সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডে দারিদ্র্য কমতে পারে ৫ শতাংশ

অর্থজগত প্রতিবেদন
দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক সংকটের চাপে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচিকে কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বিশ্বব্যাংকের প্রত্যাশা, কর্মসূচি দুটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশে দারিদ্র্যের হার প্রায় ৫ শতাংশ কমানো সম্ভব।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার শেষ দিনে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় তাদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। সরকারের লক্ষ্য হলো, এসব পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি নতুন করে কেউ যাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে না যান, তা নিশ্চিত করা।
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টার ভাষ্য অনুযায়ী, আগের সরকারের সময়ে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। অতীতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে দুর্বলতা এবং উপকারভোগী নির্বাচনে ত্রুটির কারণে প্রকৃত দরিদ্রদের অনেকে সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অন্যদিকে, সহায়তা পাওয়ার যোগ্য নন—এমন ব্যক্তিদেরও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ধরনের অনিয়ম দূর করতে ডিজিটাল জনপরিকাঠামো ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সহায়তা এবং কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে কর্মসূচি দুটি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। তবে দারিদ্র্য কমানোর এ সম্ভাবনা বাস্তবে কাজে লাগাতে কর্মসূচির আওতা, সুবিধা বিতরণে স্বচ্ছতা এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এদিকে, রাজস্ব আদায় বাড়ানো ও কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করার বিষয়ে আইএমএফের পরামর্শের সঙ্গে সরকারের সংস্কার পরিকল্পনার মিল রয়েছে বলে জানান তিতুমীর। তাঁর মতে, অতীতে কর অব্যাহতি, কর ফাঁকি এবং পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর সুবিধার কারণে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি। এসব দুর্বলতা কাটিয়ে রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে সরকার টাস্কফোর্স গঠন করেছে।
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত এ প্রবৃদ্ধি বেড়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। রাজস্ব আদায়ে এ অগ্রগতিকে সংস্কার উদ্যোগের প্রাথমিক ফল হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
তিতুমীর বলেন, অতীতে আইএমএফের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া হলেও প্রতিশ্রুত সংস্কার যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এ কারণে বর্তমান সরকার সরকারি হিসাবের স্বচ্ছতা ও যাচাইযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছে। তাঁর মতে, সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠায় শুধু প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়; বাস্তব অগ্রগতির মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হবে।
ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলাও সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিতুমীরের দাবি, অতীতে ব্যাংক থেকে অর্থ লুটপাটের কারণে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যার দায় বর্তমান সরকারকে উত্তরাধিকারসূত্রে বহন করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বিষয়ে তিনি জানান, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, ব্যাংকটির ওপর আস্থা ফিরে আসায় কেউ কেউ আমানত তুলে নেওয়ার পরিবর্তে নতুন করে অর্থ জমা রাখছেন। অন্যদিকে, অনিয়ম ও সংকটে থাকা অন্যান্য ব্যাংকের সমস্যা সমাধানে রেজল্যুশন আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরার সম্ভাব্য লক্ষণ হিসেবে ট্রেজারি বন্ডের সুদহার কমে আসার বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিতুমীর। তাঁর মতে, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সরকারের সংস্কার কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
দারিদ্র্য কমানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। এ জন্য ম্যানুফ্যাকচারিং হাব ও রপ্তানি প্রবেশদ্বার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের প্রত্যাশা, উৎপাদন সক্ষমতা ও রফতানি বাড়ানোর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাব মোকাবিলায়ও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সরকার। এ সংকট বাংলাদেশের সৃষ্টি না হলেও জ্বালানি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও সার আমদানির ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি কৃষি ও পরিবহন খাতের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। এ অবস্থায় জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সংযত থাকার চেষ্টা করছে সরকার, যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও না বাড়ে।
সব মিলিয়ে, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনাকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখছে সরকার। তবে এসব উদ্যোগের সুফল কতটা কার্যকরভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে, তার ওপরই দারিদ্র্য হ্রাস ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন অনেকাংশে নির্ভর করবে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত