সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

তরুণ উদ্যোক্তাদের ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন

হামীম তাফহীম হোসেন
দেশের উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা খুঁজে বের করে তাঁদের ব্যবসায়িক উদ্যোগে অর্থায়নের নতুন কর্মসূচি চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘উদ্যোগ (UDYOG): উপজেলা-ভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’ নামে এ উদ্যোগের আওতায় একজন উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সমন্বিত অর্থায়ন পেতে পারেন। এর অর্ধেক হবে ব্যাংক ঋণ এবং বাকি অর্ধেক অনুদান। তবে উদ্যোক্তার প্রকৃত ব্যবসায়িক প্রয়োজন ও ব্যয় পরিকল্পনার ভিত্তিতেই অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট গত ১৩ সেপ্টেম্বর এ-সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, তরুণদের স্থানীয়ভাবে আয়মুখী, উৎপাদনশীল ও উদ্ভাবনী উদ্যোগে যুক্ত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই এ কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়েই সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা শনাক্ত, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, ব্যবসায়িক পরামর্শ এবং বাজারসংযোগের সুযোগ তৈরি করা হবে।

সর্বোচ্চ ১০ লাখ ঋণ, সমপরিমাণ অনুদান

কর্মসূচির অর্থায়ন কাঠামোতে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ‘Blended Financing’-এর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ একজন উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক প্রয়োজন ২০ লাখ টাকা হলে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ এবং সমপরিমাণ ১০ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে পাওয়া সম্ভব। তবে এটি স্বয়ংক্রিয় কোনো সুবিধা নয়। উদ্যোক্তার প্রকৃত চাহিদা, প্রস্তাবিত ব্যয় এবং ব্যাংকের চূড়ান্ত মূল্যায়নের ওপর অর্থায়নের পরিমাণ নির্ভর করবে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো উদ্যোক্তার ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণে ১২ লাখ টাকা প্রয়োজন হলে তিনি সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ এবং ৬ লাখ টাকা অনুদান পেতে পারেন। উদ্যোক্তার নিজস্ব বিনিয়োগ বা অন্য কোনো বৈধ উৎসের অর্থ থাকলে সেটিও অর্থায়ন পরিকল্পনায় বিবেচনা করা হবে।

বয়সসীমা ২৮ বছর

কর্মসূচিতে আবেদন করতে হলে আবেদন গ্রহণের শেষ তারিখে বয়স সর্বোচ্চ ২৮ বছর হতে হবে। পাশাপাশি আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। তাঁর নিজস্ব ব্যবসায়িক উদ্যোগ বা ব্যবসায়িক ধারণা থাকতে হবে অথবা নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকতে হবে।

তবে আগে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসা পরিচালনার জন্য ঋণ নেওয়া ব্যক্তি এ কর্মসূচিতে আবেদন করতে পারবেন না। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি ব্যক্তিও যোগ্য হবেন না। এ ক্ষেত্রে CIB যাচাইয়ে ঋণখেলাপি প্রমাণিত হলে আবেদন বাতিল বলে গণ্য হবে। সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদেরও এ কর্মসূচির আওতায় অর্থায়নের জন্য বিবেচনা করা হবে না।

যে ব্যবসায় মিলবে অর্থায়ন

কর্মসূচির আওতা বেশ বিস্তৃত। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, মৎস্য, পশুপালন, পর্যটন, সেবা, সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, হালকা প্রকৌশল এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপসহ বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে বৈধ সব ধরনের ব্যবসা ও উদ্যোগ বিবেচনা করা হবে। নতুন ব্যবসায়িক ধারণার পাশাপাশি প্রচলিত ব্যবসাকেও এ কর্মসূচিতে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

জামানত ছাড়াই ঋণের সুযোগ

তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য কর্মসূচিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জামানতসংক্রান্ত সুবিধা। নীতিমালায় বলা হয়েছে, এ কর্মসূচির আওতায় দেওয়া ঋণের বিপরীতে কোনো সহায়ক জামানত গ্রহণ ছাড়াও ঋণ দেওয়ার সুযোগ থাকবে। ফলে পর্যাপ্ত জামানত না থাকা তরুণ উদ্যোক্তারাও ব্যবসার সম্ভাবনা ও পরিকল্পনার ভিত্তিতে অর্থায়নের সুযোগ পেতে পারেন।

ঋণ ও অনুদানের অর্থ উদ্যোক্তার ব্যাংক হিসাবে একই সময়ে এককালীন এবং অনুমোদিত পূর্ণ পরিমাণে দেওয়া হবে। নগদে কোনো অর্থ দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে অর্থ নির্ধারিত ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা ব্যাংককে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

অনুদানও শর্তসাপেক্ষ

এই কর্মসূচির অনুদানকে নিঃশর্ত অর্থ সহায়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অথবা কোনো পর্যায়ে অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয়নি বলে প্রমাণিত হলে, বিতরণ করা অনুদানের সমপরিমাণ অর্থও ঋণে পরিণত হবে। ওই অর্থ সরকারি পাওনা হিসেবে বিবেচিত হয়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদায় করা হবে।

আবেদনকারীকেও এ বিষয়ে লিখিত অঙ্গীকার দিতে হবে। অনুমোদিত অর্থ ব্যক্তিগত ভোগ, জমি বা যানবাহন কেনার মতো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। প্রতিটি ব্যয়ের ভাউচার সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিবেদন দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।

ব্যাংক শাখায় আবেদন

আগ্রহী তরুণেরা সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে পারবেন। যে ব্যাংকে আবেদন করা হবে, সেখানে আগে থেকে ব্যাংক হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক নয়। আবেদনপত্র বাংলাদেশ ব্যাংক, এসএমই পোর্টাল এবং তফসিলি ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করা যাবে। ব্যাংক শাখা থেকেও ফরম নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

আবেদনের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র, সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ (যদি থাকে), পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং পূরণ করা আবেদনপত্র জমা দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার প্রমাণ হিসেবে ওয়ার্ড কমিশনার বা কাউন্সিলরের দেওয়া নাগরিক সনদ বা প্রত্যয়নপত্রও দিতে হবে।

শুধু ধারণা নয়, ব্যবসার হিসাবও দিতে হবে

নতুন ব্যবসা শুরু করতে চান এমন আবেদনকারীদের ব্যবসায়িক ধারণার সংক্ষিপ্ত বিবরণ, সম্ভাব্য ক্রেতা, ব্যবসা শুরুর সম্ভাব্য সময়, ব্যবসার ধরন ও অবস্থান, পণ্যের ধরন, কাঁচামালের উৎস, বাজারের পরিধি, সম্ভাব্য বিক্রি ও মুনাফার হিসাব দিতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং সেই ঝুঁকি মোকাবিলার পরিকল্পনাও আবেদনে উল্লেখ করতে হবে।

প্রথম বছরে কতজনের কর্মসংস্থান হবে, তার হিসাবও দিতে হবে। এর মধ্যে কতজন নারী কর্মী থাকবেন, সেটিও আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পণ্য বা সেবা বর্তমানে বাজারে কী অবস্থানে রয়েছে এবং অন্তত তিনটি সম্ভাব্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের তথ্য দেওয়ার বিধান রয়েছে।

ইতোমধ্যে ব্যবসা পরিচালনাকারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ব্যবসার নাম, ধরন, শুরুর তারিখ, ট্রেড লাইসেন্স, বিক্রয়, মুনাফা, পরিচালন ব্যয়, কাঁচামালের উৎস, বিপণন এলাকা, কর্মীর সংখ্যা এবং ভবিষ্যতে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনাসহ বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।

বাছাই হবে ব্যবসার সম্ভাবনা দেখে

উদ্যোক্তা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়িক ধারণার যৌক্তিকতা ও বাস্তবায়নযোগ্যতা, বাজারের সম্ভাবনা, আর্থিক পরিকল্পনা, উদ্যোক্তার সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি সফল উদ্যোক্তা, তফসিলি ব্যাংকের প্রতিনিধি, সরকারি-বেসরকারি সহযোগী প্রতিষ্ঠান, শিল্প খাতের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

দেশের প্রতিটি উপজেলায় তফসিলি ব্যাংকের শাখাগুলো উদ্যোক্তা অনুসন্ধান ও আবেদন গ্রহণে কাজ করবে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিটি উপজেলায় তফসিলি ব্যাংকের শাখাগুলোর মধ্য থেকে একটি লিড ব্যাংক নির্ধারণ করবে। সংশ্লিষ্ট উপজেলার আবেদনগুলো ওই লিড ব্যাংকের মাধ্যমে সমন্বয় করা হবে।

নির্বাচনের পর ১৫ কার্যদিবসে ঋণ অনুমোদন

কর্মসূচির আওতায় চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়া মানেই ঋণ নিশ্চিত হওয়া নয়। ব্যাংককে নিজস্ব ঋণনীতি এবং প্রচলিত আইন ও নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা অনুসরণ করে ঋণ অনুমোদন করতে হবে। তবে নির্বাচিত উদ্যোক্তার তালিকা পাওয়ার পর ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্থা করার নির্দেশনা রয়েছে। কোনো আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে ব্যাংককে তার কারণ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে।

ঋণ দেওয়ার পরও ব্যাংকের দায়িত্ব শেষ হবে না। উদ্যোক্তার ব্যবসার অগ্রগতি, বিক্রি, নগদ প্রবাহ, ঋণ পরিশোধের অবস্থা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের তথ্যও নির্ধারিত পদ্ধতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের Central Portal, MIS Dashboard ও National Entrepreneur Database-এ সংরক্ষণ ও প্রতিবেদন করতে হবে।

অর্থের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ

‘উদ্যোগ’ কর্মসূচিকে শুধু ঋণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। প্রত্যেক আবেদনকারীকে Financial Literacy Programme-এর আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের জন্য উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞ মেন্টরের ধারাবাহিক পরামর্শ, ট্রেড লাইসেন্স ও TINসহ ব্যবসা নিবন্ধনে সহায়তা এবং Business Plan তৈরির সহযোগিতা দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে। পাশাপাশি বাজারসংযোগ তৈরিতেও সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগের ফলে উপজেলা পর্যায়ের তরুণদের জন্য ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের একটি নতুন সুযোগ তৈরি হলো। বিশেষ করে জামানত ছাড়াই ঋণ, ঋণের সঙ্গে সমপরিমাণ অনুদান এবং প্রশিক্ষণ ও বাজারসংযোগের মতো সহায়তা একসঙ্গে থাকায় কর্মসূচিটি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে অর্থায়নের সুবিধা পেতে ব্যবসায়িক পরিকল্পনার বাস্তবতা, অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আবেদনপত্রে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির আবেদন জমা দেওয়ার সর্বশেষ তারিখ ১৫ অক্টোবর ২০২৬।

বাংলাদেশে ব্যাংক সার্কুলার

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত