অর্থজগহ প্রতিবেদন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজ খুলে নিজেদের অনুমোদিত বা সার্টিফায়েড আর্থিক পরামর্শদাতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। দ্রুত ও নিশ্চিত মুনাফার আশ্বাস দিয়ে পরিচালিত এসব প্রচারণা শুধু বিনিয়োগকারীদের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিতে ফেলছে না, একই সঙ্গে পুঁজিবাজারে আস্থার সংকটও তৈরি করছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক এসব প্রতারণার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দুই সপ্তাহের মধ্যেই বড় অঙ্কের অর্থ আয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষকে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। অথচ পুঁজিবাজারে কোনো বিনিয়োগই সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসই ভবনে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
ডিএসই চেয়ারম্যান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে নিজেদের অনুমোদিত কিংবা সার্টিফায়েড আর্থিক পরামর্শদাতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। এসব গ্রুপে দ্রুত বড় মুনাফা, নির্দিষ্ট সময়ে নিশ্চিত আয় কিংবা প্রায় ঝুঁকিহীন বিনিয়োগের মতো প্রলোভন দেখানো হয়। ফলে অভিজ্ঞতা ও পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়াই অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী এসব প্রস্তাবের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন।
বিশেষ করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যে বিনিয়োগের অর্থ কয়েক গুণ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। দুই সপ্তাহের মতো স্বল্প সময়ের মধ্যে বড় অঙ্কের আয় করার সুযোগ রয়েছে—এমন প্রচারণা বিনিয়োগকারীদের বাস্তব ঝুঁকি সম্পর্কে বিভ্রান্ত করছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন ব্যক্তিগতভাবে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে বাজার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাও তৈরি হচ্ছে।
মমিনুল ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারে ইতোমধ্যে বিনিয়োগ করা ব্যক্তিদের জন্য শেয়ারের দামে অস্বাভাবিক ওঠানামা উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কোনো কোম্পানির শেয়ারের দামে হঠাৎ বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। এ অবস্থায় যাচাই-বাছাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য বা ব্যক্তিগত পরামর্শ অনুসরণ করলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য, যথাযথ বিশ্লেষণ এবং দায়িত্বশীল আর্থিক পরামর্শের গুরুত্ব অনেক বেশি। বাজারে কোনো শেয়ারের দাম বাড়া বা কমার পেছনে প্রকৃত কারণ কী, কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা কেমন এবং বিনিয়োগের ঝুঁকি কতটা—এসব বিষয় বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুঁজিবাজারের তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম দ্রুত মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এর ইতিবাচক দিক থাকলেও যাচাইহীন তথ্য, গুজব, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা এবং কৃত্রিমভাবে বিনিয়োগকারীদের প্রভাবিত করার সুযোগও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কোনো শেয়ারের দাম বা লেনদেনকে প্রভাবিত করতে পরিকল্পিতভাবে তথ্য ছড়িয়ে দিলে তা বাজার কারসাজির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ডিএসই চেয়ারম্যান। বাজারে অস্বাভাবিক লেনদেন, দামের অস্বাভাবিক পরিবর্তন এবং সন্দেহজনক প্রচারণা শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালু হলে বিপুল পরিমাণ বাজার তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক লেনদেন বা আচরণের ধরন শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর প্রচারণার সঙ্গে বাজারের লেনদেনের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা যেতে পারে।
তবে শুধু প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি দিয়ে এ ধরনের সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি বাজারে শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও আস্থাভাজন আর্থিক মধ্যস্থতাকারী ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। বিনিয়োগকারীরা যাতে বৈধ ও দায়িত্বশীল উৎস থেকে নির্ভরযোগ্য পরামর্শ পান, সে জন্য নিবন্ধিত ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক, আর্থিক পরামর্শদাতা ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ‘নিশ্চিত মুনাফা’ বা ‘ঝুঁকিহীন আয়’—এ ধরনের কোনো ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। শেয়ারের মূল্য বাজারের চাহিদা-জোগান, কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সুদের হার, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা এবং নানা অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক কারণের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। ফলে স্বল্প সময়ে নিশ্চিতভাবে বড় মুনাফার প্রতিশ্রুতি নিজেই একটি সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের কোনো ব্যক্তি বা অনলাইন গ্রুপের পরিচয় যাচাই না করে অর্থ বিনিয়োগ না করা, অস্বাভাবিক মুনাফার প্রতিশ্রুতিতে সতর্ক থাকা এবং শেয়ার কেনাবেচার আগে কোম্পানির প্রকাশিত তথ্য ও নির্ভরযোগ্য বাজার বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া বিনিয়োগ-সংক্রান্ত তথ্যকে সরাসরি সত্য ধরে নেওয়ার পরিবর্তে এর উৎস ও বৈধতা যাচাই করা জরুরি।
বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ-২০২৬-এর আলোচনায় উঠে আসা এসব বিষয় মূলত পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীর আস্থা ও সুরক্ষার গুরুত্বকেই সামনে এনেছে। বাজারে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে একদিকে যেমন প্রতারণা ও কারসাজির বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন, তেমনি অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের জন্য তথ্যের স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি এবং দায়িত্বশীল আর্থিক পরামর্শের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।


