সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ২৩% বাড়ার পূর্বাভাস

অর্থজগত প্রতিবেদন
ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং খাদ্য ও ধাতুর বাজারে অস্থিরতার কারণে ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এতে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে এ পরিস্থিতিতে বাড়তি অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন, কৃষ্ণসাগরে শস্য সরবরাহে বাধা এবং নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণসহ মূল্যবান ধাতুর চাহিদা বৃদ্ধি বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়ার প্রধান কারণ। সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে এবং রাশিয়ার তেল অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বাড়তে পারে। এর ফলে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে জ্বালানির দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। তেলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় চলতি বছর প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ৯২ ডলারে উঠতে পারে। একই সময়ে বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমার পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। ২০২০ সালের বৈশ্বিক মন্দা বাদ দিলে চার দশকের মধ্যে এটি হবে তেলের সরবরাহে সবচেয়ে বড় পতন।
তবে উচ্চমূল্যের কারণে তেলের চাহিদা কমে যাওয়ায় দাম বৃদ্ধির চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বে তেলের চাহিদা ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে। করোনা মহামারিজনিত সংকট এবং ১৯৮০ সালের তেলসংকটের পর এটি হবে চাহিদা কমে যাওয়ার তৃতীয় বৃহত্তম ঘটনা।
খাদ্যপণ্যের বাজারেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির আভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে কৃষ্ণসাগরে শস্য পরিবহনে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় ২০২৬ সালে খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশের কিছু বেশি বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে আরও ৭ শতাংশের বেশি মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে দুই বছরে খাদ্যপণ্যের দাম মোট প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়তে পারে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে খাদ্যপণ্যের দাম পূর্বাভাসের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেকর্ড মাত্রার এল নিনো, কৃষ্ণসাগরে শস্য পরিবহনে নতুন বাধা এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের বিস্তার একসঙ্গে দেখা দিলে খাদ্যসংকট আরও তীব্র হতে পারে। এতে ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ওই সময় খাদ্যসংকটের কারণে অতিরিক্ত চার কোটির বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কৃষি উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়তে পারে। চলতি বছর সারের দাম ১৪ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যার প্রধান কারণ ইউরিয়ার মূল্যবৃদ্ধি। তবে ২০২৭ সালে সারের দাম আবার ২০২৫ সালের পর্যায়ে ফিরে আসতে পারে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
এদিকে, শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে ব্যবহৃত ধাতুর দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ধাতুর দাম ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে নতুন রেকর্ড গড়তে পারে। সরবরাহে বিঘ্নের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও তথ্যকেন্দ্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের চাহিদা বাড়ছে। অন্যদিকে, ভূরাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে মূল্যবান ধাতুর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ খাতে দাম ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে ২০২৭ সালে মূল্যবান ধাতুর দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমার পূর্বাভাস রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসের মতে, একই সময়ে একাধিক বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে পণ্যবাজার। জ্বালানির উচ্চমূল্য ও বাণিজ্যে বিঘ্নের প্রভাব মূল্যস্ফীতি, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক চাপ বাড়াতে পারে। সরবরাহে নতুন কোনো ধাক্কা এলে তা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রেও বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৬ সালে পণ্যের দাম বাড়লেও ২০২৭ সালে সামগ্রিকভাবে তা ৭ শতাংশ কমতে পারে। তবে খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য ও সরবরাহসংকট অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মুদ্রানীতি আরও কঠোর করতে হতে পারে, যা বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সংঘাতের প্রভাব মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তার উদ্যোগও নিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি জানিয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ২৫টি দেশকে স্বল্প সুদের ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা হিসেবে ইতোমধ্যে ৮৭০ কোটি ডলার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি দেশ সংকট মোকাবিলায় বিদ্যমান কর্মসূচি পুনর্বিন্যাস করেছে এবং ১৯টি দেশ নতুন অর্থায়ন নিয়েছে। কয়েকটি দেশ উভয় ধরনের সহায়তাও পেয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বৈশ্বিক সংকটের এ সময়ে সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ঋণের চাপে থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পণ্যের উচ্চমূল্য দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু মূল্যস্ফীতিই বাড়বে না, বরং খাদ্যনিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনও আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

সূত্র: রয়টার্স ও বিশ্বব্যাংক

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত