অর্থজগত প্রতিবেদন
জাপানের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিতে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক অর্থবছর ধরে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানিতে জাপানের অংশ প্রায় ৩ শতাংশের আশপাশে সীমাবদ্ধ থাকলেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তা বেড়ে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছেছে। গত চার বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ অংশ। সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান বলছে, জাপানের পোশাক আমদানির বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হলেও এ অগ্রগতি ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে জাপানে ৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছে বাংলাদেশ। এ সময়ে দেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৮ কোটি ডলার। এর মধ্যে জাপানের বাজারে রফতানির অংশ দাঁড়ায় ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ধারাবাহিকভাবে বাড়েনি। বরং কখনো প্রবৃদ্ধি, কখনো পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে এ খাত। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জাপানে ১১৫ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছিল বাংলাদেশ। পরের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ১০৯ কোটি ডলারে নেমে আসে।
তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রফতানিতে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চিত্র দেখা যায়। ওই অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১১৯ কোটি ডলারে পৌঁছায়। কিন্তু এ প্রবৃদ্ধি পরবর্তী অর্থবছরেও অব্যাহত থাকেনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাপানে পোশাক রফতানি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ১১৩ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।
একই সময়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক তৈরি পোশাক রফতানিতেও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলারে নেমে আসে। এর ফলে মোট রফতানিতে জাপানের অংশ কমে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৯৩ শতাংশে। সেই তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জাপানের বাজারের অংশ বেড়ে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছানোকে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের পোশাক রফতানির পাশাপাশি জাপানের সামগ্রিক আমদানিবাজারের আকারও দেশটির গুরুত্ব তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্রের (আইটিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে জাপান ২ হাজার ৪৯৬ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছিল।
পরবর্তী এক বছরে দেশটির পোশাক আমদানি ৭ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ২ হাজার ৩১৪ কোটি ডলারে নেমে আসে। তবে এরপর থেকে আমদানিতে পুনরুদ্ধারের প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাপানের পোশাক আমদানি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৩৯০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৪১৯ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে জাপান ৪০৫ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। অর্থাৎ, এক বছরের পতনের পর দেশটির পোশাক আমদানির বাজারে পুনরায় প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্য নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
তবে জাপানের সামগ্রিক পোশাক আমদানি বাড়লেই বাংলাদেশের রফতানি সমান হারে বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। দেশটির আমদানিবাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব বাড়াতে হলে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ, ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং রফতানি সক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, জাপানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির অংশ চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে একটি প্রান্তিকের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। আগামী প্রান্তিকগুলোতেও রফতানির এ ধারা বজায় থাকে কি না, সেটিই হবে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।


