সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারী নেই, কেন ফিরছে না আস্থা?

অর্থজগত প্রতিবেদন
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর সংকট নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়েও যদি দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর সামান্য একটি অংশ বাজারে সক্রিয় থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—সমস্যা কি মানুষের বিনিয়োগ-অনাগ্রহে, নাকি বাজার ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতায়? দেশে জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ১৯ কোটিরও বেশি। অর্থাৎ দেশের মানুষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের পরিধি বিশাল। অথচ শেয়ারবাজারে বেনিফিশিয়ারি ওনার (বিও) অ্যাকাউন্ট রয়েছে প্রায় ১৭ লাখ। এর অর্থ, জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম মানুষ সরাসরি শেয়ারবাজারের সঙ্গে যুক্ত।
বাস্তব চিত্র আরও সংকুচিত। একই ব্যক্তি একাধিক বিও অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করায় মোট অ্যাকাউন্টের সংখ্যা প্রকৃত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা নির্দেশ করে না। বাজারসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, সক্রিয় ও প্রকৃত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ২ লাখের বেশি নয়। অর্থাৎ প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশে শেয়ারবাজারের ওপর নির্ভরশীল বিনিয়োগকারীর অনুপাত দাঁড়াচ্ছে ০.১ শতাংশেরও কম। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং দেশের পুঁজিবাজারের গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশের মানুষ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে চান না—এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ ২০১০ সালের আগের বাজার। সে সময় বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ৩৩ লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ একসময় লাখ লাখ মানুষ শেয়ারবাজারকে নিজেদের সঞ্চয় ও সম্পদ তৈরির একটি সম্ভাবনাময় মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতেন। কিন্তু ২০১০ সালের ভয়াবহ দরপতন সেই আস্থায় বড় ধরনের আঘাত করে। বহু বিনিয়োগকারী তাদের সঞ্চয় হারান। অনেকে বাজার ছেড়ে বেরিয়ে যান। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এত বছর পরও সেই হারানো আস্থার জায়গাটি পুরোপুরি পূরণ হয়নি। এখানেই শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা—মানুষ একবার বাজারে এসে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তাকে ফিরিয়ে আনার মতো বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করা যায়নি।
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ মূলত আস্থার ব্যবসা। একজন মানুষ তার সঞ্চয়ের অর্থ কোনো কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করেন এই বিশ্বাসে যে কোম্পানির তথ্য সত্য, হিসাব নির্ভরযোগ্য, বাজারে কারসাজি নেই এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা তার অধিকার রক্ষা করবে।
বিভিন্ন সময়ে কিছু ব্রোকারেজ হাউস ও ফান্ড ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীর অর্থ নিয়ে অনিয়ম ও তহবিল তছরুপের অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও বিনিয়োগকারীর অর্থ আটকে গেছে, কোথাও প্রতিকার পেতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। একজন সাধারণ বিনিয়োগকারীর কাছে এর বার্তা খুবই সরল—শেয়ারবাজারে টাকা রাখা মানেই শুধু বাজারঝুঁকি নেওয়া নয়, ব্যবস্থাগত ঝুঁকিও নেওয়া। এই ভয় নতুন বিনিয়োগকারীকে বাজার থেকে দূরে রাখে।
শেয়ারবাজারের আরেকটি বড় দুর্বলতা কোম্পানি তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ায়। একটি কোম্পানি যখন বাজারে আসে, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীর প্রধান ভরসা থাকে তার আর্থিক প্রতিবেদন ও প্রকাশিত তথ্যের ওপর। কিন্তু কোনো কোম্পানি যদি দুর্বল আর্থিক ভিত্তি নিয়েও তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়, অথবা আর্থিক প্রতিবেদনে প্রকৃত চিত্র যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে সেই ঝুঁকির দায় শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীর ওপর। এখানে মৌলিক প্রশ্ন হলো—তালিকাভুক্তির আগে কোম্পানিকে যাচাই করার ব্যবস্থাই যদি যথেষ্ট কঠোর না হয়, তাহলে বাজারে আসার পর ক্ষতির দায় কে নেবে? একটি দুর্বল কোম্পানি ব্যর্থ হলে শুধু সেই কোম্পানির শেয়ারধারী ক্ষতিগ্রস্ত হন না; পুরো বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীর বিশ্বাসেও ধাক্কা লাগে।
শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম আকর্ষণ হলো লভ্যাংশ। কিন্তু ভালো ব্যবসা করা এবং বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ধরে রাখা অনেক কোম্পানিও বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেয় না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর ফলে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিনিয়োগকারী কোম্পানির ব্যবসা ভালো হলেও তার সুফল নিয়মিত পান না। তখন শেয়ার ধরে রাখার বদলে দ্রুত দর বাড়ার অপেক্ষা করেন। আর সেখান থেকেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সংস্কৃতির পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি জল্পনাভিত্তিক লেনদেন বাড়ে। অর্থাৎ ভালো কোম্পানির অভাবের পাশাপাশি ভালো কোম্পানির শেয়ার ধরে রাখার আর্থিক প্রণোদনাও দুর্বল।
বাজারের সবচেয়ে বিপজ্জনক বৈপরীত্যগুলোর একটি হলো—মৌলভিত্তি শক্তিশালী কোম্পানির তুলনায় দুর্বল ও কম পরিশোধিত মূলধনের কিছু শেয়ার কখনো কখনো বিনিয়োগকারীদের বেশি আকর্ষণ করে। এর পেছনে রয়েছে দ্রুত মুনাফার প্রত্যাশা। যখন কোনো ভালো কোম্পানির শেয়ার থেকে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন পাওয়া যায় না, তখন বিনিয়োগকারীর একাংশ কম দামের শেয়ারে দ্রুত লাভের সন্ধান করেন। এই প্রবণতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ পায় কারসাজিকারীরা। সীমিত সংখ্যক শেয়ার, কম লেনদেন এবং গুজব—এই তিনটি উপাদান একত্র হলে কোনো দুর্বল শেয়ারের দর কৃত্রিমভাবে বাড়ানো তুলনামূলক সহজ হয়ে পড়ে। সাধারণ বিনিয়োগকারী তখন বাড়তি দামের আশায় ঢোকেন। শেষ পর্যন্ত কারসাজি থামলে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েন তারাই।
এখানেই প্রশ্ন—বাজারে কারসাজির সুযোগ তৈরি হওয়ার আগেই তা শনাক্ত করার সক্ষমতা কতটা কার্যকর? আর কারসাজি শনাক্ত হওয়ার পর শাস্তি কতটা দ্রুত ও দৃশ্যমান?
শেয়ারবাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা শুধু আইন-কানুন তৈরি বা অনুমোদন দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাজারে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করাও তার দায়িত্ব, যেখানে বিনিয়োগকারী বিশ্বাস করতে পারেন যে নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। অতীতে মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ বাড়ানো, দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কোম্পানিকে বাজারে আসার সুযোগ দেওয়া কিংবা অনিয়মের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত বাজারে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। নিয়ন্ত্রকের সিদ্ধান্ত নিয়ে যখন বিনিয়োগকারীর মনে সংশয় তৈরি হয়, তখন বাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ—আস্থা—ক্ষয় হতে থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি বদলের কিছু ইঙ্গিত অবশ্য দেখা যাচ্ছে। জালিয়াতির শিকার বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর অর্থ পুনরুদ্ধার কেবল আর্থিক প্রতিকার নয়; এটি বাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও—অনিয়মের শিকার হলে বিনিয়োগকারী একেবারে অসহায় নন। ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর গঠিত নতুন বিএসইসি কমিশনও বাজার সংস্কারে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। বিনিয়োগকারীর স্বার্থ সুরক্ষা, তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করা এবং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগের ওপর। কারণ বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে সমস্যা নীতির অভাবে যতটা, তার চেয়ে কম নয় বাস্তবায়নের দুর্বলতায়।
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারী বাড়ানোর সহজ সমাধান হিসেবে নতুন বিও অ্যাকাউন্ট খোলার সংখ্যা বাড়ানোর কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু সেটি সমস্যার মূল সমাধান নয়। একজন মানুষকে বিও অ্যাকাউন্ট খুলিয়ে বাজারে আনা সহজ; তাকে বছরের পর বছর বাজারে ধরে রাখা কঠিন। সেজন্য প্রথমে প্রয়োজন বিনিয়োগের নিরাপদ পরিবেশ। ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে হবে। আর্থিক প্রতিবেদনকে নির্ভরযোগ্য করতে হবে। নিয়মিত ও যৌক্তিক লভ্যাংশ নিশ্চিত করতে হবে। কারসাজি ও গুজবনির্ভর লেনদেন বন্ধ করতে হবে। ব্রোকারেজ হাউস ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীর অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা হতে হবে দ্রুত ও দৃশ্যমান।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের পরিমাণ কম নয়। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কোটি কোটি হিসাব রয়েছে। কিন্তু সেই সঞ্চয়ের সামান্য অংশও যদি পুঁজিবাজারে প্রবাহিত না হয়, তাহলে বাজারের গভীরতা তৈরি হবে না। আর গভীরতা না থাকলে বড় কোম্পানির মূলধন সংগ্রহ, শিল্পায়নে অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ—সবকিছুই সীমিত থাকবে। এ কারণে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সূচক বাড়ানো নয়, লেনদেন বাড়ানোও নয়। চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্বাসযোগ্য বাজার তৈরি করা। ভারতে যেখানে জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ এবং নেপালে প্রায় ২৬ শতাংশ মানুষ শেয়ারবাজারে যুক্ত, সেখানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ১ শতাংশেরও নিচে—এটি শুধু তুলনামূলক পরিসংখ্যান নয়; বরং বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতার একটি স্পষ্ট সংকেত।বাংলাদেশের মানুষ বিনিয়োগ করতে চায় না—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তাই ভুল হবে। বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত, মানুষ কেন একবার বিনিয়োগ করে বাজার থেকে বেরিয়ে যায় এবং নতুন মানুষ কেন ঢুকতে ভয় পায়?
শেয়ারবাজারে নতুন বিনিয়োগকারী আনার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল বিজ্ঞাপন নয়, প্রচারণাও নয়। বরং এমন একটি বাজার তৈরি করা, যেখানে একজন সাধারণ মানুষ তার সঞ্চয়ের অর্থ বিনিয়োগ করে রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি সত্যিকার অর্থে বিনিয়োগকারীর অর্থ ও অধিকার সুরক্ষিত করতে পারে, দুর্বল কোম্পানিকে বাজারে প্রবেশের সুযোগ বন্ধ করতে পারে, কারসাজিকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারে এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে পারে—তাহলেই বদল আসবে। কারণ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারী কমে যাওয়ার মূল কারণ অর্থের অভাব নয়; আস্থার অভাব। আর সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে লাখ লাখ নতুন বিও অ্যাকাউন্ট খুলেও বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে প্রকৃত বিনিয়োগকারীর খরা কাটবে না।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত