অর্থজগত প্রতিবেদন
শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্রোকারেজ হাউস ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি, অনিয়ম প্রতিরোধ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকার কথা। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্বকারী সমিতিগুলোর কার্যক্রমে সেই দায়িত্বের প্রতিফলন যথেষ্ট নয়। একের পর এক অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগ উঠলেও সমিতিগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে সদস্য প্রতিষ্ঠানের স্বার্থই প্রাধান্য পাচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর স্বনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে শুধু নীতিমালা প্রণয়ন বা সদস্যদের সচেতন করাই যথেষ্ট নয়; অনিয়ম শনাক্ত করা, অভিযোগের তদন্ত এবং অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হবে।
স্বনিয়ন্ত্রণে কাঠামোগত দুর্বলতা
শেয়ার বাজারে স্বনিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, পেশাগত মান নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা। এ ব্যবস্থায় সমিতিগুলো সদস্যদের আচরণবিধি প্রণয়ন, তা অনুসরণে বাধ্য করা এবং অনিয়মের প্রাথমিক তদন্তে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলোর কার্যকর ক্ষমতা ও দায়িত্বের সীমাবদ্ধতা এ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে রেখেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বনিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নির্ভর করে সমিতিগুলো কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কতটা দৃঢ় থাকে, তার ওপর। কোনো প্রতিষ্ঠান অনিয়মে জড়ালে কেবল সতর্কবার্তা দেওয়া কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকলে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি ঠেকানো কঠিন। প্রয়োজনে সদস্যপদ স্থগিত বা বাতিলের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ না থাকলে স্বনিয়ন্ত্রণ কার্যত আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খানও এ ক্ষেত্রে সমিতিগুলোর সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, সদস্য প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারলেই স্বনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কার্যকর হবে। অর্থাৎ, সমিতির দায়িত্ব শুধু সদস্যদের ব্যবসায়িক সুবিধা নিশ্চিত করা নয়; বরং তাদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখাও।
সম্পদ ব্যবস্থাপকদের সমিতি কার্যত নিষ্ক্রিয়
দেশের সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিজ অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডস থাকলেও সংগঠনটির কার্যক্রম কার্যত নিষ্ক্রিয়। সম্পদ ব্যবস্থাপকদের বড় একটি অংশের অনাগ্রহও সংগঠনটির কার্যকারিতা কমিয়ে দিয়েছে। এর পেছনে সংগঠনের কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন।
বর্তমান কাঠামোয় প্রতিটি মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য একটি করে ভোটের ব্যবস্থা রয়েছে। এতে বেশি সম্পদ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্য এবং সমিতির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, কোনো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে সমিতি কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অংশ নতুন সমিতি গঠনের উদ্যোগ নেয়। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাতে সম্মতি দেয়নি। ফলে খাতটির জন্য একটি কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগও বাধার মুখে পড়ে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানিয়েছেন, সম্পদ ব্যবস্থাপকদের জন্য কার্যকর ও প্রাণবন্ত একটি সমিতি গঠনের সুযোগ তৈরি করতে কমিশন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন জানাবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে খাতটির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি পেশাগত আচরণবিধি ও জবাবদিহির কাঠামো শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে নতুন সংগঠন গঠনই যথেষ্ট নয়; এর পরিচালন কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও কার্যকর হতে হবে।
মিউচুয়াল ফান্ডে ঝুঁকির ধরন বদলাচ্ছে
সম্পদ ব্যবস্থাপনা খাতে প্রতারণার অভিযোগের ক্ষেত্রে মেয়াদি বা ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট অনেক সম্পদ ব্যবস্থাপকের মতে, এ ধরনের ফান্ড পরিচালনার সময়ই অনিয়মের ঘটনা তুলনামূলক বেশি ঘটেছে। বর্তমানে ক্লোজড-এন্ড ফান্ডের সংখ্যা কমছে এবং নতুন ক্লোজড-এন্ড ফান্ডের অনুমোদন দেওয়া বন্ধ রেখেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
এর বিপরীতে উন্মুক্ত বা ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের বিস্তার বেড়েছে। এসব ফান্ডে বিনিয়োগকারীরা নিট সম্পদমূল্য বা এনএভির ভিত্তিতে ইউনিট বিক্রি করে অর্থ তুলে নিতে পারেন। ফান্ড ব্যবস্থাপকদের দাবি, বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রত্যাহারের এ সুযোগ থাকায় অর্থ আত্মসাতের ঝুঁকি তুলনামূলক কম।
তবে ফান্ডের ধরন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সব ধরনের অনিয়মের ঝুঁকি দূর হয়ে যায়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। অর্থের ব্যবহার, সম্পদ সংরক্ষণ, হিসাবের স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে সঠিক তথ্য প্রকাশ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। ফান্ড উন্মুক্ত হোক বা মেয়াদি, ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হলে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাই শুধু ফান্ডের কাঠামোর ওপর নির্ভর না করে ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা করা জরুরি।
চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতে মোট ১৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ব্যবস্থাপনার আওতায় ছিল। এর মধ্যে ৯ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা ছিল ওপেন-এন্ড ফান্ডের অধীনে। অর্থাৎ, মোট সম্পদের বড় একটি অংশ এখন এমন ফান্ডে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে। এ বিপুল সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সম্পদ সংরক্ষণকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ।
বিএসইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিউচুয়াল ফান্ডের বিদ্যমান বিধিমালায় কাস্টডিয়ান বা সম্পদ সংরক্ষণকারীদের দায়িত্ব সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এর ফলে ফান্ডের সম্পদ সংরক্ষণ ও তদারকিতে তাদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বিধিমালায় দায়িত্ব নির্ধারণের পাশাপাশি তা বাস্তবে যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
ব্রোকারদের সমিতির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
সম্পদ ব্যবস্থাপকদের মতো ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংগঠনটি থাকা সত্ত্বেও তামহা সিকিউরিটিজ ও মশিহর সিকিউরিটিজসহ কয়েকটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনা ব্রোকারদের ওপর নজরদারিতে বিদ্যমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে।
বিএসইসির এক কর্মকর্তার মতে, বিভিন্ন দেশে ব্রোকার ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের সমিতি প্রাথমিক পর্যায়ে সদস্যদের কার্যক্রম তদারক করে। কিন্তু বাংলাদেশের ডিবিএর কর্মকাণ্ড মূলত সদস্যদের স্বার্থ রক্ষাকেন্দ্রিক। লেনদেনের ক্ষেত্রে উচ্চতর ফি-সীমার সুযোগ বাড়ানোর দাবিকে এ প্রবণতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
অন্যদিকে ডিবিএর সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা সংগঠনটির নেই। কোনো ব্রোকারের লাইসেন্স স্থগিত হলে তার সদস্যপদও স্থগিত থাকে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা লাইসেন্স বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করার বিষয়টি জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এ অবস্থায় সমিতির দায়িত্ব ও ক্ষমতার মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। সদস্যদের কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ উঠলেও সংগঠনটি যদি নিজস্ব উদ্যোগে তদন্ত করতে না পারে কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা না রাখে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি প্রতিরোধে তার ভূমিকা সীমিত থাকবে। আবার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হলে সেই সময়ের মধ্যে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
তবে এ সমস্যার সমাধান হিসেবে সমিতিকে অনিয়ন্ত্রিত শাস্তিমূলক ক্ষমতা দেওয়াও যথেষ্ট নয়। অভিযোগ যাচাই, নিরপেক্ষ তদন্ত, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের ব্যবস্থা রেখে ক্ষমতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এতে একদিকে সদস্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে সমিতির ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকিও কমবে।
আন্তর্জাতিক চর্চায় বিনিয়োগকারী সুরক্ষাই মুখ্য
ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বনিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ফিন্যান্সিয়াল ইন্ডাস্ট্রি রেগুলেটরি অথরিটি বা ফিনরার কথা উল্লেখ করা যায়। ব্রোকারদের অর্থায়নে পরিচালিত হলেও সংস্থাটির প্রধান লক্ষ্য বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং সিকিউরিটিজ খাতে ন্যায়সংগত ও সৎ কার্যক্রম নিশ্চিত করা।
প্রতারণা, অনৈতিক আচরণ কিংবা গ্রাহকের সম্পদের অপব্যবহারের মতো অভিযোগে ফিনরা বিভিন্ন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। ২০২৩ সালে এসডব্লিউ ফাইন্যান্সিয়ালকে বহিষ্কার করে সংস্থাটি। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের আগের শেয়ারসংক্রান্ত বিনিয়োগে পারিশ্রমিক সম্পর্কে গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করা, অতিরিক্ত লেনদেন এবং প্রতিনিধিদের কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারক করতে ব্যর্থতার মতো বিষয় এ সিদ্ধান্তের কারণ ছিল।
এ উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, স্বনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে সদস্যদের অর্থায়ন বা প্রতিনিধিত্বের বাইরে গিয়ে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে মূল বিবেচনায় রাখতে হয়। পাশাপাশি অনিয়মের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং বাজারে পেশাগত আচরণের মান বজায় রাখার সক্ষমতাও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মডেল হুবহু অনুসরণের পরিবর্তে দেশের বাজারের আকার, নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও আইনগত সীমাবদ্ধতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দায়িত্ব ও ক্ষমতা নির্ধারণ করতে হবে। সমিতিগুলোর স্বনিয়ন্ত্রণ এবং বিএসইসির বিধিবদ্ধ নজরদারির মধ্যে সমন্বয় থাকলে অনিয়ম শনাক্ত করা এবং দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করা সহজ হতে পারে।
ক্ষতিপূরণ তহবিলেও সীমাবদ্ধতা
ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা বা অর্থ ও সিকিউরিটিজ আত্মসাতের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের সহায়তার জন্য দেশে ইনভেস্টর প্রোটেকশন ফান্ড বা বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল রয়েছে। ২০০০ সালের আগস্টে গঠিত এ তহবিল থেকে নির্ধারিত শর্তে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে তহবিলের আকার সীমিত হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত ক্ষতির পুরোটা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
নিয়ম অনুযায়ী, ব্রোকারদের প্রতি প্রান্তিকে পাঁচ হাজার টাকা করে এ তহবিলে জমা দিতে হয়। এ ছাড়া কনসলিডেটেড কাস্টমারস অ্যাকাউন্টে (সিসিএ) রাখা আমানতের সুদ থেকে অর্জিত অর্থের ২৫ শতাংশ তহবিলে স্থানান্তরের বিধান রয়েছে। কিন্তু এ অর্থের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত হওয়ায় বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির সঙ্গে প্রাপ্য ক্ষতিপূরণের ব্যবধান থেকে যেতে পারে।
সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ থাকলেও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হারানো ব্যক্তিদের জন্য এ সীমা পর্যাপ্ত কি না, তা পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে কোনো ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠলে ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক পুনরুদ্ধার দীর্ঘ ও জটিল হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে শুধু ক্ষতিপূরণ তহবিলের ওপর নির্ভর না করে গ্রাহকের অর্থ ও সিকিউরিটিজের হিসাব নিয়মিত যাচাই, সম্পদ পৃথকভাবে সংরক্ষণ এবং অনিয়মের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।
একই সঙ্গে তহবিলের অর্থের পরিমাণ, অবদান নির্ধারণের পদ্ধতি এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানের শর্ত সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পর্যালোচনা করা যেতে পারে। বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির পরিমাণের তুলনায় তহবিলের সক্ষমতা দুর্বল থাকলে সুরক্ষাব্যবস্থার ওপর আস্থা তৈরি করা কঠিন হবে।
আস্থা ফেরাতে জবাবদিহির বিকল্প নেই
বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের সঙ্গে অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের অভিযোগ গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিনিয়োগকারীরা যখন মনে করেন, তাঁদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোই যথাযথভাবে জবাবদিহির আওতায় আসছে না, তখন বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আগ্রহও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে ব্রোকারেজ হাউস ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা শুধু বিনিয়োগকারী সুরক্ষার বিষয় নয়; এটি পুরো বাজারের স্থিতিশীলতার সঙ্গেও যুক্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলোর প্রতিনিধিত্বশীল কাঠামো গঠন, স্বার্থের সংঘাত কমানো এবং স্বাধীনভাবে অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আচরণবিধি লঙ্ঘনকারী সদস্যদের বিরুদ্ধে সতর্কতা, সাময়িক স্থগিতাদেশ কিংবা সদস্যপদ বাতিলের মতো আনুপাতিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা ও প্রক্রিয়া নির্ধারণ করতে হবে। এসব ব্যবস্থা বিএসইসির নিয়ন্ত্রক ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়াও জরুরি।
পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা, গ্রাহকের অর্থ ও সিকিউরিটিজের নিয়মিত নিরীক্ষা এবং ক্ষতিপূরণ তহবিলের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। অভিযোগ ওঠার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে অনিয়মের আগাম সংকেত শনাক্ত করার ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে ক্ষতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে, শেয়ার বাজারে স্বনিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা কেবল সমিতির অস্তিত্ব বা নীতিমালার ওপর নির্ভর করে না। নিরপেক্ষ নজরদারি, প্রয়োগযোগ্য শাস্তি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের কার্যকর প্রতিকার—এই চারটি উপাদানের সমন্বয়েই বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। তা না হলে সমিতিগুলো সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব করলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা রক্ষায় তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যাবে।


