সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

২০৩০ সালের মধ্যে একক ১৫% ভ্যাট চালুর পরিকল্পনা

৫০০টির বেশি পণ্য ও সেবায় করছাড় প্রত্যাহারের উদ্যোগ, সুরক্ষায় থাকবে নিত্যপণ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত
অর্থজগত প্রতিবেদন
দেশের রাজস্ব আয় বাড়াতে মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) বিদ্যমান ছাড় ও অব্যাহতি পর্যায়ক্রমে তুলে নিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে একক ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রস্তাব অনুযায়ী, অধিকাংশ পণ্য ও সেবাকে অভিন্ন হারের আওতায় আনা হলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, কৃষি উপকরণ, গণপরিবহন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতকে এই হারের বাইরে রাখার চিন্তা রয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে একদিকে রাজস্ব আদায়ের পরিধি বাড়তে পারে, অন্যদিকে বহু পণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের বিরোধিতার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।

রাজস্ব খাতের সংস্কার নিয়ে সম্প্রতি ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কারিগরি কমিটির সঙ্গে বৈঠকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রতিনিধিরা ভ্যাট অব্যাহতি পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহারের প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক সময়সূচি ও সম্ভাব্য পণ্য-সেবার তালিকাও উপস্থাপন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। রাজস্ব সংস্কার এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় আগামী নভেম্বরে আইএমএফের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফরের সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমানে ইলেকট্রনিক পণ্য, কম্পিউটার সামগ্রী, মেট্রোরেল, রেস্তোরাঁ, স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়াপারসহ ৫০০টির বেশি পণ্য ও সেবায় ২ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাসকৃত ভ্যাট হার কিংবা সম্পূর্ণ অব্যাহতির সুবিধা রয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব সুবিধার একটি বড় অংশ ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবাকে ১৫ শতাংশ অভিন্ন ভ্যাট হারের আওতায় আনা হবে।

রাজস্ব কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আইএমএফ বাংলাদেশের কাছে জানতে চেয়েছে, কীভাবে নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়িয়ে কর অব্যাহতির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। এর জবাবে সরকার একটি পর্যায়ভিত্তিক পরিকল্পনা দিয়েছে। তবে সব ধরনের ছাড় একসঙ্গে তুলে না নিয়ে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় কিছু খাতকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে অনুমোদিত ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোসহ ব্যাংকিং ও জ্বালানি খাতে সংস্কারের অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু বিভিন্ন সংস্কার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অগ্রগতি প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় নতুন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ঘোষণা করলেই হবে না; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তার বাস্তবসম্মত রূপরেখাও প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে একক ভ্যাট হার চালুর প্রতিশ্রুতি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা নির্ভর করবে সরকারের বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর। আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কোন কোন সংস্কার সম্পন্ন করা সম্ভব, সে বিষয়ে সরকারকে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার দিতে হবে। পাশাপাশি করছাড় প্রত্যাহার করলে অতিরিক্ত কত রাজস্ব আসবে, তারও নির্ভরযোগ্য হিসাব উপস্থাপন জরুরি।

এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিভিন্ন করছাড় ও রেয়াতের কারণে ভ্যাট খাতে রাজস্ব হারানোর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা ওই সময়ের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। একই অর্থবছরে ভ্যাট থেকে প্রকৃত রাজস্ব আদায় হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, অব্যাহতি ও রেয়াতের কারণে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রকৃত আদায়ের চেয়েও বেশি। অন্যদিকে, সামগ্রিক করছাড়ের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। এই বিশাল রাজস্ব সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

তবে করছাড় প্রত্যাহারের প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ওপর। ইলেকট্রিক্যাল সামগ্রী, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার আনুষঙ্গিক পণ্য, রড-স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, রেস্তোরাঁ, নন-ব্র্যান্ডের পোশাক, সমুদ্রগামী জাহাজ এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত লিফটের মতো খাতে বর্তমানে বিভিন্ন হারে রেয়াতি সুবিধা রয়েছে। এসব সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা আর নবায়ন না করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবার উৎপাদন ব্যয়, বিক্রয়মূল্য কিংবা ভোক্তার খরচ বাড়তে পারে।

পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য চালু থাকা প্যাকেজভিত্তিক ভ্যাট ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা। এর পরিবর্তে তাঁদেরও অভিন্ন হারের আওতায় আনার চিন্তা করছে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর বিদ্যমান হ্রাসকৃত ভ্যাট হারও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও উৎপাদন খাতে ভ্যাট সুবিধা কমানো হলে তার প্রভাব অন্যান্য পণ্য ও সেবার মূল্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

অন্যদিকে, নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ এড়াতে কিছু খাতে ছাড় অব্যাহত রাখার প্রস্তাব রয়েছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, লবণ ও মরিচের মতো মৌলিক খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য ও কৃষি উপকরণকে সুরক্ষার আওতায় রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একইভাবে গণপরিবহন, প্রাথমিক ও মৌলিক শিক্ষা, সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা এবং জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ক্ষেত্রে ভ্যাট সুবিধা বহাল রাখার কথা বিবেচনা করছে সরকার। এসব খাতে ছাড় বজায় রাখা গেলে সংস্কারের কারণে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।

অভিন্ন ভ্যাট হার চালুর উদ্যোগ অবশ্য বাংলাদেশে নতুন নয়। ২০১৫ সালে একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যবসায়ীদের তীব্র বিরোধিতার মুখে সরকার তা থেকে সরে আসে। এবারও প্রস্তাবটির গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে ভ্যাটের হার, বাস্তবায়নের পদ্ধতি এবং ব্যবসায়ীদের ওপর এর প্রভাবের ওপর। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হকের মতে, অভিন্ন ভ্যাট হার চালু করা সম্ভব হলেও হারের মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ। সামগ্রিক হার কিছুটা কমিয়ে যুক্তিসংগত পর্যায়ে নির্ধারণ করা হলে ব্যবসায়ীদের আপত্তি কমতে পারে।

সব মিলিয়ে, ভ্যাট ব্যবস্থাকে সহজ করা, কর ফাঁকির সুযোগ কমানো এবং রাজস্বের ভিত্তি সম্প্রসারণের জন্য একক হার চালুর পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে সংস্কারের সাফল্য শুধু রাজস্ব বৃদ্ধির অঙ্ক দিয়ে বিচার করা যাবে না। কর প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ানো, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য নিয়ম মানা সহজ করা, করজাল সম্প্রসারণ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষার ব্যবস্থাও জরুরি। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও কার্যকর তদারকি ছাড়া হঠাৎ করছাড় প্রত্যাহার করা হলে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন। তাই ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, স্বচ্ছ হিসাব এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে সরকারের প্রধান পরীক্ষা।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত