সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

স্বপ্নের অর্থনৈতিক অঞ্চল, বাস্তবায়নে স্থবিরতা

বিশেষ প্রতিবেদন
দেশের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এনএসইজেড)। প্রায় ৩৩ হাজার একর জমিতে বিস্তৃত এই মেগা প্রকল্পকে ঘিরে একসময় যে উচ্চাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবায়নের ধীরগতিতে তা এখন প্রশ্নের মুখে। এক দশক পেরিয়ে গেলেও বিশাল এই শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ জমি অনুন্নত পড়ে রয়েছে। কারখানা নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দ পাওয়া অনেক উদ্যোক্তা এখনো কাজ শুরু করতে পারেননি। আবার যেসব প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে গেছে, তাদেরও মোকাবিলা করতে হচ্ছে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অনিশ্চয়তা।

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে আঞ্চলিক উৎপাদন ও রফতানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করা। পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে এখানে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের রফতানি আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অবকাঠামো নির্মাণে বিলম্ব, জমি হস্তান্তরের জটিলতা, শ্রমিকদের আবাসন ও নিরাপত্তার ঘাটতি এবং সরকারি অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে মাত্র ১৬টি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেছে। আরও ১৫টি প্রতিষ্ঠানের কারখানা নির্মাণাধীন। প্রায় ৩৩ হাজার একরের এই প্রকল্পে এ পর্যন্ত উন্নয়ন করা হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৫০০ একর জমি। বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৩৪টি প্লট। অর্থাৎ, বিপুল জমি ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিকল্পনা থাকলেও শিল্পায়নের বাস্তব অগ্রগতি এখনো প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত।

এ পর্যন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে দেশি বিনিয়োগ এসেছে ১২ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার। সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৮ হাজার মানুষের। অথচ প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে বলে প্রাথমিক পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছিল।

সবচেয়ে বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে রফতানি লক্ষ্যমাত্রায়। ২০৩০ সালের মধ্যে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে ৪ হাজার কোটি ডলারের পণ্য রফতানির পরিকল্পনা থাকলেও এখন পর্যন্ত রফতানি হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৭২ লাখ ডলারের পণ্য। অর্থাৎ, নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় অর্জন এখনো নগণ্য। বেজার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে এখানে ৫৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ২ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা ছিল। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আগের প্রাক্কলনে চলতি দশকের শেষ নাগাদ মোট বিনিয়োগ ১ হাজার ৯০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছিল।

এই পরিসংখ্যান প্রকল্পটির সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবায়নগত দুর্বলতাও স্পষ্ট করে তুলছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য শুধু জমি অধিগ্রহণ বা প্লট বরাদ্দই যথেষ্ট নয়; বিনিয়োগকারীদের জন্য উৎপাদন শুরুর উপযোগী পরিবেশ তৈরি করাও সমান জরুরি। মিরসরাইয়ে সেই প্রস্তুতির ঘাটতিই এখন শিল্পায়নের গতি আটকে দিচ্ছে।

জমি বরাদ্দ, তবু কারখানা নির্মাণে অনিশ্চয়তা

একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য জমি বরাদ্দ পাওয়ার পর উদ্যোক্তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ হওয়ার কথা কারখানার নকশা, নির্মাণ ও উৎপাদন প্রস্তুতি। কিন্তু জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে অনেক বিনিয়োগকারীর জন্য এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই দীর্ঘ অপেক্ষার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। জমির উন্নয়ন, প্লটের সীমানা নির্ধারণ এবং আনুষ্ঠানিকভাবে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার কাজ শেষ না হওয়ায় কারখানা নির্মাণে অগ্রসর হতে পারছেন না অনেকে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতিকে (বিজিএমইএ) প্রায় ৫০০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও এর কিছু অংশের সীমানা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। জমির আনুষ্ঠানিক হস্তান্তরও সম্পন্ন হয়নি। ফলে বিনিয়োগকারীরা অর্থ ব্যয় করে জমি বরাদ্দ পেলেও তাৎক্ষণিকভাবে শিল্প স্থাপনের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না।

বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি রকিবুল আলম চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, উদ্যোক্তারা জমির মূল্য পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করার পরও অপেক্ষায় রয়েছেন। জমি হস্তান্তর, অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় তারা বিনিয়োগের পরবর্তী ধাপে যেতে পারছেন না।

এ ধরনের বিলম্বের আর্থিক প্রভাবও রয়েছে। কারখানা নির্মাণের প্রস্তুতি, যন্ত্রপাতি আমদানি, অর্থায়ন ও জনবল নিয়োগের পরিকল্পনা আগে থেকেই করতে হয়। জমি বুঝে পাওয়া বা অবকাঠামো প্রস্তুত হওয়ার সময় পিছিয়ে গেলে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন শুরু থেকে আয় আসার সময়ও পিছিয়ে যায়। এতে বিনিয়োগের সম্ভাব্য মুনাফা কমে এবং নতুন উদ্যোক্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

ফলে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের আগ্রহ থাকলেও তা দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতায় রূপান্তরিত হচ্ছে না। বরাদ্দ দেওয়া জমির বিপরীতে কত দ্রুত কার্যকর শিল্প স্থাপনা গড়ে উঠছে, সেটিই এখন প্রকল্পটির অগ্রগতি মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

ইউটিলিটি সংকট উৎপাদনেও বাধা

জমি ও অবকাঠামোগত সমস্যার বাইরে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাও অর্থনৈতিক অঞ্চলটির বড় চ্যালেঞ্জ। শিল্পকারখানায় উৎপাদন চালু রাখার জন্য এসব সেবা অপরিহার্য। সরবরাহে ঘাটতি বা অনিশ্চয়তা থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, বাড়ে পরিচালন ব্যয় এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা কমে যায়।

প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে কারখানা স্থাপন করা মডার্ন সিনটেক্সের জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক সফল বড়ুয়ার মতে, বড় শিল্পপ্রকল্প লাভজনকভাবে পরিচালনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পানির চাহিদা মেটাতে এখনো ভূগর্ভস্থ উৎসের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে নতুন বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন কঠিন হবে।

অবশ্য ইউটিলিটি অবকাঠামো সম্প্রসারণের কাজ চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে বেজা। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পিত ৩৮টি পানির পাম্প হাউসের মধ্যে ১৫টি চালু হয়েছে। একটি পানি শোধনাগারও নির্মাণাধীন। ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে এর প্রথম ধাপের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রথম ধাপে দৈনিক ৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। দ্বিতীয় ধাপে আরও ৫ কোটি লিটার সরবরাহের সক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও সক্ষমতা বাড়ানোর তথ্য দিয়েছে বেজা। অর্থনৈতিক অঞ্চলটির বিদ্যুৎ গ্রিডে ট্রান্সফরমারের মোট সক্ষমতা ২ হাজার ২৮০ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার (এমভিএ)। পল্লী বিদ্যুতায়ন এলাকার আওতায় সংযুক্ত বিদ্যুৎ লোড প্রায় ২৩০ মেগাওয়াট, যেখানে সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ৬০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি স্থাপন করেছে তিনটি স্টেশন। এগুলোর মাধ্যমে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।

তবে অবকাঠামোগত সক্ষমতা থাকা আর প্রতিটি কারখানায় চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন সেবা পৌঁছে দেওয়া এক বিষয় নয়। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু হলে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির চাহিদাও বাড়বে। ফলে ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা, সংযোগ এবং নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো নির্মাণের অগ্রগতি নয়, বাস্তবে শিল্পকারখানাগুলো কতটা নিরবচ্ছিন্ন সেবা পাচ্ছে, তারও মূল্যায়ন প্রয়োজন।

শিল্পাঞ্চল আছে, নেই পূর্ণাঙ্গ নগরসুবিধা

জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবস্থানও বিনিয়োগকারীদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। প্রধান মহাসড়ক থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত এই শিল্পাঞ্চলে পণ্য পরিবহন, শ্রমিক নিয়োগ এবং দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সহায়ক সুবিধা এখনো পর্যাপ্ত নয়।

প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা এসকিউ ইলেকট্রিক্যালসের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা এহসানুল কবির নিজামীর মতে, কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে রাতে এলাকাটি নির্জন ও অন্ধকার থাকায় শ্রমিকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কর্মস্থলে যাতায়াত এবং কাজ শেষে নিরাপদে বাড়ি ফেরার নিশ্চয়তা না থাকলে শ্রমিকদের আকৃষ্ট করা কঠিন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনায় সাধারণত উৎপাদন অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু শ্রমিকদের যাতায়াত, নিরাপত্তা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা সমান্তরালে গড়ে না উঠলে শিল্পকারখানার সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয়। মিরসরাইয়ের ক্ষেত্রেও শিল্পায়নের সঙ্গে সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নের এই সমন্বয় এখনো পূর্ণতা পায়নি।

শ্রমিকদের আবাসনসংকট মোকাবিলায় অর্থনৈতিক অঞ্চলের সাব-জোন ১৮-তে স্বল্প খরচের আবাসন নির্মাণের কাজ চলছে। তবে শিল্পকারখানার সংখ্যা ও জনবল বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যাপ্ত আবাসন এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক মনে করেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলটির বিকাশে ভৌত অবকাঠামোর পাশাপাশি সামাজিক অবকাঠামোর উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের পাশাপাশি শ্রমিকদের উপযুক্ত আবাসনের ব্যবস্থা করা গেলে বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিবেশ আরও উন্নত হবে।

সহায়ক অবকাঠামোর অন্যান্য কাজেও অগ্রগতি অসম। বেজার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র ও শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের নির্মাণকাজ ৮৭ শতাংশ শেষ হয়েছে। পরিবেশগত পরীক্ষাগারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে ৯৪ শতাংশ এবং জরুরি সাড়াদান কেন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে ৭২ শতাংশ। এসব অবকাঠামো পুরোপুরি চালু হলে শিল্পাঞ্চলের পরিচালন সক্ষমতা বাড়বে। তবে নির্মাণ শেষ করার পাশাপাশি সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

এক দরজার সেবা, বাস্তবে কতটা সহজ?

বিনিয়োগকারীদের আরেকটি অভিযোগ সরকারি অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতা নিয়ে। পরিবেশগত ছাড়পত্র, অগ্নিনিরাপত্তা, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন অনুমোদন পেতে একাধিক সরকারি সংস্থার সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ করতে হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। এতে সময় ও ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কারখানা চালুর সময়সূচিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) চালুর উদ্দেশ্যই ছিল বিভিন্ন দপ্তরের সেবা একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজে পাওয়া নিশ্চিত করা। বেজা জানিয়েছে, তাদের অনলাইন পোর্টালে বর্তমানে ৬২ ধরনের সেবা পাওয়া যাচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থার সঙ্গে পোর্টালটির সমন্বয়ের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ এখনো চলছে।

তবে অনলাইনে সেবার তালিকা থাকা এবং বাস্তবে নির্ধারিত সময়ে অনুমোদন পাওয়া এক নয়। বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো আবেদন থেকে অনুমোদন পর্যন্ত কত দিন লাগছে, কোন পর্যায়ে ফাইল আটকে থাকছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর। এসব ক্ষেত্রে সময়সীমা নির্ধারণ, আবেদন অনুসরণের স্বচ্ছ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর প্রক্রিয়া থাকলে বিনিয়োগকারীদের ভোগান্তি কমানো সম্ভব।

অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে দ্রুত শিল্পায়ন নিশ্চিত করতে জমি হস্তান্তর, ইউটিলিটি সংযোগ ও অনুমোদন প্রক্রিয়াকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। একটি সুবিধা প্রস্তুত হলেও অন্যটি অনুপস্থিত থাকলে কারখানা চালুর পুরো প্রক্রিয়া থমকে যেতে পারে।

নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবায়ও ঘাটতি

শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলো এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাব শ্রমিকদের কর্মস্থলে যাতায়াতে অনীহা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে উদ্যোক্তাদেরও অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়।

ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে নজরদারি জোরদার করতে ডিজিটাল পর্যবেক্ষণব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা সম্ভব হবে। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি রয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে একটি হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও এ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বিকল্প হিসেবে বিদ্যমান এক বা দুটি ভবনকে স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে রূপান্তর করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখছে কর্তৃপক্ষ। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন আশিক চৌধুরী।

বড় শিল্পাঞ্চলে জরুরি চিকিৎসা, অগ্নিনির্বাপণ, দুর্ঘটনায় দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং কর্মীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কেবল কল্যাণমূলক বিষয় নয়; এগুলো উৎপাদন অব্যাহত রাখারও অংশ। এসব সুবিধা অনুপস্থিত থাকলে দুর্ঘটনা বা জরুরি পরিস্থিতিতে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ার ঝুঁকি থাকে।

উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা, বাস্তবায়নে সমন্বয়ের ঘাটতি

জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীর পাশাপাশি চীনের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানও এখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি নিয়েছে। যথাযথ অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা গেলে অঞ্চলটি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

অর্থনৈতিক অঞ্চলটির সাবেক পরামর্শক আবদুল কাদের খানের মতে, অভ্যন্তরীণ সড়ক, পানি সরবরাহব্যবস্থা, গ্যাস পাইপলাইন ও বিদ্যুৎ গ্রিডের উন্নয়ন সমন্বিতভাবে সম্পন্ন করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এখানে সরাসরি সর্বোচ্চ ১৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী প্রকল্পটিকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, প্রকল্পকে ঘিরে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা কমানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানিসংকট জাতীয় পর্যায়ের সমস্যা হওয়ায় শুধু একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য আলাদা করে এর সমাধান করা কঠিন। কর্তৃপক্ষ দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করলেও সব বিকল্প তাৎক্ষণিকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ নেই।

এই বক্তব্য প্রকল্পটির একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতার দিকে ইঙ্গিত করে। অর্থনৈতিক অঞ্চলটি কেবল বেজার নিজস্ব অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল নয়; বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, সড়ক, পরিবেশগত ছাড়পত্র, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে একাধিক সরকারি সংস্থা জড়িত। ফলে একটি দপ্তরের কাজ এগোলেও অন্য দপ্তরের বিলম্বে পুরো প্রকল্পের গতি কমে যেতে পারে।

এ অবস্থায় প্রয়োজন শুধু বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক সমন্বিত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা। কোন প্লট কখন হস্তান্তর হবে, কোন এলাকায় কখন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে, পানি সরবরাহের সক্ষমতা কতটা বাড়বে এবং শ্রমিকদের আবাসন ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা কখন কার্যকর হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট সময়সূচি থাকা দরকার। একই সঙ্গে বরাদ্দ পাওয়া জমিতে কতটি কারখানা নির্মিত হচ্ছে এবং কতটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যাচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

সম্ভাবনাকে বিনিয়োগে রূপ দেওয়ার পরীক্ষা

মিরসরাইয়ের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশের শিল্পায়ন, রফতানি সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু জমির বিশাল আয়তন, বিনিয়োগের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কিংবা ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিজেরাই অর্থনৈতিক সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুত ও কার্যকরভাবে উৎপাদন শুরু করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

প্রথমত, বরাদ্দ দেওয়া জমির উন্নয়ন ও হস্তান্তর দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, শ্রমিকদের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন, নিরাপদ যাতায়াত, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রয়োজনীয় সামাজিক সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি সরকারি অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসকে কার্যকর সেবাব্যবস্থায় পরিণত করা জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রকল্পের অগ্রগতি পরিমাপের ক্ষেত্রে শুধু জমি বরাদ্দ কিংবা অবকাঠামো নির্মাণের হিসাবের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। কতটি কারখানা বাস্তবে চালু হলো, কত বিনিয়োগ উৎপাদনক্ষমতায় রূপ নিল, কত মানুষের কর্মসংস্থান হলো এবং রফতানি কতটা বাড়ল—এসব সূচককে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

এক দশক আগে যে প্রকল্পকে ঘিরে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান ও বিপুল রফতানি আয়ের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটিকে এখন পরিকল্পনার পর্যায় থেকে বাস্তব উৎপাদনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াই প্রধান কাজ। মিরসরাইয়ের বিশাল শিল্পাঞ্চলের সামনে তাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা জমি বা বিনিয়োগের ঘোষণা নয়; বরং প্রতিশ্রুত সম্ভাবনাকে কার্যকর শিল্পায়নে রূপান্তর করা।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত