সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, টানা তৃতীয় সপ্তাহে বাড়ল তেলের দাম

অর্থজগত প্রতিবেদন

মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাতের বিস্তার এবং সৌদি আরবে হুথিদের ধারাবাহিক হামলার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এর প্রভাবে টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো বেড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এশিয়ার পাশাপাশি ইউরোপের অর্থনীতি ও পুঁজি বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের সরবরাহ আরও বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শুক্রবার বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম অন্তত ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৬ দশমিক ৭২ ডলার ছাড়িয়ে যায়। আগের সপ্তাহে এ জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ, যা দুই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ সাপ্তাহিক বৃদ্ধি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, তেলের এ দাম গত মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

চলমান সংঘাতের প্রভাবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে যৌথ হামলা শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অপরিশোধিত তেলের প্রধান মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। শুক্রবার এ তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৩ ডলার ছাড়িয়ে যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা জ্বালানি সরবরাহের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবে হুথিদের ধারাবাহিক হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এ অঞ্চলে সংঘাত বিস্তৃত হলে তেল উৎপাদন, পরিবহন ও রফতানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রেও। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার পরিচালন ব্যয় এবং পণ্য উৎপাদনের খরচ বেড়ে যায়। এর ফলে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে, কারণ বাড়তি দামে তেল কিনতে তাদের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হবে।

এদিকে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে ইউরোপের পুঁজি বাজারেও। দ্য আইরিশ টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার লেনদেনের শুরুতে ইউরোপের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক স্টক্স ৬০০ দশমিক ১৩ শতাংশ কমে যায়। এর আগের দিন বৃহস্পতিবারও সূচকটিতে তিন সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন হয়েছিল। ধারাবাহিক দরপতনের কারণে সপ্তাহজুড়ে ইউরোপের শেয়ারবাজারে দুর্বল প্রবণতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ইউরোপের শিল্প ও পরিবহন খাতের ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়ে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন।

অন্যদিকে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দেশটির সরকারের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স জানিয়েছে, রাশিয়ায় পেট্রল ও ডিজেলের উৎপাদন বেড়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানির মজুতও বাড়ছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি দেশটির জ্বালানি খাতে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ও ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান বিওকে ফাইন্যানশিয়াল সিকিউরিটিজের ট্রেডিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেনিস কিসলারের মতে, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ইরানে আরও তীব্র হামলার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অন্যতম বড় অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হলে তেলের সরবরাহে নতুন বাধা সৃষ্টি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে আমদানিনির্ভর অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যয় ও পুঁজি বাজারে। তাই আগামী দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের গতিপ্রকৃতি অনেকাংশেই নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বিস্তার এবং সরবরাহ পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক থাকে তার ওপর।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত