সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

অর্থপাচার ঠেকাতে বীমা কোম্পানিতে কঠোর নজরদারির নির্দেশ বিএফআইইউ’র

অর্থজগত প্রতিবেদন
অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকি কমাতে দেশের সব বীমা কোম্পানির জন্য কঠোর পরিপালন কাঠামো নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। নতুন নির্দেশনায় গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ, কেন্দ্রীয় কমপ্লায়েন্স ইউনিট গঠন এবং আর্থিক লেনদেনের নথি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে বেনামি পরিচয়ে হিসাব পরিচালনার ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতা এবং উচ্চ ঝুঁকির গ্রাহকদের ওপর বাড়তি নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে জারি করা এ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, প্রচলিত আইন ও বিএফআইইউর বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিটি বীমা কোম্পানিকে নিজস্ব মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদ অথবা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ও ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন নিয়ে এসব নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, ঝুঁকি ও পরিচালনাগত পরিবর্তনের সঙ্গে সংগতি রেখে নিয়মিতভাবে নীতিমালা পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনায় বীমা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনার দায়বদ্ধতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিমালা ও বিএফআইইউর নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদেরই পালন করতে হবে। অর্থাৎ, শুধু নীতিমালা তৈরি করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; এর কার্যকর বাস্তবায়ন ও তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে।

এ লক্ষ্যে প্রতিটি বীমা কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় কমপ্লায়েন্স ইউনিট গঠন করতে হবে। এ ইউনিটের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রধান মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তা (সিএএমএলসিও)। প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ কার্যক্রম তদারকি, ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ইউনিটটি মূল ভূমিকা পালন করবে।

কেন্দ্রীয় কমপ্লায়েন্স ইউনিটকে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার ধরন, আকার, কার্যক্রমের পরিধি ও গ্রাহকসংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে ঝুঁকি মোকাবিলার কৌশল ও কর্মসূচি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ কাজের জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি, চিহ্নিত সমস্যা ও সুপারিশ নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে।

প্রতিবেদনটি ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহীর কাছে জমা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনাসহ পরিচালনা পর্ষদ কিংবা সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা কমিটির সামনে উপস্থাপন করতে হবে। প্রতি বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি বিএফআইইউর কাছে পাঠানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বীমা কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ তদারকি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জবাবদিহি আরও জোরদার করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

নতুন নির্দেশনার আওতা শুধু প্রধান কার্যালয়ে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। কোম্পানির সব শাখা, এজেন্সি, ইউনিট, দাবি নিষ্পত্তি এজেন্ট ও কমিশন এজেন্টের কার্যক্রমেও একই ধরনের পরিপালনব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। গ্রাহক শনাক্তকরণ, লেনদেন পর্যবেক্ষণ, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রক্রিয়াকে এই কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।

গ্রাহকের পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিএফআইইউ। এ জন্য আধুনিক ইলেকট্রনিক গ্রাহক-পরিচিতি যাচাইব্যবস্থা বা ই-কেওয়াইসি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বেনামি কিংবা ছদ্মনামে কোনো হিসাব বা গ্রাহক সম্পর্ক পরিচালনার সুযোগ রাখা যাবে না। কোনো লেনদেন সন্দেহজনক মনে হলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের পরিচয়, আর্থিক কার্যক্রম ও লেনদেনের প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।

বিশেষ করে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে পরিচালিত লেনদেন এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আর্থিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এসব গ্রাহকের ঝুঁকি মূল্যায়ন ও লেনদেন পর্যবেক্ষণ আরও নিবিড়ভাবে করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।

নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট প্রতিবেদন দাখিলের নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকিং বা মোবাইল আর্থিক সেবা চ্যানেলের বাইরে এক দিনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ লেনদেন হলে পরবর্তী মাসের প্রথম সাত কার্যদিবসের মধ্যে নির্ধারিত ওয়েবপোর্টালের মাধ্যমে বিএফআইইউকে জানাতে হবে। এ ছাড়া উদ্দেশ্যহীন, অস্বাভাবিক বা জটিল লেনদেনের ধরন শনাক্তে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সতর্ক থাকতে হবে। সন্দেহজনক কার্যক্রম ধরা পড়লে অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনব্যবস্থা অনুসরণ করে দ্রুত কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।

নথি সংরক্ষণের বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো পলিসি বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা দাবি নিষ্পত্তির পরও গ্রাহকের পরিচয় যাচাইসংক্রান্ত নথি, লেনদেনের রেকর্ড, নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও প্রশিক্ষণসংক্রান্ত দলিল অন্তত পাঁচ বছর নিরাপদে সংরক্ষণ করতে হবে। পরবর্তী সময়ে কোনো লেনদেনের বিষয়ে তদন্ত বা যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে এসব নথি যেন সহজে পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। দেশের সব বীমা প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে পরিপালনের জন্য বলেছে বিএফআইইউ।

নতুন এ কাঠামোর মাধ্যমে বীমা খাতে অর্থের উৎস ও লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়ানো, সন্দেহজনক আর্থিক কার্যক্রম দ্রুত শনাক্ত করা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পলিসি গ্রহণ, প্রিমিয়াম জমা ও দাবি পরিশোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপে কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠিত হলে বীমা খাতকে অবৈধ অর্থের প্রবাহ হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে। তবে নির্দেশনার বাস্তব সুফল পেতে নিয়মিত তদারকি, দক্ষ জনবল এবং সব পর্যায়ে কার্যকর পরিপালন নিশ্চিত করা জরুরি।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত