অর্থজগত ডেস্ক
তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে (Mecca Joint Defense Agreement) যোগ দিতে ছয়টির বেশি দেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে নতুন কোনো দেশকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করার আগে বর্তমান তিন সদস্যের সম্মতি প্রয়োজন হবে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার এ তথ্য জানিয়েছেন।
গত ৭ আগস্ট মক্কায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চুক্তিতে সই করেন। চুক্তির মূল শর্ত হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার করাই চুক্তির প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ইসহাক দার জানিয়েছেন, চুক্তিটি পুরোপুরি আত্মরক্ষামূলক এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়। এর আওতায় নতুন সদস্য নেওয়ার বিষয়েও তিন দেশের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ছয়টির বেশি দেশ আগ্রহ দেখালেও চুক্তির কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হবে না। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন। চুক্তিকে কার্যকর রূপ দিতে ইতোমধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধানদের সমন্বয়ে গঠিত স্ট্র্যাটেজিক পলিটিক্যাল অ্যান্ড ডিফেন্স কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। চুক্তির অধীনে একটি স্থায়ী সচিবালয়, বিভিন্ন কমিটি ও ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
এরই মধ্যে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি চুক্তিটির বাস্তব প্রয়োগকে সামনে নিয়ে এসেছে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার পর ২৫ সেপ্টেম্বর রিয়াদে তিন দেশের সেনাপ্রধানরা বৈঠক করেন। সেখানে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক সমন্বয় এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা জোরদারে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয় আলোচনা হয়।
এ পরিস্থিতিতে চুক্তির আওতাধীন স্ট্র্যাটেজিক পলিটিক্যাল অ্যান্ড ডিফেন্স কমিটির উচ্চপর্যায়ের আরেকটি বৈঠক রিয়াদে বসার কথা রয়েছে। এতে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধানরা অংশ নেবেন। সাম্প্রতিক হুথি হামলা এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিই বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে, নিউইয়র্কে ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ইসহাক দারের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যকার সংঘাত রাজনৈতিকভাবে সমাধানের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেখানে মক্কা চুক্তির প্রতি পাকিস্তানের অঙ্গীকারের বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। ইরানের কর্মকর্তারা হুথি ও ইরাকি মিলিশিয়াদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বলেও দার জানিয়েছেন
চুক্তির ভবিষ্যৎ বিস্তারের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান এর আগে বলেছিলেন, এই উদ্যোগকে শুধু তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ভবিষ্যতে আরও আঞ্চলিক দেশকে এর আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও জানিয়েছিলেন, কয়েকটি দেশ এরই মধ্যে আগ্রহ দেখিয়েছে এবং মিসরকে সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ফলে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি এখন শুধু একটি ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা সমঝোতা নয়; এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সম্ভাব্য নতুন সদস্য এবং সৌদি আরবের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এটি মধ্যপ্রাচ্য ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে। তবে এর প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করবে তিন দেশের সামরিক সমন্বয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো এবং ভবিষ্যতে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর।


