অর্থজগত ডেস্ক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির আশঙ্কায় বিশ্ব শেয়ারবাজারে নতুন করে বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিটে প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারগুলোর বড় দরপতনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে এশিয়ার বাজারেও। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস সোমবার এশিয়ার অধিকাংশ শেয়ারবাজার নিম্নমুখী ছিল। বিশেষ করে চিপ নির্মাতা ও এআই প্রযুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে দরপতন বাজারের প্রধান সূচকগুলোকে চাপে ফেলেছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই প্রযুক্তির বিকাশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হলেও এসব বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আয় কখন আসবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে। ডেটা সেন্টার নির্মাণ, উন্নত চিপ উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিপুল মূলধনের প্রয়োজন হচ্ছে। পাশাপাশি উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
গত সপ্তাহে বিশ্ব শেয়ারবাজারে ব্যাপক ওঠানামা দেখা গেলেও শুক্রবারের লেনদেন শেষ হয়েছিল তুলনামূলক ইতিবাচক অবস্থানে। তবে নতুন সপ্তাহের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিক্রির চাপ তীব্র হয়। ওয়াল স্ট্রিটের তিনটি প্রধান সূচকই বড় দরপতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ করে। প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক সূচক কমে যায় ২ শতাংশের বেশি। মাইক্রোসফট, এনভিডিয়া, এএমডি ও অ্যামাজনের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দরপতন সূচকটির নিম্নমুখী প্রবণতায় বড় ভূমিকা রাখে।
বাজারের এই অস্থিরতার পেছনে শুধু প্রযুক্তিপণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা নয়, বরং এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের আর্থিক যৌক্তিকতা নিয়েও নতুন করে মূল্যায়ন শুরু হয়েছে। ন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়া ব্যাংকের বিশ্লেষক রদ্রিগো ক্যাট্রিলের মতে, ডেটা সেন্টার, চিপ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণে যে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে, ভবিষ্যতের আয় দিয়ে সেই বিনিয়োগের ব্যয় ও অর্থায়নের দায় মেটানো সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন বাড়ছে।
এআই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন কাঠামো নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এর একটি উদাহরণ হলো নিওক্লাউড প্রতিষ্ঠান কোরউইভ। বিপুল ঋণের বোঝা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগকারীদের নজরে রয়েছে। চলতি মাসে এর শেয়ারের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি বন্ডের ইল্ড বা মুনাফার হার বেড়েছে, যা ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ আর্থিক অবস্থান নিয়ে বাজারের সংশয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং কোরউইভের আর্থিক অবস্থা নিয়ে আশ্বস্ত করার মতো মন্তব্য করলে শুক্রবার এশিয়ার বাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। কিন্তু নতুন সপ্তাহের শুরুতে সেই আশাবাদ স্থায়ী হয়নি।
প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠান টেসলা ও মেটা চলতি সপ্তাহে আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করবে। এসব প্রতিষ্ঠানের আয়, ব্যয় এবং এআই খাতে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের পরিকল্পনা বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে এআই অবকাঠামোয় বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে আয় বৃদ্ধির বাস্তব চিত্র কতটা স্পষ্ট হচ্ছে, তা বাজারের পরবর্তী গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের দিকেও তাকিয়ে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি মার্কিন মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের পর সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে জল্পনা বেড়েছে। সুদের হার বৃদ্ধি পেলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ ও সম্প্রসারণে ঋণের ওপর নির্ভর করে। সুদের হার বাড়লে ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি পায়, পাশাপাশি ভবিষ্যতে অর্জিত মুনাফার বর্তমান মূল্য কমে যাওয়ায় উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশায় মূল্যায়িত প্রযুক্তি শেয়ারগুলোর আকর্ষণও কমতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুরু হওয়া বিক্রির চাপ সোমবার এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। টোকিওর বাজারে সফটব্যাংক, অ্যাডভানটেস্ট ও টোকিও ইলেকট্রনের শেয়ারের দরপতন সূচককে নিচে নামায়। দক্ষিণ কোরিয়ায় চিপ নির্মাতা এসকে হাইনিক্স ও স্যামসাংয়ের শেয়ারের দর কমেছে। তাইপে, সাংহাই, সিডনি, সিঙ্গাপুর ও ওয়েলিংটনের শেয়ারবাজারেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ছুটির কারণে হংকংয়ের বাজার বন্ধ ছিল।
অন্যদিকে, চীনের অর্থনীতি নিয়ে প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ সম্প্রসারিত হয়েছে। এএফপির পরিচালিত জরিপে বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার সামান্য বেশি হলেও তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। এতে বোঝা যায়, বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের মনোযোগের বড় অংশ এআই খাতে বিনিয়োগের সম্ভাব্য মুনাফা, যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে কেন্দ্রীভূত রয়েছে।
শেয়ারবাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পণ্য ও মুদ্রাবাজারেও অস্থিরতা দেখা গেছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমেছে। তবে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক তেলের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার পর দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। সেই বৃদ্ধির পরও সোমবার প্রধান দুটি অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্কের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে ছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে রেখেছে। হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে অনিশ্চয়তা থাকলেও অঞ্চলটি থেকে তেল সরবরাহ অব্যাহত থাকার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুতিদের হামলা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অপরিশোধিত তেল স্থাপনাগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। ফলে তেলের দামে সাম্প্রতিক পতন ঘটলেও সরবরাহ পরিস্থিতি ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।
মুদ্রাবাজারে ফ্রান্সের অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ইউরোর দর কমেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভের মধ্যে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বিক্ষোভে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতার কঠোর সমালোচনা করেছেন। অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সমন্বয় ইউরোপীয় মুদ্রাবাজারেও প্রভাব ফেলছে।
সামগ্রিকভাবে, এআই খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ এখন ব্যয়, ঋণ ও মুনাফার বাস্তব হিসাবের মুখোমুখি। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বৃদ্ধির গতি যদি বিপুল বিনিয়োগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে শেয়ারগুলোর উচ্চ মূল্যায়ন নিয়ে আরও সংশয় তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হলে প্রযুক্তি খাতের অস্থিরতা আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফল এবং ফেডারেল রিজার্ভের সিদ্ধান্ত বিশ্ব শেয়ারবাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


