সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

ন্যাশনাল ব্যাংকে ফিরল স্বাভাবিক লেনদেন

অর্থজগত প্রতিবেদন
দীর্ঘদিনের তারল্যসংকট ও গ্রাহকদের টাকা উত্তোলনে সীমাবদ্ধতার পর আবারও স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে ফিরেছে ন্যাশনাল ব্যাংক। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকাল থেকে ব্যাংকটির সব শাখা ও এটিএম বুথে চাহিদামতো টাকা তুলতে পারছেন গ্রাহকেরা। একই সঙ্গে কয়েকটি শাখায় নতুন করে আমানত জমা পড়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক লেনদেনও শুরু হয়েছে। এতে সংকটে থাকা ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর মতিঝিল, দিলকুশা ও ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখা ঘুরে গ্রাহকদের টাকা উত্তোলন এবং বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের চিত্র দেখা গেছে। আগে টাকা তুলতে আবেদন করে অপেক্ষা করতে হলেও এখন অনেক গ্রাহক সরাসরি চেকের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন। ব্যাংকটির কয়েকটি শাখায় ব্যবসায়িক হিসাব খোলা এবং ঋণপত্রের (এলসি) বিপরীতে অর্থ জমা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
ব্যাংকটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মেলিতা মেহজাবীন এর আগে জানিয়েছিলেন, ১৫ অক্টোবর থেকে সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী শাখা ও এটিএম বুথে পর্যাপ্ত তারল্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে গত ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত বড় অঙ্কের আমানতসহ বিভিন্ন হিসাবের অর্থ উত্তোলনের আবেদন সংগ্রহ করে ব্যাংকটি।
মতিঝিল শাখায় গত বৃহস্পতিবার সকালে এক গ্রাহক ২০ হাজার টাকা উত্তোলন করেন। গত দুই বছরের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান সেবার পার্থক্য তুলে ধরে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। শাখাটির ব্যবস্থাপক রোকসানা পারভিন জানান, গ্রাহকদের আবেদন প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়ে অনুমোদনের অপেক্ষা না করে শাখা থেকেই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।
ওই শাখায় বৃহস্পতিবার ৭৩ লাখ টাকা জমা পড়েছে। বিপরীতে গ্রাহকেরা উত্তোলন করেছেন ৬ লাখ টাকা। নতুন করে আমানত জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এইচ ইন্টারন্যাশনাল ও এইচপি ট্রেডার্স রয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটি পৃথকভাবে ৩০ লাখ টাকা করে জমা দিয়েছে। অর্থাৎ, শাখাটিতে গ্রাহকদের টাকা উত্তোলনের পাশাপাশি নতুন আমানতও আসছে।
দিলকুশা শাখায়ও গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী আমানত ফেরত দেওয়া হয়েছে। শাখাটির অপারেশনস ম্যানেজার চন্দন কুমার দাসের তথ্য অনুযায়ী, ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ৬৪ জন গ্রাহক প্রায় ৫ কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছিলেন। গত বৃহস্পতিবার আবেদনকারী গ্রাহকদের পাশাপাশি আরও প্রায় ১০০ জনকে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। গ্রাহকপ্রতি সর্বনিম্ন ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে।
এ শাখার একজন গ্রাহক চেকের মাধ্যমে এক লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন। ক্যাশ কাউন্টারের এক কর্মকর্তা জানান, সকাল থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ৩৬ জন গ্রাহককে সেবা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজনকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়।
মতিঝিলের ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখায়ও আমানত উত্তোলনের পাশাপাশি ব্যবসায়িক লেনদেনের কার্যক্রম দেখা গেছে। শাখাটির সেকেন্ড ম্যানেজার মাহবুবুর রহমান জানান, সেখানে দুই কোটি টাকার বেশি অর্থ রয়েছে—এমন কয়েকটি হিসাব খোলা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রায় ২০ জন গ্রাহককে তাঁদের আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়িক লেনদেনের অংশ হিসেবে ডিজে গার্মেন্টস ঋণপত্রের বিপরীতে প্রায় ৩১ লাখ টাকা এবং রাজধানী ট্রেডার্স ৬ লাখ টাকা জমা দিয়েছে।
ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মেলিতা মেহজাবীন বলেন, সব শাখা ও এটিএম বুথে গ্রাহকদের সেবা দিতে বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। বৃহস্পতিবার বিভিন্ন শাখা পরিদর্শন করে গ্রাহকদের চাহিদামতো টাকা উত্তোলন করতে দেখেছেন তিনি। সেবার মান ধরে রাখতে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ন্যাশনাল ব্যাংকের এ পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে তারল্য সহায়তা। ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু করতে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা ধার পেয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে দেওয়া এ ঋণের সুদহার ১০ শতাংশ এবং মেয়াদ তিন মাস।
তবে এ অর্থ ব্যবহারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। তারল্য সহায়তার টাকা দিয়ে ব্যাংকটির সাবেক বা বর্তমান কোনো পরিচালকের আমানত ফেরত দেওয়া যাবে না। এ অর্থ থেকে নতুন করে কোনো ঋণও বিতরণ করা যাবে না। গত সোমবার ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো চিঠিতে এসব নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংকটির সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর চার দিনে প্রায় ১১ হাজার গ্রাহক মোট ২ হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছেন। দেশজুড়ে বিভিন্ন শাখা থেকে এসব চাহিদার তথ্য প্রধান কার্যালয়ে পাঠানোর পর প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ সরবরাহ করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের অর্থ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে অন্য গ্রাহকদের আমানতও ফেরত দেওয়া হবে।
অনিয়ম ও দুর্বল সুশাসনের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ন্যাশনাল ব্যাংকের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল। একসময় ব্যাংকটির আমানত ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলেও পরবর্তী সময়ে আর্থিক সংকট ও গ্রাহকদের আস্থার ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যাংকটির সব ধরনের সেবা পুনরায় চালু হওয়ায় পরিস্থিতি বদলানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে এক দিনের লেনদেন ও নতুন আমানত জমার চিত্র দিয়ে ব্যাংকটির সংকট পুরোপুরি কেটে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখা, আমানত ফেরতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, তারল্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং সুশাসন নিশ্চিত করাই এখন ব্যাংকটির জন্য বড় পরীক্ষা। সাময়িক তারল্য সহায়তার পাশাপাশি এসব ক্ষেত্রে টেকসই উন্নতি করতে পারলেই ন্যাশনাল ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল হবে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত