অর্থজগত প্রতিবেদন
বীমা খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন জোরদার করতে নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোতে সমন্বিত বিশেষ নিরীক্ষা চালানোর উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সমন্বয়ে যৌথ নিরীক্ষক দল গঠন করা হবে।
ইতোমধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই নন-লাইফ বীমা কোম্পানি গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ও সিকদার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডে এ ধরনের বিশেষ নিরীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে আইডিআরএ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠান দুটিতে নিরীক্ষক দল নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
প্রস্তাবিত যৌথ নিরীক্ষায় বীমা কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম আয়, দাবি নিষ্পত্তি, সম্পদ ও দায়, বিনিয়োগ, পরিশোধিত মূলধন এবং বিভিন্ন ধরনের আর্থিক লেনদেনসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করা হবে। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর আর্থিক তথ্যের যথার্থতা ও নিয়ন্ত্রক বিধিবিধান পরিপালনের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে।
আইডিআরএ সূত্র জানায়, চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন দায়িত্ব নেওয়ার পর বীমা কোম্পানিগুলোর সুশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনায় পর্যায়ক্রমে ‘গভর্ন্যান্স রিভিউ’ সভা শুরু হয়েছে। এসব সভায় কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনা, আর্থিক পরিস্থিতি, অনিয়ম বা ঝুঁকি এবং সেগুলো মোকাবিলার সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স ও সিকদার ইন্স্যুরেন্সে বিশেষ নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত আসে।
গত ২৫ আগস্ট আইডিআরএ চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের গভর্ন্যান্স রিভিউ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কোম্পানিটির বীমা দাবি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির অপরিশোধিত বীমা দাবির পরিমাণ প্রায় ৩৩০ কোটি টাকা বলে সভায় উঠে আসে।
পর্যালোচনা শেষে পরবর্তী এক মাসের মধ্যে নির্দিষ্ট কার্যপরিধি বা টিওআর তৈরি করে বিশেষ নিরীক্ষা শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়। নিরীক্ষার আওতায় পে-রোল ভেরিফিকেশনও থাকবে। পাশাপাশি অনুমোদনহীন বীমা পলিসির বিপণন অবিলম্বে বন্ধ ও সেগুলো প্রত্যাহার, চালু পলিসির দ্রুত অনুমোদন গ্রহণ এবং আইডিআরএ’র ডিজিটাল কার্যক্রমে পূর্ণ সহযোগিতা করার নির্দেশ দেয়া হয়।
কোম্পানিটিকে এফডিআর, ট্রেজারি বন্ড, রি-ইন্স্যুরেন্স সুবিধাভোগী, সম্পদ ও দায়সহ বিভিন্ন আর্থিক তথ্য নিয়মিতভাবে আপলোড করতে বলা হয়েছে। পরিশোধিত মূলধনের ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, গত তিন বছরে বিদেশ থেকে রি-ইন্স্যুরেন্সের মাধ্যমে পাওয়া সুবিধার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম ও অর্থের পরিমাণ এবং কোন কোন ব্যাংকে পরিশোধিত মূলধনের অর্থ রাখা হয়েছে—এসব তথ্যও কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, গত ১৩ সেপ্টেম্বর সিকদার ইন্স্যুরেন্সের গভর্ন্যান্স রিভিউ সভায় কোম্পানিটির ব্যাংক ও স্থাবর সম্পত্তিতে বিনিয়োগ এবং অপরিশোধিত বীমা দাবির পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। সভায় কোম্পানিটির সুশাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি ও এনবিআরের সমন্বয়ে বিশেষ নিরীক্ষা দল গঠন করে তদন্ত পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এ ছাড়া পর্ষদ চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের শেয়ার ধারণের তথ্য এবং তাদের পারস্পরিক আত্মীয়তার বিবরণ ১০ কার্যদিবসের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে। আইডিআরএ’র বিধিবিধান অনুযায়ী এক মাসের মধ্যে সব বিনিয়োগ সমন্বয় এবং কোম্পানির ঋণ ও দায়ের প্রকৃত চিত্র যাচাই করে দ্রুত কর্তৃপক্ষকে জানানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন সম্প্রতি ‘দ্য ডেইলি স্টার’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, আর্থিক সংকটে থাকা যেসব বীমা কোম্পানি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা মানবে না, তাদের বিরুদ্ধে ধাপে ধাপে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এর মধ্যে প্রথম বছরের প্রিমিয়াম সংগ্রহ স্থগিত, লাইসেন্স বাতিল, প্রশাসক নিয়োগ এবং প্রয়োজনে কোম্পানি অবসায়নের মতো পদক্ষেপও থাকতে পারে।
তিনি বলেন, কোম্পানিগুলোকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকাও কঠোরভাবে পালন করা হবে। নিয়ন্ত্রকের নির্দেশনা না মানলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হবে না।
সিকদার ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ আবদুর রফিক যৌথ নিরীক্ষার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, নিরীক্ষার মাধ্যমে কোম্পানির কোনো ভুলত্রুটি চিহ্নিত হলে তা সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়।
একইভাবে নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর মুখ্য নির্বাহীদের সংগঠন বিআইএফের সেক্রেটারি জেনারেল ও সেনা ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শফিক শামিম বলেন, সমন্বিত নিরীক্ষা হলে একই তথ্য বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আলাদাভাবে সরবরাহ করার প্রয়োজন কমবে। এতে সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি তদন্ত ও পর্যালোচনার প্রক্রিয়াও দ্রুততর হতে পারে।


