সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানিতে এগোচ্ছে বাংলাদেশ

অর্থজগত প্রতিবেদন
আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর কাছে উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পোশাকের নির্ভরযোগ্য উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে। সাধারণ টি-শার্ট, শার্ট ও ট্রাউজারের মতো মৌলিক পোশাকের পাশাপাশি এখন জ্যাকেট, স্যুট, ব্লেজার, বিয়ের পোশাক এবং টেকনিক্যাল অ্যাপারেল তৈরি করছেন দেশের রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো। গত কয়েক বছরে বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কার্যাদেশ বৃদ্ধি পাওয়ায় পোশাকশিল্পের এ নতুন সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একসময় কম দামের পোশাকের উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ এখন প্রিমিয়াম পণ্যের বাজারেও অবস্থান শক্ত করছে। জার্মানির উচ্চমূল্যের পোশাকের ব্র্যান্ড হারকো গত ছয় মাস ধরে টিম গ্রুপের একটি কারখানায় পোশাক তৈরি করছে। একই সময়ে ডেনমার্কের বেস্টসেলার গ্রুপের মালিকানাধীন স্পেনভিত্তিক ব্র্যান্ড বালমোহকও বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় কারখানায় বটম প্যান্টসহ বিভিন্ন পণ্যের কার্যাদেশ দিয়েছে।
শুধু নতুন ব্র্যান্ড নয়, আগে থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা করছে—এমন আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও উচ্চমূল্যের পোশাকের কার্যাদেশ বাড়াচ্ছেন। রপ্তানিকারকদের তথ্যমতে, গত চার-পাঁচ বছরে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বাজারে এ ধরনের পোশাকের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের উৎপাদকদের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহও বেড়েছে। এনগেলবার্ট স্ট্রস, শোফেল, স্কট, কারহার্ট, মন্টবেল, ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট ও ৫.১১ ট্যাকটিক্যালের মতো ব্র্যান্ড সরাসরি কিংবা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বাংলাদেশের কারখানা থেকে পোশাক সংগ্রহ করছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক শেখ মুস্তাফিজের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে উচ্চমূল্যের পোশাকের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত অন্তত ২০টি নতুন ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে কার্যাদেশ দেওয়া শুরু করেছে। তবে ব্যবসায়িক গোপনীয়তার কারণে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ডের কার্যাদেশের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয় না।
বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানিতে উচ্চমূল্যের পণ্যের প্রকৃত অংশ কত, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে শিল্পোদ্যোক্তাদের ধারণা, গত এক দশকে এ ধরনের পোশাকের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিজিএমইএর সহসভাপতি মিজানুর রহমানের মতে, এক দশক আগে দেশের মোট পোশাক রপ্তানিতে প্রিমিয়াম পণ্যের হিস্যা ছিল প্রায় ৩ শতাংশ, যা বর্তমানে প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, কয়েকজন উদ্যোক্তার হিসাবে এ হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ, এমনকি ২০ শতাংশের কাছাকাছি হতে পারে।
বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণে দেখা যায়, আউটারওয়্যার, ড্রেসেস, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল ওয়্যার ও স্যুটের মতো উন্নত পোশাক ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ ছিল। অথচ একই সময়ে আন্তর্জাতিক তৈরি পোশাক বাজারে এসব পণ্যের সম্মিলিত হিস্যা ছিল ৩০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ, বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যের পোশাকের যে চাহিদা রয়েছে, তার তুলনায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো অনেক কম।
শেখ মুস্তাফিজের হিসাবে, এক দশক আগে বাংলাদেশ প্রায় ২০০ কোটি ডলারের উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানি করত। বর্তমানে সেই অঙ্ক ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট পোশাক রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৩৮৭০ কোটি ডলার। এর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ উচ্চমূল্যের পোশাকের হিস্যা হলে এ খাত থেকে আয় দাঁড়ায় প্রায় ৩৮৭ কোটি থেকে ৫৮১ কোটি ডলার।
উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে দেশের বেশ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী ইতিমধ্যে সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। টিম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বছরে প্রায় ১২ কোটি ডলারের জ্যাকেট ও বিভিন্ন ধরনের আউটারওয়্যার রপ্তানি হয়। এর প্রায় ৬০ শতাংশই প্রিমিয়াম পণ্য। গ্রুপটির মোট বার্ষিক রপ্তানি আয় ৩০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। টমি হিলফিগার, কেলভিন ক্লেইন, এনগেলবার্ট স্ট্রস, শোফেল, স্কট, কারহার্ট ও মন্টবেলের মতো ব্র্যান্ডে তাদের কারখানায় তৈরি পোশাক সরবরাহ করা হয়।
আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে অবস্থিত ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেড মূলত বিয়ের পোশাক তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটির তৈরি ব্রাইডাল ড্রেসের আন্তর্জাতিক খুচরামূল্য ৪০০ থেকে ১০০০ ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি পোশাক রপ্তানি করেছে, যার প্রায় পুরোটাই উচ্চমূল্যের পণ্য।
অন্যদিকে, এনার্জি প্যাক ফ্যাশনস লিমিটেডের বার্ষিক প্রায় ১০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানির ৯০ শতাংশই স্যুট ও ব্লেজার। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হুমায়ুন রশীদের তথ্যমতে, তাদের তৈরি কোনো কোনো ব্লেজারের খুচরামূল্য ৯০০ ইউরো পর্যন্ত। ইতালির ক্রেতারাও নিজস্ব নকশা ও কাপড় ব্যবহার করে বাংলাদেশের কারখানায় বিশেষায়িত পোশাক তৈরি করাচ্ছেন।
এ ছাড়া ইয়ংওয়ান করপোরেশন, ডিবিএল গ্রুপ, স্নোটেক্স, এপিলিয়ন, এসকিউ গ্রুপ, স্কয়ার, উর্মি, ইউনিভার্সাল, ফকির গ্রুপ ও অনন্ত গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠান উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে যুক্ত রয়েছে। দেশে প্রায় তিন হাজার রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা থাকলেও এর মধ্যে কতটি উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরি করে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, এ ধরনের কারখানার সংখ্যা ১০০-এর বেশি হতে পারে।
উদ্যোক্তাদের মতে, উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে ব্যবসায়িক মুনাফার চাপ। শ্রমিকের মজুরি, কাঁচামাল, জ্বালানি ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ পোশাকে প্রতিযোগিতামূলক দামে ব্যবসা করা কঠিন হচ্ছে। অনন্ত গার্মেন্টসের পরিচালক রিজওয়ান জাহির খানের মতে, সাধারণ পোশাকে মুনাফার হার ২ থেকে ৩ শতাংশে ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিপরীতে, প্রিমিয়াম পোশাকে ১০ শতাংশ বা তার বেশি মুনাফার সুযোগ রয়েছে।
উচ্চমূল্যের পোশাকের ক্ষেত্রে উন্নত মানের কাপড়, বিশেষায়িত উপকরণ, জটিল সেলাই, উন্নত ফিনিশিং ও নিখুঁত টেইলারিংয়ের প্রয়োজন হয়। ফলে এসব পণ্য উৎপাদনে কারিগরি দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কোনো বিশেষায়িত জ্যাকেটে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক ফাইবারের দাম প্রতি কেজিতে ১২০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যেখানে সাধারণ ফাইবারের দাম অনেক কম।
শুধু উৎপাদনমূল্য দিয়ে অবশ্য কোনো পোশাককে উচ্চমূল্যের বলা যায় না। ব্র্যান্ডের পরিচিতি, বাজারে পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং উৎপাদনে প্রয়োজনীয় শ্রমঘণ্টাও বিবেচনায় নেওয়া হয়। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রচলিত ধারণায়, আন্তর্জাতিক বাজারে ৫০ ডলারের বেশি খুচরামূল্যের পোশাককে অনেক ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে ব্র্যান্ডভেদে এ সংজ্ঞা ও মানদণ্ডে পার্থক্য রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে চীন, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ উচ্চমূল্যের পোশাকের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। তবে এসব দেশে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল গ্রহণ বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনতে গিয়ে ক্রেতারা এখন বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র খুঁজছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি রাজনৈতিক সমাবেশে পরা স্যুট বাংলাদেশের অনন্ত গ্রুপের কারখানায় তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কারখানার মালিকপক্ষ দাবি করেছে। একইভাবে, গত এপ্রিলে চাঁদ প্রদক্ষিণ করা মার্কিন নভোচারীদের পোশাকও বাংলাদেশের একটি কারখানায় তৈরি হয়েছিল বলে মালিকপক্ষ জানিয়েছে। এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিশেষায়িত পোশাক তৈরির সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।
তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। উচ্চমানের কাঁচামালের জন্য আমদানিনির্ভরতা, দক্ষ জনবলের ঘাটতি, উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের কম দামের পোশাক উৎপাদনকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ভাবমূর্তি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলতে মান নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো পণ্য সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখাও জরুরি।
রপ্তানিকারকদের মতে, বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে পরীক্ষামূলক কার্যাদেশ দিয়ে সন্তুষ্ট হওয়া আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের একটি অংশ এখন ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে। এতে ভবিষ্যতে উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সাধারণ পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিশেষায়িত ও প্রিমিয়াম পণ্যে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প শুধু রপ্তানি আয়ই বাড়াবে না, বৈশ্বিক বাজারে নিজের অবস্থানও আরও শক্তিশালী করতে পারবে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত