সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
Home Blog Page 5

ইউরোপের অস্থিরতা ও সুতা আমদানিতে বাধা, চাপে পোশাক রফতানি

০

অর্থজগত প্রতিবেদন

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলমান বিক্ষোভ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মন্থরতা এবং তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুতা আমদানিতে সরকারের নতুন বিধিনিষেধ এবং সম্ভাব্য মজুরি বৃদ্ধির চাপ। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে বাড়তি দাম পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে। অন্যদিকে, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো ইউরোপের বাজারে বাণিজ্যিক সুবিধা পেলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

নারায়ণগঞ্জভিত্তিক নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ফতুল্লা ফ্যাশন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে শামীম এহসান জানান, ফ্রান্সের একজন বড় ক্রেতা প্রাথমিক সমঝোতা হওয়ার পরও একটি ক্রয়াদেশ আপাতত স্থগিত রাখতে বলেছেন। দীর্ঘস্থায়ী বিক্ষোভের কারণে দেশটির অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং এতে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও পোশাকের চাহিদা কমতে পারে বলে ওই ক্রেতা আশঙ্কা করছেন। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি হিসেবেও তিনি এ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেক যায় এ অঞ্চলে। ফলে ইউরোপের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নেতিবাচক পরিবর্তন এলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প সরাসরি প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার বলেন, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা আগে থেকেই তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছেন। এ অবস্থায় বিক্ষোভ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে পোশাক রপ্তানিকারক উর্মি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ আশরাফও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তবে স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলামের মতে, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার পেছনে বিক্ষোভের চেয়ে ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও ক্রয়াদেশ কমছে, তবে ইউরোপে পরিস্থিতি তুলনামূলক খারাপ। তাঁর ধারণা, বিক্ষোভ দীর্ঘস্থায়ী না-ও হতে পারে।

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ২৯ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। তবে ইপিবির তথ্য বলছে, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা পুনরুদ্ধারের কিছু লক্ষণ দেখা গেছে।

জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানি ও আবাসনের উচ্চমূল্য এবং শিক্ষা ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষের কারণে ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল, বেলজিয়াম ও স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর ইইউর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই মন্থরতা ভোক্তা ব্যয় ও পোশাকের চাহিদায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এদিকে, সুতা আমদানিতে সরকারের সাম্প্রতিক বিধিনিষেধ তৈরি পোশাকশিল্পের ব্যয় বৃদ্ধির নতুন কারণ হয়ে উঠেছে। দেশীয় বস্ত্রশিল্পকে সুরক্ষা দিতে নিট পোশাক তৈরিতে ব্যবহৃত ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। সংশোধিত ব্যবস্থায় আমদানিকারকদের আমদানি করা সুতার মূল্যের সমপরিমাণ ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হচ্ছে। ওই সুতা দিয়ে তৈরি পণ্য রপ্তানি এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার পরই গ্যারান্টি অবমুক্ত করা যাবে।

রপ্তানিকারকদের মতে, নতুন ব্যবস্থায় আমদানির ক্ষেত্রে বাড়তি আর্থিক চাপ ও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে তুলনামূলক বেশি দামের দেশীয় সুতা ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়ানোর পরিবর্তে আরও কমানোর চাপ দিচ্ছেন।

ফকির ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফকির কামরুজ্জামান নাহিদ জানান, আমদানি করা প্রতি কেজি ৩০ কাউন্টের কম্বড সুতার দাম ৩ দশমিক ১৫ ডলার। একই ধরনের দেশীয় সুতার দাম ৩ দশমিক ৭৫ ডলার। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, দেশীয় সুতা ব্যবহারে বাধ্য হলে প্রতি পিস পোশাকের উৎপাদন ব্যয় গড়ে ১৫ সেন্ট বাড়তে পারে। কিন্তু ইউরোপের অধিকাংশ ক্রেতা বাড়তি দাম দিতে রাজি নন বলে তিনি জানিয়েছেন। এতে বাংলাদেশের পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতা আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রপ্তানিকারকদের উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সুবিধা। ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) আওতায় অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পেলে বাংলাদেশের পণ্য তুলনামূলক অসুবিধায় পড়তে পারে। এর সঙ্গে জ্বালানিসংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য মজুরি বৃদ্ধির চাপ যুক্ত হলে দেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও কমার ঝুঁকি রয়েছে।

ফকির কামরুজ্জামান নাহিদ সতর্ক করে বলেন, আগামী এক মাস পোশাকশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ের মধ্যে সুতা আমদানির বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা না হলে বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা থাকা কিছু ক্রয়াদেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশে চলে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, ইউরোপের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের রপ্তানি চাহিদায় চাপ তৈরি করছে, আর অভ্যন্তরীণ নীতিগত সীমাবদ্ধতা বাড়াচ্ছে উৎপাদন ব্যয়। এ পরিস্থিতিতে দেশীয় বস্ত্রশিল্পের স্বার্থ রক্ষা এবং রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা জরুরি। সুতা আমদানির বিধিনিষেধের ব্যয়গত প্রভাব পর্যালোচনা, উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ও নতুন ক্রয়াদেশ আকর্ষণের সক্ষমতা আরও চাপে পড়তে পারে।

ফুটপাতের খাবারেও নিবন্ধন বাধ্যতামূলক

০

অর্থজগত প্রতিবেদন

রাস্তার পাশে পিঠা, পুরি, পেঁয়াজুসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার বিক্রি করেন এমন ক্ষুদ্র ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদেরও নিবন্ধনের আওতায় আনছে সরকার। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং খাদ্য ব্যবসায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্যপণ্যের জন্য নিবন্ধন ও লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।

বুধবার (২১ অক্টোবর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কর্তৃপক্ষ জানায়, গত ১৬ জুলাই ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট খাদ্য ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী ১ নভেম্বর থেকে প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও লাইসেন্স গ্রহণের জন্য আবেদন করতে হবে।

নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এবং নতুন প্রবিধানমালা অনুযায়ী, নির্ধারিত চার শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক লাইসেন্স, প্রিমিসেস লাইসেন্স, উৎপাদিত ও আমদানিকৃত পণ্যের লাইসেন্স এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত পণ্যের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্য স্থাপনার জন্য নিবন্ধন গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে।

নতুন নিয়মের আওতায় ফুটপাতের অস্থায়ী খাবারের দোকান, ভ্রাম্যমাণ খাদ্য বিক্রেতা, ছোট রেস্তোরাঁ, খাদ্য আমদানিকারক এবং বড় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজন অনুযায়ী নিবন্ধন বা লাইসেন্স নিতে হবে। প্রচলিত ১৬ ধরনের খাদ্য ব্যবসার ক্ষেত্রে শুধু নিবন্ধন যথেষ্ট হলেও বিশেষ ধরনের বা সুপার ফুড পণ্যের ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী লাইসেন্স নিতে হবে।

কর্তৃপক্ষের এ উদ্যোগের লক্ষ্য খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, আমদানি ও বিক্রির বিভিন্ন পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ানো। তবে নতুন বিধান কার্যকর করতে ক্ষুদ্র ও নিম্ন আয়ের ব্যবসায়ীদের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করা, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া এবং নিয়ম পালনে সহায়তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

এলডিসি উত্তরণ পেছানোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে অক্টোবরে – বাণিজ্যমন্ত্রী

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়ে চলতি অক্টোবরের মধ্যেই সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বাড়তি সময়কে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির প্রস্তুতি জোরদার করার পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করতে চায় সরকার। একই সঙ্গে ব্যবসা সহজ করা, জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আজ রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) ও ইআরএফ আয়োজিত ‘বাংলাদেশ’স এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ট্রাজেক্টরি: ক্রিটিক্যাল চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড এক্সপ্লোরিং পলিসি অপশনস’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
এলডিসি উত্তরণ পেছানোর অগ্রগতি তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) প্রক্রিয়া অতিক্রম করার পর বিষয়টি জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসক) তোলা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য আরও তিন বছর সময় চাওয়ার বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ইতিবাচক অবস্থান রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। আগামী ২৪ নভেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমার আগেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা তাঁর।
বাড়তি সময় চাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি যথেষ্ট ছিল না। উত্তরণের রাজনৈতিক গুরুত্বকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হলেও এর সুবিধা কাজে লাগানো এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা তৈরিতে প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেওয়া হয়নি। এখন অতিরিক্ত সময় পাওয়া গেলে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে ইইউর সঙ্গে ভাগ করা হয়েছে।
উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য ও সেবার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে আট থেকে দশটি দেশের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) অথবা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। ইইউর সঙ্গে এফটিএ আলোচনার জন্য প্রধান আলোচক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং প্রথম পর্যায়ের কারিগরি আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি চলছে। বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের আগেই এ আলোচনা শেষ করতে চান মন্ত্রী। পাশাপাশি ইইউর বাজারে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার প্রস্তুতিও চলবে।
বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু বিদেশি বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছ আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করেন তিনি। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য বিক্রির জন্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো এবং রফতানি সম্প্রসারণে বিদেশি বাজারে প্রবেশের সুযোগ—দুটিকেই সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন মন্ত্রী।
ব্যবসা শুরুর দীর্ঘসূত্রতাকে বিনিয়োগের অন্যতম বাধা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাব ও প্রাথমিক ছাড়পত্র সংগ্রহ থেকে শুরু করে আমদানি নিবন্ধন সনদ নিয়ে যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র খোলা পর্যন্ত গড়ে ৩৫৫ দিন লেগে যায়। এ পরিস্থিতি বদলাতে একক অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে দেশ-বিদেশের যেকোনো স্থান থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা ও ফি পরিশোধ করে লাইসেন্স নেওয়া যাবে। সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে ফিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৌঁছে যাবে।
এ ছাড়া যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) সেবা পুরোপুরি অনলাইন করা, বিভিন্ন লাইসেন্সের মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়ানো এবং বিভিন্ন সংস্থার পৃথক পরিদর্শনের পরিবর্তে সমন্বিত পরিদর্শন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব সংস্কারের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে লাইসেন্স ও অনুমোদন পেতে উদ্যোক্তাদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটানোর লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
জ্বালানি সংকটকে নতুন বিনিয়োগের বড় প্রতিবন্ধকতা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে নতুন ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাসকূপ খননের কাজ চলছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হলে এলএনজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত না থাকায় বাংলাদেশকে চাপের মুখে পড়তে হয়। এ ঝুঁকি কমাতে কৌশলগত মজুত ও সংরক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফটিআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোস্তফা আবিদ খান। এতে সভাপতিত্ব ও স্বাগত বক্তব্য দেন ইআরএফ সভাপতি দৌলত আখতার মালা। সমাপনী বক্তব্য দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মঈনুল হক।

২০৩০ সালের মধ্যে একক ১৫% ভ্যাট চালুর পরিকল্পনা

০

৫০০টির বেশি পণ্য ও সেবায় করছাড় প্রত্যাহারের উদ্যোগ, সুরক্ষায় থাকবে নিত্যপণ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত
অর্থজগত প্রতিবেদন
দেশের রাজস্ব আয় বাড়াতে মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) বিদ্যমান ছাড় ও অব্যাহতি পর্যায়ক্রমে তুলে নিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে একক ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রস্তাব অনুযায়ী, অধিকাংশ পণ্য ও সেবাকে অভিন্ন হারের আওতায় আনা হলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, কৃষি উপকরণ, গণপরিবহন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতকে এই হারের বাইরে রাখার চিন্তা রয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে একদিকে রাজস্ব আদায়ের পরিধি বাড়তে পারে, অন্যদিকে বহু পণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের বিরোধিতার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।

রাজস্ব খাতের সংস্কার নিয়ে সম্প্রতি ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কারিগরি কমিটির সঙ্গে বৈঠকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রতিনিধিরা ভ্যাট অব্যাহতি পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহারের প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক সময়সূচি ও সম্ভাব্য পণ্য-সেবার তালিকাও উপস্থাপন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। রাজস্ব সংস্কার এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় আগামী নভেম্বরে আইএমএফের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফরের সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমানে ইলেকট্রনিক পণ্য, কম্পিউটার সামগ্রী, মেট্রোরেল, রেস্তোরাঁ, স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়াপারসহ ৫০০টির বেশি পণ্য ও সেবায় ২ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাসকৃত ভ্যাট হার কিংবা সম্পূর্ণ অব্যাহতির সুবিধা রয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব সুবিধার একটি বড় অংশ ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবাকে ১৫ শতাংশ অভিন্ন ভ্যাট হারের আওতায় আনা হবে।

রাজস্ব কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আইএমএফ বাংলাদেশের কাছে জানতে চেয়েছে, কীভাবে নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়িয়ে কর অব্যাহতির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। এর জবাবে সরকার একটি পর্যায়ভিত্তিক পরিকল্পনা দিয়েছে। তবে সব ধরনের ছাড় একসঙ্গে তুলে না নিয়ে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় কিছু খাতকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে অনুমোদিত ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোসহ ব্যাংকিং ও জ্বালানি খাতে সংস্কারের অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু বিভিন্ন সংস্কার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অগ্রগতি প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় নতুন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ঘোষণা করলেই হবে না; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তার বাস্তবসম্মত রূপরেখাও প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে একক ভ্যাট হার চালুর প্রতিশ্রুতি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা নির্ভর করবে সরকারের বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর। আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কোন কোন সংস্কার সম্পন্ন করা সম্ভব, সে বিষয়ে সরকারকে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার দিতে হবে। পাশাপাশি করছাড় প্রত্যাহার করলে অতিরিক্ত কত রাজস্ব আসবে, তারও নির্ভরযোগ্য হিসাব উপস্থাপন জরুরি।

এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিভিন্ন করছাড় ও রেয়াতের কারণে ভ্যাট খাতে রাজস্ব হারানোর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা ওই সময়ের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। একই অর্থবছরে ভ্যাট থেকে প্রকৃত রাজস্ব আদায় হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, অব্যাহতি ও রেয়াতের কারণে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রকৃত আদায়ের চেয়েও বেশি। অন্যদিকে, সামগ্রিক করছাড়ের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। এই বিশাল রাজস্ব সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

তবে করছাড় প্রত্যাহারের প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ওপর। ইলেকট্রিক্যাল সামগ্রী, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার আনুষঙ্গিক পণ্য, রড-স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, রেস্তোরাঁ, নন-ব্র্যান্ডের পোশাক, সমুদ্রগামী জাহাজ এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত লিফটের মতো খাতে বর্তমানে বিভিন্ন হারে রেয়াতি সুবিধা রয়েছে। এসব সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা আর নবায়ন না করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবার উৎপাদন ব্যয়, বিক্রয়মূল্য কিংবা ভোক্তার খরচ বাড়তে পারে।

পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য চালু থাকা প্যাকেজভিত্তিক ভ্যাট ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা। এর পরিবর্তে তাঁদেরও অভিন্ন হারের আওতায় আনার চিন্তা করছে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর বিদ্যমান হ্রাসকৃত ভ্যাট হারও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও উৎপাদন খাতে ভ্যাট সুবিধা কমানো হলে তার প্রভাব অন্যান্য পণ্য ও সেবার মূল্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

অন্যদিকে, নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ এড়াতে কিছু খাতে ছাড় অব্যাহত রাখার প্রস্তাব রয়েছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, লবণ ও মরিচের মতো মৌলিক খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য ও কৃষি উপকরণকে সুরক্ষার আওতায় রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একইভাবে গণপরিবহন, প্রাথমিক ও মৌলিক শিক্ষা, সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা এবং জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ক্ষেত্রে ভ্যাট সুবিধা বহাল রাখার কথা বিবেচনা করছে সরকার। এসব খাতে ছাড় বজায় রাখা গেলে সংস্কারের কারণে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।

অভিন্ন ভ্যাট হার চালুর উদ্যোগ অবশ্য বাংলাদেশে নতুন নয়। ২০১৫ সালে একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যবসায়ীদের তীব্র বিরোধিতার মুখে সরকার তা থেকে সরে আসে। এবারও প্রস্তাবটির গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে ভ্যাটের হার, বাস্তবায়নের পদ্ধতি এবং ব্যবসায়ীদের ওপর এর প্রভাবের ওপর। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হকের মতে, অভিন্ন ভ্যাট হার চালু করা সম্ভব হলেও হারের মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ। সামগ্রিক হার কিছুটা কমিয়ে যুক্তিসংগত পর্যায়ে নির্ধারণ করা হলে ব্যবসায়ীদের আপত্তি কমতে পারে।

সব মিলিয়ে, ভ্যাট ব্যবস্থাকে সহজ করা, কর ফাঁকির সুযোগ কমানো এবং রাজস্বের ভিত্তি সম্প্রসারণের জন্য একক হার চালুর পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে সংস্কারের সাফল্য শুধু রাজস্ব বৃদ্ধির অঙ্ক দিয়ে বিচার করা যাবে না। কর প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ানো, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য নিয়ম মানা সহজ করা, করজাল সম্প্রসারণ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষার ব্যবস্থাও জরুরি। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও কার্যকর তদারকি ছাড়া হঠাৎ করছাড় প্রত্যাহার করা হলে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন। তাই ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, স্বচ্ছ হিসাব এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে সরকারের প্রধান পরীক্ষা।

অর্থপাচার ঠেকাতে বীমা কোম্পানিতে কঠোর নজরদারির নির্দেশ বিএফআইইউ’র

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকি কমাতে দেশের সব বীমা কোম্পানির জন্য কঠোর পরিপালন কাঠামো নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। নতুন নির্দেশনায় গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ, কেন্দ্রীয় কমপ্লায়েন্স ইউনিট গঠন এবং আর্থিক লেনদেনের নথি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে বেনামি পরিচয়ে হিসাব পরিচালনার ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতা এবং উচ্চ ঝুঁকির গ্রাহকদের ওপর বাড়তি নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে জারি করা এ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, প্রচলিত আইন ও বিএফআইইউর বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিটি বীমা কোম্পানিকে নিজস্ব মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদ অথবা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ও ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন নিয়ে এসব নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, ঝুঁকি ও পরিচালনাগত পরিবর্তনের সঙ্গে সংগতি রেখে নিয়মিতভাবে নীতিমালা পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনায় বীমা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনার দায়বদ্ধতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিমালা ও বিএফআইইউর নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদেরই পালন করতে হবে। অর্থাৎ, শুধু নীতিমালা তৈরি করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; এর কার্যকর বাস্তবায়ন ও তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে।

এ লক্ষ্যে প্রতিটি বীমা কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় কমপ্লায়েন্স ইউনিট গঠন করতে হবে। এ ইউনিটের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রধান মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তা (সিএএমএলসিও)। প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ কার্যক্রম তদারকি, ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ইউনিটটি মূল ভূমিকা পালন করবে।

কেন্দ্রীয় কমপ্লায়েন্স ইউনিটকে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার ধরন, আকার, কার্যক্রমের পরিধি ও গ্রাহকসংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে ঝুঁকি মোকাবিলার কৌশল ও কর্মসূচি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ কাজের জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি, চিহ্নিত সমস্যা ও সুপারিশ নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে।

প্রতিবেদনটি ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহীর কাছে জমা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনাসহ পরিচালনা পর্ষদ কিংবা সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা কমিটির সামনে উপস্থাপন করতে হবে। প্রতি বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি বিএফআইইউর কাছে পাঠানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বীমা কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ তদারকি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জবাবদিহি আরও জোরদার করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

নতুন নির্দেশনার আওতা শুধু প্রধান কার্যালয়ে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। কোম্পানির সব শাখা, এজেন্সি, ইউনিট, দাবি নিষ্পত্তি এজেন্ট ও কমিশন এজেন্টের কার্যক্রমেও একই ধরনের পরিপালনব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। গ্রাহক শনাক্তকরণ, লেনদেন পর্যবেক্ষণ, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রক্রিয়াকে এই কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।

গ্রাহকের পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিএফআইইউ। এ জন্য আধুনিক ইলেকট্রনিক গ্রাহক-পরিচিতি যাচাইব্যবস্থা বা ই-কেওয়াইসি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বেনামি কিংবা ছদ্মনামে কোনো হিসাব বা গ্রাহক সম্পর্ক পরিচালনার সুযোগ রাখা যাবে না। কোনো লেনদেন সন্দেহজনক মনে হলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের পরিচয়, আর্থিক কার্যক্রম ও লেনদেনের প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।

বিশেষ করে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে পরিচালিত লেনদেন এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আর্থিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এসব গ্রাহকের ঝুঁকি মূল্যায়ন ও লেনদেন পর্যবেক্ষণ আরও নিবিড়ভাবে করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।

নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট প্রতিবেদন দাখিলের নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকিং বা মোবাইল আর্থিক সেবা চ্যানেলের বাইরে এক দিনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ লেনদেন হলে পরবর্তী মাসের প্রথম সাত কার্যদিবসের মধ্যে নির্ধারিত ওয়েবপোর্টালের মাধ্যমে বিএফআইইউকে জানাতে হবে। এ ছাড়া উদ্দেশ্যহীন, অস্বাভাবিক বা জটিল লেনদেনের ধরন শনাক্তে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সতর্ক থাকতে হবে। সন্দেহজনক কার্যক্রম ধরা পড়লে অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনব্যবস্থা অনুসরণ করে দ্রুত কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।

নথি সংরক্ষণের বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো পলিসি বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা দাবি নিষ্পত্তির পরও গ্রাহকের পরিচয় যাচাইসংক্রান্ত নথি, লেনদেনের রেকর্ড, নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও প্রশিক্ষণসংক্রান্ত দলিল অন্তত পাঁচ বছর নিরাপদে সংরক্ষণ করতে হবে। পরবর্তী সময়ে কোনো লেনদেনের বিষয়ে তদন্ত বা যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে এসব নথি যেন সহজে পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। দেশের সব বীমা প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে পরিপালনের জন্য বলেছে বিএফআইইউ।

নতুন এ কাঠামোর মাধ্যমে বীমা খাতে অর্থের উৎস ও লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়ানো, সন্দেহজনক আর্থিক কার্যক্রম দ্রুত শনাক্ত করা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পলিসি গ্রহণ, প্রিমিয়াম জমা ও দাবি পরিশোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপে কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠিত হলে বীমা খাতকে অবৈধ অর্থের প্রবাহ হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে। তবে নির্দেশনার বাস্তব সুফল পেতে নিয়মিত তদারকি, দক্ষ জনবল এবং সব পর্যায়ে কার্যকর পরিপালন নিশ্চিত করা জরুরি।

নগদ লেনদেনে ব্যয় ২৮ গুণ বেশি, সাশ্রয়ের সুযোগ ডিজিটালে – বাংলাদেশ ব্যাংক

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
নগদ টাকার পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার বাড়ানো গেলে দেশের অর্থনীতিতে বিপুল ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নগদ লেনদেন পরিচালনায় বছরে যে ব্যয় হয়, ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে তা প্রায় ২৮ ভাগের এক ভাগ। ২০২৩ সালে দেশে নগদ লেনদেনের বার্ষিক ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে, ডিজিটাল লেনদেনের পরিচালন ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারলে ব্যক্তি, ব্যাংক ও সামগ্রিক অর্থনীতির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘দ্য কস্ট অব ক্যাশ স্টাডি ইন বাংলাদেশ: আ কম্পারেটিভ অ্যানালাইসিস অব ক্যাশ অ্যান্ড ডিজিটাল পেমেন্ট’ শীর্ষক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নগদ লেনদেনের ব্যয় ছিল ওই বছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। অন্যদিকে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যয় ছিল জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ। মাথাপিছু হিসাবে বছরে নগদ লেনদেনে ব্যয় হয় ৯ হাজার ৯৩৮ টাকা। ডিজিটাল লেনদেনে একই ব্যয় মাত্র ৩৪৮ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বাসসকে বলেন, নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপেই উল্লেখযোগ্য ব্যয় রয়েছে। ব্যাংক নোট ছাপানোর কাঁচামাল আমদানি, নোট মুদ্রণ, পরিবহন, বিতরণ ও বাজারে প্রচলন বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিয়মিত অর্থ ব্যয় করতে হয়। ব্যবহারের ফলে নোট পুরোনো, ছেঁড়া ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ায় সেগুলোর পরিবর্তে নতুন নোট ছাপাতে হয়। ফলে এ ব্যয় বারবার তৈরি হয়। ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার বাড়লে এসব ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আর্থিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা বাড়ানো সম্ভব।

গবেষণায় নগদ লেনদেনের ব্যয়ের একটি বড় অংশ ব্যাংক ও ভোক্তাদের ওপর পড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। নগদ লেনদেন পরিচালনায় ব্যাংকগুলোর বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ। ভোক্তাদের এ-সংক্রান্ত ব্যয় প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা ব্যয় বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।

নগদ ব্যবস্থাপনার এ ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে নোট ছাপানো ও বিতরণ, অর্থ পরিবহন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যাংকের শাখা ও এটিএম বুথ পরিচালনা এবং টাকা তোলা, বহন ও ব্যবহারে মানুষের ব্যয় করা সময়ের আর্থিক মূল্য। অর্থাৎ নগদ অর্থের ব্যবহার শুধু মুদ্রা ছাপানোর ব্যয় বাড়ায় না, বরং ব্যাংকিং কার্যক্রম ও দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা তৈরি করে।

নগদনির্ভর অর্থনীতির আরেকটি বড় সমস্যা ছায়া অর্থনীতির বিস্তার। গবেষণায় বলা হয়েছে, ছায়া অর্থনীতির কারণে সরকারের সম্ভাব্য বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ ৯৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এ অর্থ জিডিপির ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং নগদ লেনদেনের মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৫৪ দশমিক ৭৬ শতাংশের সমান। এই সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি হিসাবের বাইরে রাখলেও নগদ লেনদেনের ব্যয় ডিজিটাল লেনদেনের তুলনায় প্রায় ১২ গুণ বেশি।

তবে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যয় কম হলেও এ ব্যবস্থা পরিচালনায়ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গবেষণার হিসাবে, ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা থেকে বছরে আনুমানিক ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা আয় হয়। বিপরীতে, পরিচালন ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। ফলে এ খাতে আয়-ব্যয়ের ব্যবধান দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা। এই পরিস্থিতিতে ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি সেবার ব্যয় কমানো এবং পরিচালন দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি।

গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইল আর্থিক সেবা ও ইলেকট্রনিক অর্থ স্থানান্তরের প্রসার ঘটলেও দেশের মোট লেনদেনের ৮০ শতাংশের বেশি এখনো নগদে সম্পন্ন হয়। ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর পথে প্রধান বাধা হলো ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া তুলনামূলক বেশি মাশুল, লেনদেনের অর্থ নিষ্পত্তিতে বিলম্ব, বিভিন্ন পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে আন্তসংযোগের সীমাবদ্ধতা এবং অনির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল প্রতারণা, লেনদেন ব্যর্থ হওয়া, ভুল হিসাবে অর্থ চলে যাওয়া এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমিত দক্ষতার সমস্যা। এসব কারণে অনেক গ্রাহক ও ব্যবসায়ী এখনো ইলেকট্রনিক লেনদেনের বিষয়ে পুরোপুরি আস্থাশীল নন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য লেনদেনের মাশুল গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য। তাঁদের মুনাফার পরিমাণ তুলনামূলক কম হওয়ায় ডিজিটাল লেনদেনের অতিরিক্ত খরচ ব্যবসার লাভ আরও কমিয়ে দিতে পারে।

এ কারণে ডিজিটাল লেনদেনের মাশুল, অর্থ নিষ্পত্তির সময় ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে ব্যবসায়ীদের কাছে স্পষ্ট তথ্য থাকা প্রয়োজন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের জন্য সহজে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং প্রতারণার ঘটনায় কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা শুধু সময় ও শ্রম সাশ্রয়ে সীমাবদ্ধ নয়; এর মাধ্যমে লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষিত থাকে, যা আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়াতে এবং অর্থের অপব্যবহার শনাক্ত করতে সহায়তা করে।

ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণে বাংলাদেশ ব্যাংক জাতীয় মানদণ্ড হিসেবে ‘বাংলা কিউআর’ চালু করেছে। বিভিন্ন পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে আন্তসংযোগ বাড়ানো এবং কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনকে সহজলভ্য করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। ব্যবসায়ীদের কাছে এ পদ্ধতি আরও আকর্ষণীয় করতে ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআর লেনদেনে ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি শূন্য শতাংশ নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তবে শুধু মাশুল কমানো কিংবা প্রযুক্তিগত অবকাঠামো সম্প্রসারণ করলেই ডিজিটাল লেনদেনের কাঙ্ক্ষিত প্রসার ঘটবে না। এ ব্যবস্থাকে সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও সহজে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ, দ্রুত অর্থ নিষ্পত্তি এবং বিভিন্ন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের মধ্যে কার্যকর আন্তসংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানো এবং ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিও গুরুত্বপূর্ণ।

নগদ ও ডিজিটাল লেনদেনের ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিবন্ধকতা মূল্যায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায় ডেস্কভিত্তিক পর্যালোচনা, পেমেন্ট ব্যবস্থার তথ্য ও নীতিমালা বিশ্লেষণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ২১টি সাক্ষাৎকার এবং পাঁচটি দলভিত্তিক আলোচনা করা হয়েছে।

গবেষণার সামগ্রিক চিত্র বলছে, নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমানো গেলে দেশের অর্থনীতিতে বিপুল ব্যয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এ পরিবর্তনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ গ্রাহকদের জন্য ডিজিটাল লেনদেনের খরচ কমানো, নিরাপত্তা জোরদার এবং সেবার প্রতি আস্থা তৈরি করা গেলে নগদনির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ করা সম্ভব হবে।

এলডিসি উত্তরণ পেছানোর সিদ্ধান্ত অক্টোবরে – বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পেছানোর বিষয়ে চলতি অক্টোবরের মধ্যেই সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বাড়তি সময়কে কাজে লাগিয়ে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি উত্তরণের আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

গতকাল রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) মিলনায়তনে বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) ও ইআরএফ আয়োজিত ‘বাংলাদেশ’স এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ট্রাজেক্টরি: ক্রিটিক্যাল চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড এক্সপ্লোরিং পলিসি অপশনস’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর প্রক্রিয়ার অগ্রগতি তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) প্রয়োজনীয় ধাপ বাংলাদেশ অতিক্রম করেছে। পরবর্তী পর্যায়ে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসক) উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোও এ বিষয়ে একমত হয়েছে বলে জানান তিনি। আগামী ২৪ নভেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমার আগেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে বলে তাঁর প্রত্যাশা।

বাণিজ্যমন্ত্রীর মতে, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণকে ঘিরে রাজনৈতিক অর্জন তুলে ধরার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও এর অর্থনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি যথেষ্ট ছিল না। উত্তরণের ফলে যেসব সুযোগ তৈরি হবে, সেগুলো কাজে লাগানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রতিকূলতা মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হয়নি। এ কারণেই বাড়তি তিন বছর সময় চাওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, এই সময় কীভাবে কাজে লাগানো হবে, সে বিষয়ে একটি সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভাগ করা হয়েছে। পরিকল্পনার লক্ষ্য হচ্ছে, রফতানি সক্ষমতা বাড়ানো, বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখা এবং উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার জন্য দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত করা।

এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় রফতানি বাজারে বিদ্যমান সুবিধা ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে আট থেকে দশটি দেশের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) অথবা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ আলোচনার জন্য প্রধান আলোচক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রথম দফার কারিগরি আলোচনা শুরুর প্রস্তুতিও চলছে, যদিও আলোচনার দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের আগেই এ আলোচনা শেষ করতে চান বাণিজ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে ইইউর বাজারে জেনারালাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্সেস প্লাস (জিএসপি প্লাস) সুবিধা পাওয়ার প্রস্তুতিও চলবে। তবে এফটিএ সম্পন্ন করা সম্ভব হলে বিকল্প হিসেবে জিএসপি প্লাসের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি।

বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখার পাশাপাশি বিনিয়োগ বাড়াতে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়নকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে সরকার। মন্ত্রীর মতে, বিনিয়োগ আকর্ষণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছ আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দেশে উৎপাদিত পণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো এবং রফতানি বৃদ্ধির জন্য বিদেশি বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যবসা শুরু করতে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে বিনিয়োগের অন্যতম বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাব ও প্রাথমিক ছাড়পত্র সংগ্রহের পর আমদানি নিবন্ধন সনদ নেওয়া এবং যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা পর্যন্ত গড়ে ৩৫৫ দিন লেগে যায়। এত দীর্ঘ সময় ব্যয় হলে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ ও বিনিয়োগের গতি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ পরিস্থিতি বদলাতে একক অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এর আওতায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা ও ফি পরিশোধ করে দেশ-বিদেশের যেকোনো স্থান থেকে লাইসেন্স নেওয়া যাবে। সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে লাইসেন্সের ফি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৌঁছে যাবে। এতে উদ্যোক্তাদের একাধিক দপ্তরে যাতায়াত ও প্রশাসনিক জটিলতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) সেবা পুরোপুরি অনলাইনে আনা, বিভিন্ন লাইসেন্সের মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ বছর করা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার পৃথক পরিদর্শনের পরিবর্তে সমন্বিত পরিদর্শন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব সংস্কারের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে ব্যবসা শুরু করতে লাইসেন্স ও অনুমতির পেছনে উদ্যোক্তাদের দীর্ঘ সময় ব্যয়ের পরিস্থিতি থেকে বের করে আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে জ্বালানি সংকটকেও বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন মন্ত্রী। তিনি জানান, গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে নতুন ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাসকূপ খননের কাজ চলছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় কৌশলগত মজুত ও সংরক্ষণসক্ষমতা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, এলএনজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুতব্যবস্থা না থাকায় আন্তর্জাতিক সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশ দ্রুত চাপে পড়ে। ফলে জ্বালানি ও জরুরি পণ্যের সরবরাহ নিরাপদ রাখতে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সরকারের এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও সময় কমানো, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখা। এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানোর সুযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার মাধ্যমে অর্থনীতিকে নতুন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে সরকার।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোস্তফা আবিদ খান। সভাপতিত্ব ও স্বাগত বক্তব্য দেন ইআরএফ সভাপতি দৌলত আখতার মালা। সমাপনী বক্তব্য দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মঈনুল হক।

এআই বিনিয়োগের উদ্বেগে বিশ্ব শেয়ারবাজারে ধস

০

অর্থজগত ডেস্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির আশঙ্কায় বিশ্ব শেয়ারবাজারে নতুন করে বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিটে প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারগুলোর বড় দরপতনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে এশিয়ার বাজারেও। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস সোমবার এশিয়ার অধিকাংশ শেয়ারবাজার নিম্নমুখী ছিল। বিশেষ করে চিপ নির্মাতা ও এআই প্রযুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে দরপতন বাজারের প্রধান সূচকগুলোকে চাপে ফেলেছে।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই প্রযুক্তির বিকাশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হলেও এসব বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আয় কখন আসবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে। ডেটা সেন্টার নির্মাণ, উন্নত চিপ উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিপুল মূলধনের প্রয়োজন হচ্ছে। পাশাপাশি উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

গত সপ্তাহে বিশ্ব শেয়ারবাজারে ব্যাপক ওঠানামা দেখা গেলেও শুক্রবারের লেনদেন শেষ হয়েছিল তুলনামূলক ইতিবাচক অবস্থানে। তবে নতুন সপ্তাহের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিক্রির চাপ তীব্র হয়। ওয়াল স্ট্রিটের তিনটি প্রধান সূচকই বড় দরপতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ করে। প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক সূচক কমে যায় ২ শতাংশের বেশি। মাইক্রোসফট, এনভিডিয়া, এএমডি ও অ্যামাজনের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দরপতন সূচকটির নিম্নমুখী প্রবণতায় বড় ভূমিকা রাখে।

বাজারের এই অস্থিরতার পেছনে শুধু প্রযুক্তিপণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা নয়, বরং এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের আর্থিক যৌক্তিকতা নিয়েও নতুন করে মূল্যায়ন শুরু হয়েছে। ন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়া ব্যাংকের বিশ্লেষক রদ্রিগো ক্যাট্রিলের মতে, ডেটা সেন্টার, চিপ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণে যে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে, ভবিষ্যতের আয় দিয়ে সেই বিনিয়োগের ব্যয় ও অর্থায়নের দায় মেটানো সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন বাড়ছে।

এআই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন কাঠামো নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এর একটি উদাহরণ হলো নিওক্লাউড প্রতিষ্ঠান কোরউইভ। বিপুল ঋণের বোঝা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগকারীদের নজরে রয়েছে। চলতি মাসে এর শেয়ারের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি বন্ডের ইল্ড বা মুনাফার হার বেড়েছে, যা ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ আর্থিক অবস্থান নিয়ে বাজারের সংশয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং কোরউইভের আর্থিক অবস্থা নিয়ে আশ্বস্ত করার মতো মন্তব্য করলে শুক্রবার এশিয়ার বাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। কিন্তু নতুন সপ্তাহের শুরুতে সেই আশাবাদ স্থায়ী হয়নি।

প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠান টেসলা ও মেটা চলতি সপ্তাহে আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করবে। এসব প্রতিষ্ঠানের আয়, ব্যয় এবং এআই খাতে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের পরিকল্পনা বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে এআই অবকাঠামোয় বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে আয় বৃদ্ধির বাস্তব চিত্র কতটা স্পষ্ট হচ্ছে, তা বাজারের পরবর্তী গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের দিকেও তাকিয়ে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি মার্কিন মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের পর সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে জল্পনা বেড়েছে। সুদের হার বৃদ্ধি পেলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ ও সম্প্রসারণে ঋণের ওপর নির্ভর করে। সুদের হার বাড়লে ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি পায়, পাশাপাশি ভবিষ্যতে অর্জিত মুনাফার বর্তমান মূল্য কমে যাওয়ায় উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশায় মূল্যায়িত প্রযুক্তি শেয়ারগুলোর আকর্ষণও কমতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুরু হওয়া বিক্রির চাপ সোমবার এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। টোকিওর বাজারে সফটব্যাংক, অ্যাডভানটেস্ট ও টোকিও ইলেকট্রনের শেয়ারের দরপতন সূচককে নিচে নামায়। দক্ষিণ কোরিয়ায় চিপ নির্মাতা এসকে হাইনিক্স ও স্যামসাংয়ের শেয়ারের দর কমেছে। তাইপে, সাংহাই, সিডনি, সিঙ্গাপুর ও ওয়েলিংটনের শেয়ারবাজারেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ছুটির কারণে হংকংয়ের বাজার বন্ধ ছিল।

অন্যদিকে, চীনের অর্থনীতি নিয়ে প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ সম্প্রসারিত হয়েছে। এএফপির পরিচালিত জরিপে বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার সামান্য বেশি হলেও তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। এতে বোঝা যায়, বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের মনোযোগের বড় অংশ এআই খাতে বিনিয়োগের সম্ভাব্য মুনাফা, যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে কেন্দ্রীভূত রয়েছে।

শেয়ারবাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পণ্য ও মুদ্রাবাজারেও অস্থিরতা দেখা গেছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমেছে। তবে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক তেলের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার পর দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। সেই বৃদ্ধির পরও সোমবার প্রধান দুটি অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্কের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে রেখেছে। হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে অনিশ্চয়তা থাকলেও অঞ্চলটি থেকে তেল সরবরাহ অব্যাহত থাকার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুতিদের হামলা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অপরিশোধিত তেল স্থাপনাগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। ফলে তেলের দামে সাম্প্রতিক পতন ঘটলেও সরবরাহ পরিস্থিতি ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।

মুদ্রাবাজারে ফ্রান্সের অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ইউরোর দর কমেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভের মধ্যে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বিক্ষোভে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতার কঠোর সমালোচনা করেছেন। অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সমন্বয় ইউরোপীয় মুদ্রাবাজারেও প্রভাব ফেলছে।

সামগ্রিকভাবে, এআই খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ এখন ব্যয়, ঋণ ও মুনাফার বাস্তব হিসাবের মুখোমুখি। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বৃদ্ধির গতি যদি বিপুল বিনিয়োগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে শেয়ারগুলোর উচ্চ মূল্যায়ন নিয়ে আরও সংশয় তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হলে প্রযুক্তি খাতের অস্থিরতা আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফল এবং ফেডারেল রিজার্ভের সিদ্ধান্ত বিশ্ব শেয়ারবাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সর্বজনীন পেনশনে সর্বোচ্চ মুনাফা ১১.৭২%

০

অর্থজগত প্রতিবেদন

সর্বজনীন পেনশন স্কিমের গ্রাহকদের ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বিনিয়োগ মুনাফা তাঁদের নিজ নিজ পেনশন হিসাবে যোগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। এ অর্থবছরে স্কিমগুলোর বিনিয়োগ থেকে ২৮ কোটি ৯৬ লাখ ৫৫ হাজার ৪৮ টাকা ৮০ পয়সা মুনাফা অর্জিত হয়েছে। স্কিমভেদে মুনাফার হার দাঁড়িয়েছে সর্বনিম্ন ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ সভায় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে অর্জিত মুনাফা গ্রাহকদের মধ্যে বণ্টনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, প্রত্যেক গ্রাহকের জমার পরিমাণ এবং অর্থ জমা রাখার সময়কাল বিবেচনায় নিয়ে মুনাফা হিসাব করা হয়েছে। অর্জিত মুনাফা গ্রাহকদের নিজ নিজ পেনশন হিসাব বা করপাস হিসাবে যোগ করার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান বলেন, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করা এবং গ্রাহকদের জমাকৃত অর্থের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও যৌক্তিক মুনাফা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ নিষ্ঠা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করছে। মুনাফা বণ্টনের ফলে গ্রাহকেরা সরাসরি উপকৃত হবেন এবং এ ব্যবস্থার কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের নিজ নিজ পেনশন হিসাবে অর্জিত মুনাফার হিসাব ইতোমধ্যে যোগ করা হয়েছে। এর ফলে গ্রাহকেরা তাঁদের জমাকৃত অর্থের বিপরীতে অর্জিত মুনাফার সুফল পাবেন।

রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত, কমল তেলের দাম

০

অর্থজগত ডেস্ক
রাশিয়ার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা থেকে আপাতত সরে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। রাশিয়ার জ্বালানি রফতানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা কমে আসায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রশমিত হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে তেলের বাজারে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) এশিয়ার বাজারে লেনদেনের শুরুতে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ দশমিক ৮০ ডলারে নেমে আসে। এর আগে রাশিয়ার ওপর সম্ভাব্য নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। গত শুক্রবারের লেনদেন শেষে অপরিশোধিত তেলের দাম গত ১৯ মে’র পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
শুক্রবার একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের মাধ্যমে রাশিয়াসংশ্লিষ্ট কয়েকটি নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পরিকল্পনা স্থগিত করেন ট্রাম্প। নির্ধারিত সময়সীমার আগেই নেওয়া এ সিদ্ধান্তের ফলে রাশিয়ার রফতানি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ এবং দেশটির জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য শাস্তিমূলক পদক্ষেপ আপাতত কার্যকর হচ্ছে না।
এর আগে রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে লক্ষ্য করে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছিল। বাজারসংশ্লিষ্টদের ধারণা ছিল, নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর হলে বিশ্ববাজারে রাশিয়ার তেল সরবরাহ কমে যেতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি তেলের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতো।
রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদক ও রফতানিকারক দেশ। ফলে দেশটির তেল ও গ্যাস খাতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্য, সরবরাহব্যবস্থা এবং বাজারদরে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে প্রকৃত ঘাটতি দেখা দেওয়ার আগেই ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে লেনদেন করেন। সাম্প্রতিক সময়ে তেলের দাম বাড়ার পেছনেও এ ধরনের ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ ভূমিকা রেখেছে।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে আপাতত সেই উদ্বেগ কিছুটা কমেছে। নিষেধাজ্ঞা স্থগিত থাকায় রাশিয়ার জ্বালানি রফতানি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা বেড়েছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। এর ফলে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা কমে তেলের দামে নিম্নমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্তই যে দীর্ঘমেয়াদে তেলের দাম কমিয়ে রাখবে, তা নিশ্চিত নয়। রাশিয়ার জ্বালানি রফতানির বাস্তব পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানির চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের ওপর বাজারের পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে। নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হলে কিংবা অন্য কোনো কারণে সরবরাহ ব্যাহত হলে তেলের দাম আবারও বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের এ পরিবর্তন আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দাম কমার প্রবণতা স্থায়ী হলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সাময়িক দরপতনের সুফল পেতে হলে আন্তর্জাতিক বাজারে নিম্নমুখী প্রবণতা কত দিন স্থায়ী হয়, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।