অর্থজগত প্রতিবেদন
স্থাবর সম্পত্তি কেনাবেচায় রাজস্ব ফাঁকি ও কালো টাকার প্রবাহ বন্ধ করতে জমি, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পত্তির দলিলে প্রকৃত বাজারমূল্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে প্রচলিত সর্বনিম্ন মৌজা মূল্যের পরিবর্তে বাস্তব বাজারদর নির্ধারণে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে। আগামী চার মাসের মধ্যে এসব কমিটির মাধ্যমে দেশের সব মৌজার জমি ও স্থাবর সম্পত্তির বাজারমূল্য নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির ভিত্তিতে ফি ও করের হার পুনর্নির্ধারণ করে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে তা কার্যকর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে জমি ও ফ্ল্যাটের দলিলে প্রকৃত লেনদেন মূল্যের পরিবর্তে সরকারি নির্ধারিত মৌজা মূল্য দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর জমির প্রকৃত বাজারদরের সঙ্গে সরকারি নির্ধারিত মূল্যের বড় ব্যবধান থাকায় সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে দলিলে প্রকৃত মূল্য উল্লেখ না করায় লেনদেনের একটি অংশ হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা সৃষ্টির সুযোগ বাড়াচ্ছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, কয়েকটি ধাপে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভার সুপারিশের ভিত্তিতে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী জমি ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হবে।
তিনি জানান, কমিটির মাধ্যমে বাজারমূল্য নির্ধারণের উদ্যোগটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা। দীর্ঘমেয়াদে সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণে বিজ্ঞানভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি গড়ে তোলা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের সহায়তায় একটি মডেল তৈরির কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে তা সম্পন্ন করার আশা করা হচ্ছে।
সরকারের এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সম্পত্তি হস্তান্তর থেকে সরকারের রাজস্ব উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়তে পারে। তবে শুধু বাজারমূল্য নির্ধারণ করলেই হবে না, জমি ও সম্পত্তি নিবন্ধন ব্যবস্থার আধুনিকায়নও জরুরি। বর্তমান নিবন্ধন প্রক্রিয়ার জটিলতা দূর করার পাশাপাশি মূল্যায়ন পদ্ধতিকে বিজ্ঞানসম্মত, সুনির্দিষ্ট ও দেশব্যাপী অভিন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও স্বার্থান্বেষী মহলের অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ বন্ধে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, এ সংস্কার কার্যকর হলে জমি কেনাবেচায় অবৈধ লেনদেন ও কালো টাকার প্রভাব কমানো সম্ভব হবে। তবে সে জন্য সম্পত্তির ধরন, ভৌগোলিক অবস্থান ও ব্যবহারভেদে সুস্পষ্ট মূল্যায়ন মানদণ্ড তৈরি করতে হবে। বাজারদরের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত মূল্য হালনাগাদ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে বাধ্যতামূলক গণশুনানির ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।
সরকারের এ উদ্যোগের পেছনে রয়েছে গত ১৬ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সভার সিদ্ধান্ত। পরবর্তী সময়ে ৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং আইন ও বিচার বিভাগের সচিবকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী, ভূমি মন্ত্রণালয়কে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও ডিজিটাল সংস্কারের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, আইন ও বিচার বিভাগকে মূল্যায়ন কমিটি গঠন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশের সব মৌজার প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভাগীয় কমিটিগুলো বড় শহরগুলোর জমি ও স্থাবর সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণ করবে। জেলা কমিটিগুলোর আওতায় থাকবে পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার সম্পত্তি। আর অন্যান্য এলাকার মূল্য নির্ধারণ করবে উপজেলা পর্যায়ের কমিটি।
মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে অতীতের নিবন্ধিত দলিল, সাম্প্রতিক জমি কেনাবেচার তথ্য, ভূমির শ্রেণি ও ব্যবহার, অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামোগত সুবিধা এবং সরকারি সংস্থা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত মূল্য বিবেচনায় নেওয়া হবে। পাশাপাশি স্থানীয় বাজার যাচাই ও গণশুনানির মাধ্যমে বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মৌজাভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের কাজ শেষ হলে ২০২৭ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সভায় নতুন নির্ধারিত মূল্যের ভিত্তিতে বিদ্যমান ফি ও কর কার্যকর করা হলে সম্পত্তি হস্তান্তরের মোট ব্যয় এবং সরকারের রাজস্ব আয়ে কী প্রভাব পড়বে, তা পর্যালোচনা করা হবে। এরপর প্রকৃত মূল্যে নিবন্ধন উৎসাহিত করা, সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ যৌক্তিক রাখা এবং সরকারের রাজস্ব স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে ফি ও করের হার পুনর্নির্ধারণ করা হতে পারে। নতুন হার ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে সম্পত্তির সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে ২০১০ সালের বিধিমালা অনুসরণ করা হয়। ২০১৫ সালের নভেম্বরে এ বিধিমালার একটি বিধি সংশোধন করা হলেও পরবর্তী সময়ে জমির বাজারদরের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সমন্বিতভাবে মৌজা মূল্য হালনাগাদ করা হয়নি। ফলে বিশেষ করে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে সরকারি নির্ধারিত মূল্য এবং বাস্তব বাজারদরের ব্যবধান ক্রমেই বেড়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মৌজা মূল্যের তথ্যেও এ ব্যবধানের চিত্র পাওয়া যায়। গুলশান সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আব্দুল্লাহপুর মৌজায় প্রতি শতাংশ বাড়ির জমির নির্ধারিত মূল্য ৩২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা, আনুল মৌজায় ১০ লাখ ১ হাজার টাকা, কড়াইল মৌজায় ২ লাখ ৯ হাজার টাকা, জোয়ার সাহারায় ২৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা, তেজগাঁও শিল্প এলাকায় ৩৬ লাখ ৩ হাজার টাকা, দক্ষিণখানে ১৫ লাখ ৮৭ হাজার টাকা এবং মহাখালী মৌজায় ৫৯ লাখ ৯ হাজার টাকা।
তবে এসব এলাকার প্রকৃত বাজারদর সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। অনলাইন সম্পত্তি বিক্রির বিজ্ঞাপনেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এন ব্লকে প্রতি কাঠা জমির দাম ১ কোটি ১৭ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে বলে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন রয়েছে। অন্যদিকে, ‘ঢাকা-মাওয়া সিটি’ প্রকল্পে প্রতি কাঠা জমি ৬০ লাখ টাকায় বিক্রির বিজ্ঞাপনও দেখা গেছে। তবে বিজ্ঞাপনে চাওয়া দাম এবং প্রকৃত লেনদেনের মূল্য এক নাও হতে পারে।রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যানেও এ খাতের গুরুত্ব স্পষ্ট। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধন ফি এবং কর থেকে সরকারের আয় হয়েছিল ১২ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে, সিপিডির এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিলে প্রকৃত মূল্য প্রতিফলিত না হওয়ায় সরকার বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সম্পত্তির প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণ ও দলিলে তা প্রতিফলিত করা গেলে একদিকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে, অন্যদিকে অপ্রদর্শিত অর্থের প্রবাহ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। তবে সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে মূল্যায়ন পদ্ধতির নির্ভুলতা, নিয়মিত হালনাগাদ, নিবন্ধন ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর এবং সর্বস্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর। একই সঙ্গে নতুন ফি ও করের হার এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে রাজস্ব বৃদ্ধি পায়, অথচ সাধারণ ক্রেতার জন্য বৈধভাবে সম্পত্তি কেনাবেচার ব্যয় অসহনীয় হয়ে না ওঠে।


