অর্থজগহ ডেস্ক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য ছবি ছড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্যে যেমন বাস্তব ঘটনার ছবি রয়েছে, তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি ছবির সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। উন্নত এআই মডেলের কারণে এখন এমন বাস্তবসম্মত ছবি তৈরি করা সম্ভব, যা প্রথম দেখায় আসল না নকল—তা বোঝা কঠিন। বিশেষ করে কোনো ছবি ভাইরাল হয়ে গেলে যাচাই ছাড়াই সেটি সত্য বলে ধরে নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
তবে ছবির কিছু সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করলে কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবির সম্ভাব্য অসংগতি শনাক্ত করা যায়। যদিও কোনো একটি লক্ষণ দেখেই ছবিকে নকল বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
সবচেয়ে আগে নজর দেওয়া যেতে পারে হাত ও আঙুলে। এআই প্রযুক্তি আগের তুলনায় হাত তৈরিতে অনেক উন্নত হলেও জটিল ভঙ্গিতে এখনো ভুল হতে পারে। আঙুলের সংখ্যা, দৈর্ঘ্য, বাঁক, জোড়ার অবস্থান এবং হাতের স্বাভাবিক গঠন খেয়াল করা দরকার। একাধিক মানুষের হাত পরস্পরের সঙ্গে জড়ানো থাকলে অস্বাভাবিকতা বোঝার জন্য ছবিটি ভালোভাবে পরীক্ষা করা উচিত।
এরপর দেখা যেতে পারে চোখ, কান ও মুখের গড়ন। দুই চোখের আকার বা দৃষ্টির দিকের মধ্যে অসামঞ্জস্য, মুখের দুই পাশের অস্বাভাবিক ভারসাম্য, কানের গঠনে অসংগতি কিংবা চুলের সঙ্গে মুখ বা কানের অংশ অস্বাভাবিকভাবে মিশে যাওয়ার মতো বিষয় সন্দেহের কারণ হতে পারে। একইভাবে চশমা, কানের দুল বা অন্য ছোট আনুষঙ্গিক জিনিসের গঠনও পরীক্ষা করা দরকার।
ছবির ভেতরের লেখা এআই ছবি শনাক্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। নতুন প্রজন্মের এআই মডেল আগের তুলনায় পরিষ্কার ও বাস্তবসম্মত লেখা তৈরি করতে পারলেও কোথাও বানান ভুল, অর্থহীন শব্দ, অস্বাভাবিক অক্ষর বা বিকৃত লেখার উপস্থিতি দেখা যেতে পারে। তাই দোকানের সাইনবোর্ড, পোস্টার, বইয়ের প্রচ্ছদ, বিলবোর্ড কিংবা গাড়ির নম্বরপ্লেটের মতো জায়গাগুলোতে বাড়তি নজর দেওয়া উচিত।
আলো ও ছায়ার সামঞ্জস্য থেকেও কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। ছবির বিভিন্ন ব্যক্তি ও বস্তুর ওপর আলো একই উৎস থেকে পড়ছে কি না, ছায়ার দিক এবং দৈর্ঘ্য স্বাভাবিক কি না—এসব দেখা যেতে পারে। যেমন, মুখের ওপর আলোর দিক একদিকে হলেও শরীর বা আশপাশের বস্তুর ছায়া সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে গেলে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে এ ধরনের সামান্য অসংগতি দেখেই ছবিকে এআই-নির্মিত বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। বাস্তব ছবিতেও আলো, প্রতিফলন, ক্যামেরার অবস্থান বা সম্পাদনার কারণে কিছু পার্থক্য দেখা দিতে পারে।
শুধু ছবির ভেতরের বৈশিষ্ট্য নয়, ছবিটির উৎসও যাচাই করা জরুরি। কোনো ছবি প্রথম কোথায় প্রকাশিত হয়েছে, সেটি কত পুরোনো এবং ছবির সঙ্গে যে দাবি করা হচ্ছে তা অন্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যাচ্ছে কি না—এসব খুঁজে দেখা উচিত। প্রয়োজনে রিভার্স ইমেজ সার্চ ব্যবহার করে ছবিটির আগের সংস্করণ বা মূল উৎস খুঁজে বের করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পুরোনো কোনো বাস্তব ছবিকে নতুন ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—ছবি দেখতে অস্বাভাবিক লাগলেই সেটি নকল, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। এআই প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হচ্ছে। কয়েক মাস আগে যে ধরনের হাত, চোখ বা লেখা দেখে কৃত্রিম ছবি শনাক্ত করা যেত, ভবিষ্যতের উন্নত মডেলে সেই ত্রুটি নাও থাকতে পারে। ফলে শুধু দৃশ্যগত অনুমানের ওপর নির্ভর করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
বিশেষ করে কোনো ছবি যদি রাজনীতি, ধর্ম, যুদ্ধ, সামাজিক উত্তেজনা বা কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছড়ায়, তাহলে যাচাইয়ের মাত্রা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। ছবিটি কোথা থেকে এসেছে, কখন তোলা হয়েছে এবং ছবির সঙ্গে যুক্ত ঘটনাটি সত্যিই ঘটেছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি শেয়ার করার আগে তাই শুধু ছবির দৃশ্য নয়, ছবির উৎস, সময়, প্রেক্ষাপট এবং এর সঙ্গে যুক্ত দাবিও যাচাই করা জরুরি। কারণ এআইয়ের যুগে একটি ছবি বাস্তব দেখালেই তা বাস্তব হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। ছবির সত্যতা যাচাইয়ের সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো—চোখে দেখা দৃশ্যের পাশাপাশি ছবিটির পেছনের গল্পটিও যাচাই করা।


