অর্থজগত প্রতিবেদন
বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি ও সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হওয়ায় রিজার্ভ থেকে ১২ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বুধবার (২৮ অক্টোবর) বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে প্রতি ডলার ১২৪ টাকা থেকে ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা দরে এসব ডলার বিক্রি করা হয়। জ্বালানি আমদানির বৈদেশিক মূল্য পরিশোধ, মাসের শেষ দিকে রেমিট্যান্স প্রবাহে তুলনামূলক ধীরগতি এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বাড়তি চাহিদা—সব মিলিয়ে ডলারের বাজারে চাপ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে ডলারের মোট চাহিদা ছিল ৮০ কোটি ডলার। বিপুল চাহিদার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরবরাহ করেছে ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলোর মোট চাহিদার তুলনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরবরাহ ছিল সীমিত। এর আগে গত ২০ অক্টোবর প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৬৫ পয়সা দরে ডলার বিক্রি করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সে হিসাবে অল্প সময়ের ব্যবধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রির দর বেড়েছে। সর্বশেষ লেনদেনে ডলারের দর ১২৪ টাকা ৩০ পয়সায় পৌঁছানোয় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ঊর্ধ্বমুখী চাপের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ব্যাংকারদের তথ্যমতে, বুধবার সকালে রেমিট্যান্স সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রতি ডলার ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা দরে ডলার কেনার প্রস্তাব পেয়েছিল বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। কয়েকটি ব্যাংক ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা দরেও ডলার সংগ্রহ করে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ডলার সরবরাহ করার পর রেমিট্যান্স সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক কম দরে ডলার বিক্রির প্রস্তাব দিতে শুরু করে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের তাৎক্ষণিক প্রভাব বাজারে প্রতিফলিত হওয়ার আভাস পাওয়া যায়।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা জানান, বুধবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৩০ কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক পেমেন্ট থাকায় বাজারে ডলারের চাহিদা বেড়ে যায়। বিশেষ করে পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি আমদানিসংক্রান্ত বৈদেশিক দায় পরিশোধের প্রয়োজনীয়তা সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের চাহিদা বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে মাসের শেষ দিকে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ তুলনামূলক কমে আসায় চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রিকে বাজারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন ব্যাংকাররা। তাঁদের মতে, বড় অঙ্কের বৈদেশিক পেমেন্টের সময় ব্যাংকগুলোর ডলারের প্রয়োজন বেড়ে যায়। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করলে বাজারে অতিরিক্ত চাপ কমতে পারে। তবে সামনের দিনগুলোতে বড় অঙ্কের বৈদেশিক পরিশোধ অব্যাহত থাকলে ডলারের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে আরও কয়েক দফা হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে।
এর আগে মঙ্গলবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রির নোটিশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে শেষ পর্যন্ত সেদিন রিজার্ভ থেকে কোনো ডলার বিক্রি করা হয়নি। বুধবার বাজারের চাহিদা ও লেনদেন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি করে।
চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে মোট ১৫ কোটি ৩৫ লাখ ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবরের প্রথম ২৭ দিনে দেশে প্রবাসীরা ২৫৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। রেমিট্যান্সের এ প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার জোগানে সহায়ক হলেও নির্দিষ্ট সময়ে আমদানি ব্যয় ও অন্যান্য বৈদেশিক দায় পরিশোধের চাপ বাড়লে বাজারে সাময়িক সংকট তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে শুধু রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করাই যথেষ্ট নয়; পাশাপাশি রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ নিশ্চিত করা, রফতানি আয় বাড়ানো এবং আমদানি ব্যয়ের ওপর কার্যকর নজরদারিও জরুরি। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রি বাজারে তাৎক্ষণিক সরবরাহ বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা না হলে ডলারের ওপর চাপ আবারও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রিজার্ভ থেকে নিয়মিত ডলার বিক্রির প্রয়োজন দেখা দিলে বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতির ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
সব মিলিয়ে, ডলারের বাজারে সাম্প্রতিক চাপ বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন করে সতর্কসংকেত দিচ্ছে। সামনে জ্বালানি আমদানি ও অন্যান্য বড় বৈদেশিক পেমেন্টের চাহিদা কীভাবে সামাল দেওয়া হয় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ কতটা শক্তিশালী থাকে, তার ওপরই ডলারের বাজারের স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।


