সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৩৮২ কোটি ডলার

অর্থজগত প্রতিবেদন
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে চাপ বেড়েছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই-আগস্টে বাণিজ্য ঘাটতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেড়ে ৩৮২ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। রপ্তানি আয় বাড়লেও আমদানি ব্যয় তার চেয়ে অনেক দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় ঘাটতি বড় হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যানে এ চিত্র উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্ট সময়ে দেশে মোট আমদানি ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ২২০ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ব্যয় ছিল এর চেয়ে ১২ দশমিক ১ শতাংশ কম। বিপরীতে, একই সময়ে রপ্তানি আয় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৮৩৮ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। ফলে পণ্য আমদানি ও রপ্তানির ব্যবধান আরও প্রশস্ত হয়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২৯৬ কোটি ডলার।

বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও বৈদেশিক লেনদেনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক চলতি হিসাবে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। জুলাই-আগস্টে দেশের চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত তিন গুণের বেশি বেড়ে ৫৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ উদ্বৃত্ত ছিল ১৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার। মূলত প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধিই চলতি হিসাবের এই উন্নতির প্রধান ভিত্তি।

অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে প্রবাসী আয় প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়ে ৫৮৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ রেমিট্যান্সের প্রবাহে ধারাবাহিক উন্নতি দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

তবে বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে উঠেছে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। জুলাই-আগস্ট সময়ে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২৪৯ কোটি ডলার, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ১২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে আমদানি ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

শিল্পের কাঁচামালসহ অন্যান্য পণ্যের আমদানি ব্যয়ও বাড়ায় সামগ্রিক আমদানি চাপ আরও বেড়েছে। তবে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি না থাকায় বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণের গতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় একদিকে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

এদিকে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকেও প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জুলাই-আগস্ট সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৭৪৯ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। তবে রপ্তানি আয়ের এই প্রবৃদ্ধি আমদানি ব্যয়ের তুলনায় কম হওয়ায় সামগ্রিক বাণিজ্য ভারসাম্যের উন্নতি হয়নি।

আর্থিক হিসাবে বাড়ছে চাপ

চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকলেও দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। কারণ আর্থিক হিসাবে অর্থের বহিঃপ্রবাহ বেড়েছে। এর ফলে চলতি হিসাবের ইতিবাচক অবস্থান সত্ত্বেও সামগ্রিক ব্যালান্স অব পেমেন্টসে চাপ তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় কমে যাওয়া এ ক্ষেত্রে বড় একটি কারণ। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের অর্থছাড় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ২৯ কোটি ১০ লাখ ডলারে নেমেছে। বিপরীতে একই সময়ে ঋণের আসল পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৫৭ কোটি ২০ লাখ ডলার। অর্থাৎ নতুন ঋণের অর্থছাড়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ বেশি থাকায় আর্থিক হিসাবে ঘাটতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এর সঙ্গে ট্রেড ক্রেডিটের নেতিবাচক অবস্থানও বৈদেশিক লেনদেনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। ফলে রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ ও চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিক বৈদেশিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি আসেনি।

উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশি অর্থছাড়েও ধীরগতি

বিদেশি অর্থায়ননির্ভর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও অর্থছাড়ের গতি কমেছে। প্রকল্পের অনুমোদন, কাজের অগ্রগতি, দরপত্র ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এর অন্যতম কারণ হতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন বৈদেশিক ঋণের সঙ্গে যুক্ত শর্ত পূরণে বিলম্ব হলেও প্রকল্পে অর্থছাড় বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এ অবস্থায় উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যেসব প্রকল্পে অর্থছাড় আটকে আছে, সেগুলোর প্রতিবন্ধকতা দ্রুত চিহ্নিত ও সমাধান করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং বিদেশি অর্থছাড়ের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে অর্থ ব্যবহারের দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়বে।

অর্থনীতির বৈদেশিক খাতকে আরও স্থিতিশীল করতে শুধু রপ্তানি বাড়ানো নয়, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য ও নতুন বাজার তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী আয় প্রবাহ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে রেমিট্যান্সই বাণিজ্য ঘাটতি ও অন্যান্য বৈদেশিক চাপের বিপরীতে সবচেয়ে কার্যকর ভারসাম্য তৈরির উৎসগুলোর একটি।

সব মিলিয়ে, অর্থবছরের শুরুতে রেমিট্যান্স ও রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় এবং বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনে নতুন ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আমদানি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক অর্থায়নের কার্যকর ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়ানোর ওপর এখন বাড়তি গুরুত্ব দিতে হবে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত