অর্থজগত প্রতিবেদন
মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে সরকারি ঋণের হার দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশের তুলনায় কম বাংলাদেশের। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশের সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশে থাকতে পারে। বিপরীতে, প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে এ হার ৭০ শতাংশ থেকে ১৩০ শতাংশেরও বেশি। তবে ঋণের অনুপাত কম থাকলেই অর্থনীতি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত—এমনটি বলা যায় না। ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, রাজস্ব আয় এবং ঋণের অর্থ ব্যবহারের দক্ষতাও অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আইএমএফের প্রাক্কলিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ হতে পারে। একই সময়ে ভারতে এ হার ৮৩ শতাংশ, পাকিস্তানে ৭০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৯৫ শতাংশ, মালদ্বীপে ১৩১ শতাংশ এবং ভুটানে ১১৬ শতাংশ হতে পারে। নেপালের ক্ষেত্রে ঋণের অনুপাত প্রায় ৪৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
এই পরিসংখ্যান বলছে, জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশের সরকারি ঋণ ভারতের অর্ধেকেরও কম। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার তুলনায়ও বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক। অন্যদিকে, মালদ্বীপ ও ভুটানের সরকারি ঋণ তাদের বার্ষিক অর্থনৈতিক উৎপাদনের আকার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে আঞ্চলিক তুলনায় বাংলাদেশের সরকারি ঋণের অনুপাত কম থাকাকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
তবে ঋণের অনুপাতের এই ব্যবধান দিয়ে কোনো দেশের সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা পুরোপুরি বিচার করা সম্ভব নয়। সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে রাজস্বের কত অংশ ব্যয় হচ্ছে, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান কতটা পর্যাপ্ত এবং সরকারের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য কেমন—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা, উন্নয়ন ব্যয়ের চাহিদা এবং ঋণের সুদ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ বিবেচনায় নিয়ে ঋণ ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত কম থাকার একটি সুবিধা হলো, প্রয়োজনের সময় সরকার উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থায়নের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি নীতিগত সুযোগ পেতে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে ঋণ ব্যবহার করা সম্ভব। তবে ঋণ নিয়ে এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে, যেগুলো দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে, অপরিকল্পিত ঋণ গ্রহণ, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং ব্যয়ের অদক্ষতা ঋণের সুফল কমিয়ে দিতে পারে। কোনো প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় বা অর্থনৈতিক সুফল না মিললেও ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের দায় সরকারকে বহন করতে হয়। এতে ভবিষ্যতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয়ের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আহরণ বাড়ানো। কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকলে উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি প্রতিরোধ, করজাল সম্প্রসারণ এবং অপ্রদর্শিত আয় ও সম্পদ শনাক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ রাজস্ব আয় বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে সীমিত সম্পদ থেকে সর্বোচ্চ সুফল পাওয়া যায়।
ঋণ ব্যবস্থাপনায় বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের ভারসাম্য রক্ষা করাও জরুরি। অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণের ফলে ব্যাংকিং খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য ঋণপ্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আবার বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে বিনিময় হার দুর্বল হলে ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যায়। তাই ঋণের উৎস, সুদের হার, পরিশোধের সময়সীমা এবং সম্ভাব্য বৈদেশিক মুদ্রাঝুঁকি বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির দামের ওঠানামা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থায়ন ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সতর্ক ঋণনীতি অনুসরণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জিডিপির অনুপাতে সরকারি ঋণ তুলনামূলক কম থাকা দেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় অবস্থান তৈরি করেছে। তবে এই সুবিধা ধরে রাখতে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা জোরদার করতে হবে।
সব মিলিয়ে, দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশের তুলনায় বাংলাদেশের সরকারি ঋণের অনুপাত কম হলেও এটিকে আত্মতুষ্টির কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এ অবস্থানকে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। ঋণ গ্রহণের পরিমাণের চেয়ে ঋণের অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তা ভবিষ্যৎ আয় ও উৎপাদন বাড়াতে কতটা ভূমিকা রাখছে—সেই বিবেচনাই বাংলাদেশের টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।


