সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

রমজানের আগে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব

অর্থজগত প্রতিবেদন
পবিত্র রমজান সামনে রেখে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণ দেখিয়ে ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে খেজুর আমদানিতে শুল্ক ছাড় এবং ফল আমদানিতে করব্যবস্থা সহজ করার দাবি জানিয়েছেন আমদানিকারকেরা। তবে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। খেজুরের শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাবটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে আলোচনা করে বিবেচনা করা হবে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রমজান সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি প্রস্তুতি, সরবরাহ পরিস্থিতি ও মূল্য পর্যালোচনায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। বৈঠকে ব্যবসায়ীরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার কারণে পণ্য পরিবহন জটিল হয়ে পড়েছে। বিকল্প পথে আমদানি করতে গিয়ে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়ছে। পাশাপাশি ঋণপত্র (এলসি) খোলার জটিলতা অব্যাহত থাকলে বাজারে পণ্য সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটতে পারে।
আমদানিকারকদের হিসাবে, খেজুর আমদানিতে বর্তমানে প্রায় ৫৫ শতাংশ শুল্ক ও কর দিতে হয়। এর সঙ্গে উচ্চ শুল্কায়নমূল্য ও পরিবহন ব্যয় যুক্ত হওয়ায় আমদানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তাদের দাবি, খেজুরের প্রকৃত মান ও বাজারমূল্য বিবেচনায় নিয়ে শুল্ক নির্ধারণ করা হলে আমদানি ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।
বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, মিসর, সৌদি আরব, ইরাক ও আলজেরিয়াসহ প্রায় এক ডজন দেশ থেকে বিভিন্ন মানের খেজুর আমদানি হয়। ফলে সব ধরনের খেজুরের জন্য একই শুল্কায়নমূল্য নির্ধারণ করলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। জাত, মান ও দামের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ ও যৌক্তিক শুল্ক কাঠামো নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। খেজুর আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক ছাড়ের সুবিধা দ্রুত কার্যকরের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
রমজানের পণ্য আমদানি বেড়েছে
বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বেড়েছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ২৩ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার টন। এ সময়ে ভোজ্যতেল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৮ লাখ ৫ হাজার টনের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ লাখ ৩১ হাজার টন বেশি।
একই সময়ে চিনি আমদানি হয়েছে ৬ লাখ ৮৭ হাজার টন, যা আগের বছরের তুলনায় ১ লাখ ৫৩ হাজার টন বেশি। চিনি আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৮ লাখ ১০ হাজার টনের।
রমজানে ইফতারের অন্যতম প্রধান উপকরণ ছোলার আমদানিতে আরও বড় প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ছোলা আমদানি হয়েছে ৮২ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল মাত্র ১২ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৭০ হাজার টন। এ সময়ে ছোলা আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার টনের।
এ ছাড়া মসুর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৪ হাজার টন বেশি। মসুর ডাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার টনের। অন্যদিকে খেজুর আমদানি হয়েছে ১১ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের ৪ হাজার টনের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।
ছোট ডাল মিল নিয়ে উদ্বেগ
রমজানে ছোলা ও মসুর ডালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দাম স্থিতিশীল রাখতে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে বড় ব্যবসায়ীদের প্রভাবের কারণে ছোট ডাল মিলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না বলে অভিযোগ করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বাংলাদেশ ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী নেসার উদ্দিন জানান, দেশে ছোলার চাহিদা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। অন্যদিকে মসুর ডালের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানি করে পূরণ করতে হয়। বড় ব্যবসায়ীদের কারণে সাধারণ ডাল মিলগুলোর ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ সমস্যা সমাধানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বৈঠকে জানানো হয়, বর্তমানে ছোলা ও মসুর ডাল আমদানিতে কোনো শুল্ক-কর নেই। তবে চিনি ও ফল আমদানির বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো যৌক্তিকভাবে সমন্বয় করা গেলে বাজারে দাম সহনীয় রাখতে সহায়তা হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল ও ছোলার দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও মসুর ডালের দাম কমেছে বলে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
ডিম-মুরগির সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার আশা
বৈঠকে পোল্ট্রি খাতের প্রতিনিধিরা জানান, দেশে ডিম ও মুরগির উৎপাদন পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে। খামার পর্যায়ে ডিমের দাম কিছুদিন আগের প্রতিটি সাড়ে ১১ টাকা থেকে কমে ১০ টাকার নিচে নেমেছে, যা উৎপাদন খরচের কাছাকাছি। খামারগুলোতে রোগবালাইয়ের উল্লেখযোগ্য প্রাদুর্ভাব না থাকায় উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা করছেন না তারা।
তবে রমজানে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে ডিমের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। ঈদের পর মুরগির চাহিদা বাড়লে বাজারদরেও প্রভাব পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিদ্যমান আমদানি নীতি অনুযায়ী, সরকারের বিশেষ অনুমতি ছাড়া ডিম ও মাংস আমদানি করা যায় না।
রমজানে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল, খেজুর, মুরগি ও ডিমের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে ইফতারসামগ্রী তৈরিতে ছোলা, চিনি ও ভোজ্যতেলের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। এ কারণে আগাম আমদানি, পর্যাপ্ত মজুত ও নির্বিঘ্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছে সরকার।
বৈঠকে ব্যবসায়ীদের সময়মতো পণ্য আমদানি এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার আহ্বান জানানো হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছে সরকার। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠন, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন, এনবিআর, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, এফবিসিসিআইসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত