সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

ঋণাত্মক জীবন তহবিলে ছয় বীমা কোম্পানি

অর্থজগত প্রতিবেদন
দেশের জীবন বীমা খাতে আর্থিক সংকট ও গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধে ব্যর্থতার চিত্র ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। চলতি ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ছয়টি জীবন বীমা কোম্পানির লাইফ ফান্ড বা জীবন তহবিল ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির জীবন তহবিলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১২০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, পুরো জীবন বীমা খাতে বকেয়া বীমা দাবির পরিমাণ ৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় গ্রাহকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে খাতটির আর্থিক দুর্বলতার এমন চিত্র। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

জীবন বীমা কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো লাইফ ফান্ড। পলিসি গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রিমিয়ামের অর্থ থেকে নির্ধারিত ব্যয় ও অন্যান্য দায় সমন্বয়ের পর ভবিষ্যতের বীমা দাবি পরিশোধের জন্য যে তহবিল সংরক্ষণ করা হয়, সেটিই জীবন তহবিলের মূল ভিত্তি। এ তহবিল ঋণাত্মক হয়ে পড়লে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়। বিশেষ করে মেয়াদপূর্তির অর্থ ও অন্যান্য বীমা দাবি পরিশোধে পর্যাপ্ত সম্পদ আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।

আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, জীবন তহবিলে সবচেয়ে বড় ঘাটতিতে রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির ঘাটতির পরিমাণ ১ হাজার ১২০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ঘাটতি ৩২৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৫৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা, শান্তা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা এবং যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৯৪ লাখ টাকা ঘাটতি রয়েছে।

এই হিসাব থেকে স্পষ্ট, সংকটটি কেবল একটি কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ছয়টি প্রতিষ্ঠানের জীবন তহবিল ঋণাত্মক পর্যায়ে পৌঁছানো খাতটির সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রক তদারকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের বিপুল ঘাটতি পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বকেয়া বীমা দাবির বড় বোঝা ফারইস্টের

জীবন তহবিলের ঘাটতির পাশাপাশি গ্রাহকদের বীমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থতাও খাতটির বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে জীবন বীমা খাতে মোট অনাদায়ী বা বকেয়া বীমা দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৩১০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের গ্রাহকদের। অর্থাৎ, পুরো খাতের বকেয়া দাবির প্রায় ৭৫ শতাংশই আটকে আছে কোম্পানিটির কাছে।

বিপুল পরিমাণ অর্থ দীর্ঘদিন আটকে থাকায় গ্রাহকদের দুর্ভোগ বাড়ছে। অনেকেই জীবনের সঞ্চয় দিয়ে বীমা পলিসি গ্রহণ করেছিলেন ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা, সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা অবসরকালীন প্রয়োজন মেটানোর আশায়। কিন্তু মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরও অর্থ না পাওয়ায় সেই প্রত্যাশা অনিশ্চয়তায় পড়েছে। দীর্ঘসূত্রতার কারণে গ্রাহকদের আর্থিক পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বীমার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও দুর্বল হচ্ছে।

বীমা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় গ্রাহককে সুরক্ষা দেওয়া। অথচ পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও পাওনা অর্থ না পেলে সেই সুরক্ষার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে কোনো কোম্পানির কাছে বিপুল পরিমাণ দাবি দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকলে নতুন গ্রাহক সংগ্রহ এবং পুরো খাতের ব্যবসায়িক পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

গ্রাহকদের আটকে থাকা অর্থ ফেরত দিতে আইডিআরএ বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। তিনটি ধাপে মোট ১৬ হাজার ৫৮ জন গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৬৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ৪ অক্টোবর তৃতীয় ধাপে ছয়টি বীমা কোম্পানির ৭ হাজার ৬৪১ জন গ্রাহকের অনুকূলে ২৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা হস্তান্তর করা হয়। এর আগে প্রথম দুই ধাপে ৮ হাজার ৪১৭ জন গ্রাহককে দেওয়া হয়েছিল ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

গ্রাহকদের পাওনা ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও বকেয়ার তুলনায় অর্থ পরিশোধের পরিমাণ অত্যন্ত কম। মার্চ শেষে বকেয়া দাবির পরিমাণ ৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকা ধরে হিসাব করলে বিতরণ করা ৬৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা মোট বকেয়ার মাত্র ১ দশমিক ৪৫ শতাংশের সমান। ফলে এই উদ্যোগে কিছু গ্রাহক তাৎক্ষণিক স্বস্তি পেলেও সামগ্রিক সংকট নিরসনে আরও বড় পরিসরে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বকেয়া দাবির বিপুল পরিমাণ এবং জীবন তহবিলের ঘাটতি বিবেচনায় শুধু ধাপে ধাপে সীমিত অর্থ বিতরণ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, প্রকৃত সম্পদ, দায় এবং বিনিয়োগের অবস্থা পর্যালোচনা করে অর্থ পরিশোধের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বীমা খাতের সংকট মোকাবিলায় প্রথমেই কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থার নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করতে হবে। কাগজে-কলমে দেখানো সম্পদ এবং বাস্তবে নগদায়নযোগ্য সম্পদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গ্রাহকদের দায় মেটানোর জন্য কোম্পানিগুলোর হাতে কী পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ রয়েছে, তার স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, আর্থিক অনিয়ম, জালিয়াতি কিংবা অব্যবস্থাপনার অভিযোগ থাকলে সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকটের দায় যেন শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকদের ওপর গিয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অন্যতম দায়িত্ব।

তৃতীয়ত, বকেয়া বীমা দাবি পরিশোধে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কোন কোম্পানি কত টাকা, কত সময়ের মধ্যে এবং কী প্রক্রিয়ায় পরিশোধ করবে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা হলে গ্রাহকেরা অন্তত তাঁদের পাওনা ফেরতের বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাবেন। পাশাপাশি নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ ও তদারকির মাধ্যমে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

বীমা খাতের এই সংকট শুধু কয়েকটি কোম্পানির হিসাবের ঘাটতি নয়; এটি সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। গ্রাহকদের অর্থ সময়মতো ফেরত দিতে ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে বীমার প্রতি আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে। তাই সাময়িক উদ্যোগের পাশাপাশি আর্থিক অনিয়ম প্রতিরোধ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গ্রাহকের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথম শর্তই হচ্ছে—গ্রাহকের পাওনা অর্থ ফেরত দেওয়া এবং সেই অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত