দুই থেকে তিন গুণ বেশি অর্থ খরচ করে ফ্রি-রেঞ্জ ডিম কেনার প্রয়োজন নেই বলে মত পুষ্টিবিশেষজ্ঞের।
‘মুরগিকে হরমোন দেওয়া হয়’—কতটা সত্য?
ডিমের পাশাপাশি মুরগির মাংস নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে—দ্রুত বড় করার জন্য মুরগিকে হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয়। এই ধারণার কারণেই অনেক ভোক্তার মধ্যে ব্রয়লার মুরগি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
ডা. অরুণ কুমারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মুরগি পালনে হরমোন ইনজেকশন দেওয়ার ধারণাটি মূলত একটি ভুল ধারণা। মুরগির দ্রুত বৃদ্ধির পেছনে জাত, সুষম খাদ্য, পরিচর্যা ও আধুনিক পোল্ট্রি ব্যবস্থাপনার ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে মুরগির বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে টিকা দেওয়া হয়। অনেক সময় এই টিকাকেই ভুল করে হরমোন ইনজেকশন হিসেবে মনে করা হয়। বাস্তবে মুরগির শরীরে হরমোন প্রয়োগ করে বাণিজ্যিকভাবে পালন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও বাস্তবসম্মত নয়। ফলে ব্রয়লার মুরগির দ্রুত বৃদ্ধিকে হরমোন প্রয়োগের ফল হিসেবে দেখার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
ডিম খেলে মেয়েদের বয়ঃসন্ধি আগে হয়?
মুরগির ডিম ও মাংস নিয়ে আরেকটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলো—এসব খাবার খাওয়ার কারণে মেয়েদের বয়ঃসন্ধি বা পিউবার্টি স্বাভাবিক সময়ের আগেই শুরু হয়। কিন্তু এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই বলে জানিয়েছেন ডা. অরুণ কুমার।
তার ব্যাখ্যায়, গত এক শতকে নিরামিষভোজী পরিবারগুলোর মেয়েদের মধ্যেও বয়ঃসন্ধির গড় বয়স কমেছে। ফলে শুধু ডিম, ব্রয়লার মুরগি বা মাংস খাওয়াকে মেয়েদের অপেক্ষাকৃত কম বয়সে বয়ঃসন্ধি শুরু হওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
মেয়েদের বয়ঃসন্ধির সময় নির্ধারণে পুষ্টি, শারীরিক বৃদ্ধি, জিনগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশ ও জীবনযাপনের মতো একাধিক বিষয় ভূমিকা রাখে। তাই একটি নির্দিষ্ট খাবারকে এর একক কারণ হিসেবে দায়ী করা বৈজ্ঞানিকভাবে যথেষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে ডিমের কুসুমের রঙ, মুরগির দ্রুত বৃদ্ধি কিংবা বয়ঃসন্ধির মতো বিষয়কে ঘিরে প্রচলিত অনেক ধারণার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার পার্থক্য রয়েছে। ডিমের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো খাদ্যমান, নিরাপদ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সঠিকভাবে রান্না করে খাওয়া। আর ফ্রি-রেঞ্জ ও ব্রয়লার ডিমের ক্ষেত্রে পুষ্টিগত পার্থক্য থাকলেও তা এতটা বড় নয় যে একটি ডিমকে অন্যটির তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন শ্রেণির খাবার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।


