অর্থজগত ডেস্ক
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান কূটনৈতিক টানাপোড়েনে হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতায় নির্ধারিত সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কৌশলগত এই জলপথ পুনরায় খুলবে না বলে জানিয়েছে তেহরান।
রোববার (৪ অক্টোবর) ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের আওতায় নির্ধারিত সাতটি শর্ত বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খোলার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, শর্তগুলো পূরণ করাকেই জলপথটি স্বাভাবিক করার পূর্বশর্ত হিসেবে দেখছে ইরান।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। এতে বলা হয়, নির্ধারিত সাতটি শর্ত পূরণ করা হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কাতারের মধ্যস্থতায় গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন ওই প্রস্তাবের জবাব দিয়েছে।
গালিবাফ বলেন, ইরানের অবস্থান স্পষ্ট ও দৃঢ়। সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খোলা হবে না। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, দীর্ঘ সময় ধরে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া টেনে নেওয়া কিংবা একতরফা কোনো দাবি ইরান মেনে নেবে না।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জবাব পাওয়ার পর মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে তেহরানের সামগ্রিক অবস্থান জানানো হয়েছে। তবে কিছু বিষয় এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে জানানো বাকি রয়েছে।
বাঘাইয়ের ভাষ্য, মার্কিন প্রস্তাবের বড় অংশই আগের অবস্থানের কাছাকাছি, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে। তবে এ মুহূর্তে তেহরানের প্রধান মনোযোগ পারমাণবিক আলোচনা নয়; বরং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করা।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে—এমন খবরও নাকচ করেছেন বাঘাই। তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারমাণবিক বিষয়ে কোনো আলোচনা শুরু করেনি তেহরান।
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে যে নথি নিয়ে আলোচনা চলছে, তাতে সাত দিনের একটি আস্থাবর্ধক প্রক্রিয়ার কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে জুনে হওয়া সমঝোতা স্মারকের আরও উন্নত সংস্করণে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। ওই প্রক্রিয়ায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ থাকার কথা রয়েছে।
তবে আলোচনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ক্রম। দুই পক্ষের মধ্যে মূল মতপার্থক্য শর্তের বিষয়বস্তু নিয়ে নয়; বরং কোন পক্ষ আগে কী পদক্ষেপ নেবে এবং কোন পর্যায়ে প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে।
রোববার তেহরানে বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, তেহরান কূটনীতির পথেই এগোতে চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপে ফিরলে ইরানও জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলে সতর্ক করেন তিনি।
এদিকে ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া জানিয়েছেন, দেশটি তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। ফলে একদিকে হরমুজ প্রণালি খুলতে কূটনৈতিক শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে, অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতির বার্তাও দিচ্ছে তেহরান।
হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও নৌবাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হওয়ায় এর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। জলপথটি স্বাভাবিক না হলে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক বাজারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


