সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
Home Blog

সোনালী ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার অংশগ্রহণে সাইবার নিরাপত্তা সুশাসন কর্মশালা অনুষ্ঠিত

০

সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা এবং ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর সুরক্ষা জোরদারে সোনালী ব্যাংক পিএলসির শীর্ষ ব্যবস্থাপনার অংশগ্রহণে দিনব্যাপী সাইবার নিরাপত্তা সুশাসন কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শনিবার ‘টপ ম্যানেজমেন্ট অ্যাওয়ারনেস ওয়ার্কশপ অন সাইবার সিকিউরিটি গভর্ন্যান্স’ শীর্ষক কর্মশালায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শওকত আলী খান, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক এবং তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন।

দেশের সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিষ্ঠান সাইবারফক্স ট্রেইন কর্মশালাটি পরিচালনা ও বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে।

কর্মশালায় সাইবার নিরাপত্তা কৌশল ও নীতিমালা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, তথ্য ও ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা, সাইবার আক্রমণ মোকাবিলায় প্রস্তুতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা ও পরিপালন বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

ব্যাংকের সামগ্রিক সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতে শীর্ষ ব্যবস্থাপনার কৌশলগত ভূমিকার ওপরও জোর দেওয়া হয়।

সোনালী ব্যাংক পিএলসি জানিয়েছে, দেশের ব্যাংকিং খাতে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবা নিশ্চিতে সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো সুরক্ষায় এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

মাতারবাড়ীতে ৭০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে অব্যবহৃত জমিতে ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ করা অব্যবহৃত জমির একাংশে এ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এতে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। প্রায় ৬০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) ইতোমধ্যে বিবেচনার জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল)। কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রস্তাবটি পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়া এগোবে।

সিপিজিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নজমুল হক রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে জানান, মাতারবাড়ীর ২×৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন আল্ট্রা সুপারক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমানার মধ্যে থাকা ১৭১ একর অব্যবহৃত জমিতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করা হবে।

প্রকল্পের খসড়া ডিপিপি অনুযায়ী, এর মোট ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৬০৪ কোটি ৯৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থেকে ৪২ কোটি ৮৭ লাখ ৬ হাজার টাকা, প্রকল্প ঋণ হিসেবে ৫৩২ কোটি ৩৯ লাখ ১২ হাজার টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ২৯ কোটি ৭১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা জোগান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি) বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সুবিধা কাঠামোর আওতায় প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করবে। এ অর্থায়ন কাঠামোয় ৩৫ কোটি ইউরো ঋণ এবং ৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরো অনুদান সহায়তা রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধি, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে।

প্রকল্পটির অন্যতম বিশেষ দিক হলো বিদ্যমান অবকাঠামো ও অব্যবহৃত জমির ব্যবহার। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময় ছাই সংরক্ষণের জন্য প্রায় ৬৩০ একর জমি বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র ১০৫ একর জমিতে ছাইয়ের পুকুর নির্মাণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৫২৫ একর জমি এখনো অব্যবহৃত রয়েছে। প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য এ জমির একটি অংশ ব্যবহার করা হবে।

এ ছাড়া বিদ্যমান ছাইয়ের পুকুরের চারপাশে প্রায় ১৪ মিটার উঁচু সুরক্ষা বাঁধ থাকায় নতুন করে বাঁধ নির্মাণের প্রয়োজন হবে না। ফলে জমি অধিগ্রহণ ও কিছু অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় এড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় সৌর ফটোভোলটাইক (পিভি) মডিউল, ইনভার্টার এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সরঞ্জাম স্থাপন করা হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে নিকটবর্তী মাতারবাড়ী ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র পর্যন্ত এক কিলোমিটার দীর্ঘ ১৩২ কেভি ওভারহেড সঞ্চালন লাইন নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে।

পাশাপাশি মাতারবাড়ী ও চকরিয়া ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রের মধ্যে ১৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বিতীয় সার্কিটের ওভারহেড কন্ডাক্টর স্থাপন করা হবে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে মাতারবাড়ীতে তিনটি এবং চকরিয়ায় একটি—মোট চারটি ১৩২ কেভি এয়ার ইনসুলেটেড সুইচগিয়ার (এআইএস) বে নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাছাকাছি অবস্থান প্রকল্প বাস্তবায়নে বাড়তি সুবিধা দেবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ। এতে বিদেশ থেকে আমদানি করা সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি দ্রুত খালাস ও প্রকল্প এলাকায় পরিবহন করা সম্ভব হবে।

উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সম্পন্ন সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রথমে ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছিল। পরবর্তী মূল্যায়নে প্রকল্পটির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে ৭০ মেগাওয়াট করার সুপারিশ করা হয়।

পরিকল্পনা কমিশনের বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম প্রধান মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম বাসসকে জানান, প্রকল্পের খসড়া প্রস্তাব নিয়ে শিগগিরই পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, প্রকল্পটি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে।

তবে প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে কয়েকটি বিষয়ে ব্যাখ্যা ও সংশোধন চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এর মধ্যে রয়েছে একই ধরনের চলমান ও সম্পন্ন প্রকল্পের সঙ্গে তুলনা করে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান সরঞ্জামের প্রস্তাবিত ব্যয় যাচাই, অর্থায়ন কাঠামোর বিষয়ে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণ বাড়ানো।

কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রকল্পটি আর্থিকভাবে বাস্তবসম্মত মনে হলেও মোট ব্যয়ের মাত্র ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ নিজস্ব অর্থায়নের প্রস্তাব করেছে সিপিজিসিবিএল। এ পরিমাণ প্রায় ২৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। প্রকল্পে সংস্থাটির আর্থিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টি পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সৌর পিভি মডিউল ও ইনভার্টারের গুণগত মান এবং বাজারদর যাচাই করা হবে। যানবাহন, অফিস সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র কেনার জন্য প্রস্তাবিত ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকার বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিশন। মোটরসাইকেলের সংখ্যা ‘লট’ হিসেবে উল্লেখ না করে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে।

দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বর্তমান অবস্থার বিস্তারিত তথ্যও চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। সরকারি-বেসরকারি খাতের মোট উৎপাদন সক্ষমতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা এবং বিদ্যমান সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা সংস্থা ও অবস্থানভিত্তিকভাবে তুলে ধরতে বলা হয়েছে।

দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটির গুরুত্ব রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বর্তমানে ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ দেশে মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎসের সক্ষমতা ১ হাজার ৯৩৪ দশমিক ৫৪ মেগাওয়াট, যা মোট উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সাত নম্বর লক্ষ্য—সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি নিশ্চিত করার সঙ্গেও প্রকল্পটি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিদেশি অর্থায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নতুন ও অননুমোদিত প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণ নিষ্পত্তি ও প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে প্রকল্পটির অনুমোদন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। এতে মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অব্যবহৃত জমি কাজে লাগিয়ে জাতীয় গ্রিডে নতুন করে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

স্টার্টআপ স্যান্ডবক্স নিবন্ধনে ৬০ দিনের সময়সীমা এনবিআরের

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
স্টার্টআপ কোম্পানির কর অব্যাহতি ও প্রণোদনা সুবিধা নিশ্চিত করতে ‘স্টার্টআপ স্যান্ডবক্স’ নিবন্ধন ও কর পরিপালনের বিষয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন নির্দেশনায় নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি আবেদন নিষ্পত্তিতে ৬০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এনবিআর কোনো সিদ্ধান্ত না জানালে সংশ্লিষ্ট আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত বলে গণ্য হবে।

এনবিআর চেয়ারম্যানের সই করা গত ২৮ অক্টোবরের নির্দেশনায় স্টার্টআপ স্যান্ডবক্সের আওতায় নিবন্ধন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা, কর পরিপালন এবং নিবন্ধন বাতিলের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, স্যান্ডবক্সের আওতায় কর অব্যাহতি ও প্রণোদনা সুবিধা পেতে হলে সংশ্লিষ্ট স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানকে এনবিআরে নিবন্ধিত হতে হবে।

নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে এনবিআরের সদস্য (কর আপিল ও অব্যাহতি) বরাবর আবেদন করতে হবে। আবেদনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় আইনগত ও কার্যক্রম-সংক্রান্ত নথিপত্র জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি) থেকে ইস্যু করা ইনকরপোরেশন সার্টিফিকেট ও সংঘস্মারক (এমওএ)। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বিস্তারিত বিবরণও দিতে হবে।

নির্দেশনায় স্টার্টআপের আর্থিক ও হিসাব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং (ইআরপি), অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার, মূল ডিজিটাল সিস্টেম অথবা হিসাবের খতিয়ানে আয়কর কর্তৃপক্ষকে পাঠযোগ্য বা ‘রিড অনলি’ প্রবেশাধিকার দেওয়ার সম্মতিপত্র জমা দিতে হবে। অর্থাৎ, কর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির ডিজিটাল হিসাব ও আর্থিক তথ্য পরিদর্শনের সুযোগ পাবে, তবে সেখানে পরিবর্তন করার সুযোগ থাকবে না।

আবেদন পাওয়ার পর ৬০ দিনের মধ্যে এনবিআর প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে ‘স্টার্টআপ স্যান্ডবক্স নিবন্ধন সনদ’ ইস্যু করবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো সিদ্ধান্ত না এলে আবেদনটি অনুমোদিত হয়েছে বলে বিবেচিত হবে। ফলে নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কমানোর পাশাপাশি আবেদনকারীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার নিশ্চয়তা তৈরি করা হয়েছে।

তবে নিবন্ধন পাওয়ার পর শর্ত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো স্টার্টআপ আবেদনে ভুল বা অসত্য তথ্য দিয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেলে কিংবা আয়কর কর্তৃপক্ষকে প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল হিসাব ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার দিতে বাধা সৃষ্টি করলে এনবিআর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে পারবে।

এ ধরনের নোটিশের জবাব দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানকে ৬০ দিন সময় দিতে হবে। জবাব পর্যালোচনার পর সংশ্লিষ্ট স্টার্টআপের প্রতিনিধিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে শুনানি করতে হবে। এরপর লিখিত আদেশের মাধ্যমে নিবন্ধন বাতিল করা যাবে।

এ ছাড়া উপযুক্ত কারণ থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে যুক্তিসংগত শুনানির সুযোগ দিয়েও নিবন্ধন বাতিলের ক্ষমতা এনবিআরের হাতে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, নিবন্ধন বাতিলের ক্ষেত্রে কারণ দর্শানো এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

নতুন নির্দেশনায় একদিকে স্টার্টআপের কর সুবিধা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, অন্যদিকে ডিজিটাল হিসাব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করার শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কর সুবিধা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকির পাশাপাশি নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার কাঠামো নির্ধারণ করেছে এনবিআর।

ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষে ব্যাংক খাত

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
বিদায়ী সপ্তাহে (২৫-২৯ অক্টোবর) দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) খাতভিত্তিক লেনদেনে শীর্ষস্থান দখল করেছে ব্যাংকিং খাত। পাঁচ কার্যদিবসে এ খাতের ৩৬টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ১৪ কোটি ১৩ লাখ টাকার, যা ডিএসইর মোট লেনদেনের ২২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। আগের সপ্তাহের তুলনায় ব্যাংকিং খাতে লেনদেন বেড়েছে ৭৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। ফলে সাপ্তাহিক লেনদেনে অন্য সব খাতকে ছাড়িয়ে গেছে ব্যাংকিং খাত।

ডিএসইর সাপ্তাহিক বাজার পর্যালোচনার তথ্য অনুযায়ী, আগের সপ্তাহে ব্যাংকিং খাতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫৬৬ কোটি ৬ লাখ টাকা। বিদায়ী সপ্তাহে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৪ কোটি ১৩ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে এ খাতে লেনদেন বেড়েছে ৪৪৮ কোটি ৭ লাখ টাকা। মোট বাজার লেনদেনে ২২ দশমিক ৫৬ শতাংশ অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ব্যাংকিং খাত সপ্তাহের সর্বাধিক লেনদেন হওয়া খাতে পরিণত হয়েছে।

লেনদেনের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের শেয়ারদরেও দেখা গেছে মিশ্র প্রবণতা। ডিএসইতে তালিকাভুক্ত এ খাতের ৩৬টি কোম্পানির মধ্যে বিদায়ী সপ্তাহে ১৫টির শেয়ারদর বেড়েছে। দর কমেছে ১৩টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৮টির। অর্থাৎ খাতটির ৪১ দশমিক ৬৭ শতাংশ কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে, ৩৬ দশমিক ১১ শতাংশের কমেছে এবং ২২ দশমিক ২২ শতাংশের দর অপরিবর্তিত রয়েছে।

এই পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ব্যাংকিং খাতে লেনদেনের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ঘটলেও তা সব কোম্পানির শেয়ারদরে সমানভাবে প্রতিফলিত হয়নি। বরং দর বৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানির তুলনায় দর কমা কোম্পানির সংখ্যাও কাছাকাছি ছিল। ফলে লেনদেনের আধিপত্য এবং শেয়ারদরের সামগ্রিক ইতিবাচক প্রবণতাকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।

বিদায়ী সপ্তাহের বাজারচিত্রে ব্যাংকিং খাতের প্রাধান্য একটি উল্লেখযোগ্য দিক। মোট লেনদেনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এ খাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় ডিএসইর সামগ্রিক লেনদেনের গতিপ্রকৃতিতে খাতটির প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। তবে লেনদেন বৃদ্ধির পাশাপাশি শেয়ারদরের ধারাবাহিকতা, কোম্পানিভিত্তিক দর পরিবর্তন এবং অন্যান্য খাতের অংশগ্রহণও বাজারের সামগ্রিক অবস্থা মূল্যায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাংকিং খাতে এই উচ্চ লেনদেনের প্রবণতা পরবর্তী সপ্তাহগুলোতেও বজায় থাকে কি না, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়। একই সঙ্গে অন্যান্য খাতের লেনদেন ও শেয়ারদরের পরিবর্তনও বাজারের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।

মিউচুয়াল ফান্ডে আস্থা ফেরাতে বিএসইসির আশ্বাস

০

অর্থজগত প্রতিবেদন

শেয়ারবাজারে মিউচুয়াল ফান্ড খাত ঘিরে সাম্প্রতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা কাটাতে ইতিবাচক অবস্থান জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা পর্যালোচনা ও সংশোধনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মাসুদ খান। আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুসরণ এবং বাজার সংশ্লিষ্টদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে এ খাতের উন্নয়নে কাজ করার ঘোষণায় নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।

সম্প্রতি বিএসইসির একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট দর ও নিট সম্পদ মূল্যে (এনএভি) ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে অধিকাংশ ফান্ডের দরেই উল্লেখযোগ্য পতন দেখা যায়। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরবর্তী ইতিবাচক অবস্থান এবং অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর গত সপ্তাহে অনেক ফান্ডই সেই ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্পষ্ট বার্তা এ খাতের বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সাধারণত মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের বাজারদর নির্ধারণে ফান্ডের সম্পদ মূল্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফান্ডের বিনিয়োগ, আয়, নগদ প্রবাহ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর এর মূল্যায়ন নির্ভর করে। তবে বাস্তবে শেয়ারের মতো মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট দরও সব সময় নিট সম্পদ মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ওঠানামা করে না। ফান্ডের মূলধন, বিনিয়োগ কৌশল, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও সুনাম এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও ইউনিটের বাজারদরে প্রভাব ফেলে।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে মিউচুয়াল ফান্ডের অবমূল্যায়নের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির শেয়ার প্রকৃত সম্পদ মূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দরে লেনদেন হচ্ছে। এমনকি ঋণাত্মক সম্পদ মূল্য থাকা সত্ত্বেও কিছু দুর্বল কোম্পানির শেয়ার উচ্চ দরে কেনাবেচা হতে দেখা যাচ্ছে। বিপরীতে, অধিকাংশ মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট তাদের প্রকৃত নিট সম্পদ মূল্যের তুলনায় অনেক কম দরে লেনদেন হচ্ছে। হাতেগোনা কয়েকটি ফান্ডের ইউনিট এনএভির সামান্য ওপরে থাকলেও সিংহভাগ ফান্ডই উল্লেখযোগ্য অবমূল্যায়নের শিকার।

অথচ অতীতে দেশের শেয়ারবাজারে এমন সময়ও গেছে, যখন মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট তাদের নিট সম্পদ মূল্যের পাঁচ থেকে সাত গুণ বেশি দরে লেনদেন হয়েছে। সেই বিবেচনায় বর্তমান পরিস্থিতিকে এ খাতের সম্ভাবনার তুলনায় বড় ধরনের মূল্যায়ন ঘাটতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, মৌলিক সূচক ও সম্পদ মূল্যের ভিত্তিতে বিচার করলে অনেক মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট বিনিয়োগের আকর্ষণীয় পর্যায়ে রয়েছে। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে ফান্ড ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

এদিকে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের নিয়ন্ত্রক কাঠামো আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০২৫’ পর্যালোচনা সংক্রান্ত মতবিনিময় সভা। এতে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, বিধিমালা পর্যালোচনা ও সংশোধনের ক্ষেত্রে বাজার অংশীজনদের মতামত কমিশনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা বিবেচনায় নিয়ে এ খাতের জন্য কার্যকর ও বাস্তবসম্মত নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা হবে।

তিনি বলেন, দেশের শেয়ারবাজারকে আরও গতিশীল, টেকসই ও বিনিয়োগবান্ধব করতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। শুধু ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভর করে শেয়ারবাজারের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে মিউচুয়াল ফান্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান আরও বলেন, মিউচুয়াল ফান্ড খাতের উন্নয়ন ছাড়া শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বিকাশ সম্ভব নয়। তাই বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এ খাতের উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

মতবিনিময় সভায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল), মিউচুয়াল ফান্ডের ট্রাস্টি, কাস্টোডিয়ান এবং সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভায় বিদ্যমান বিধিমালার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক কাঠামো আরও কার্যকর করার বিষয়ে প্রস্তাব ও মতামত তুলে ধরা হয়।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মিউচুয়াল ফান্ড কেবল বিনিয়োগের একটি মাধ্যম নয়, বরং শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি পেশাদার সম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে। ফলে এ খাতের দুর্বলতা পুরো শেয়ারবাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তাদের মতে, মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট দর ও প্রকৃত সম্পদ মূল্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের ব্যবধান কমাতে হলে শুধু বিধিমালা সংশোধন যথেষ্ট নয়; সম্পদ ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়ন, নিয়মিত তথ্য প্রকাশ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর নজরদারিও প্রয়োজন। পাশাপাশি ফান্ডগুলোর বিনিয়োগ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও পেশাদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

সব মিলিয়ে, বিএসইসির সাম্প্রতিক আশ্বাস মিউচুয়াল ফান্ড খাতের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে বাস্তবসম্মত বিধিমালা প্রণয়ন এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে এ খাতে নতুন করে আস্থা তৈরি হতে পারে। এতে শুধু মিউচুয়াল ফান্ডের বাজারই নয়, সামগ্রিক শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের পরিধি বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথও সুগম হতে পারে।

জাপানের সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন দিগন্ত

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের জাপান সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগিতায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ এক লাখ কোটি ইয়েন বা প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও শিল্পায়নে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের জাপান সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে উন্নয়ন সহযোগিতা অব্যাহত রাখা এবং তা সম্প্রসারণের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে টোকিও। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের অর্জন ও ফলাফল তুলে ধরে তিনি এসব কথা বলেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক এখন প্রচলিত উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ অংশীদারিত্বের দিকে এগোচ্ছে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক সম্মান এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে গুরুত্ব দেওয়া। বাংলাদেশ এখন শুধু সহজ শর্তের ঋণ বা উন্নয়ন সহায়তার ওপর নির্ভর না করে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, কর্মসংস্থান ও অভিন্ন অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে প্রকৃত পারস্পরিক বিনিয়োগ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে। এক্ষেত্রে কোনো দেশকে অধস্তন বা নির্ভরশীল অবস্থানে রাখার সুযোগ নেই। জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও বিনিয়োগের সুফল বিবেচনা করেই সব প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হবে।

পাঁচ বছরে ৬৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগের সম্ভাবনা

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক লাখ কোটি ইয়েন বা প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন হুমায়ুন কবির। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এ সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন।

প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রস্তাবিত বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এটি জাপান সরকারের কোনো ঋণ বা সরকারি অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি নয়; বরং জাপানের বেসরকারি খাতের সম্ভাব্য বিনিয়োগ পরিকল্পনা।

বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, পারস্পরিক আলোচনা ও মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ পরামর্শের পর শিগগিরই জাপানের একটি অর্থনৈতিক প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরের প্রত্যাশা রয়েছে। জাতীয় অগ্রাধিকার, বিনিয়োগের সাশ্রয়যোগ্যতা, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবগুলো যাচাই করা হবে। সরকার এমন বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেবে, যার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি প্রকৃত সুফল পাবে।

বিআইজি-বি উদ্যোগে নতুন মাত্রা

বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণে দীর্ঘদিনের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা বিআইজি-বি উদ্যোগকে নতুনভাবে সাজানোর বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছে। এর নতুন নাম দেওয়া হয়েছে ‘বিআইজি-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ বা অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিআইজি-বি।

এই উদ্যোগের আওতায় জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প অবকাঠামো, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং যোগাযোগব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বাড়িয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

হুমায়ুন কবির বলেন, এ উদ্যোগ নিয়ে এবারের সফরে আলোচনা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তৃতীয় কোনো দেশকে যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়নি। তবে ভবিষ্যতে আঞ্চলিক পর্যায়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অংশগ্রহণ প্রয়োজন হবে। আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সহযোগিতার প্রতিটি ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।

বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সহযোগিতা অব্যাহত

বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে জাপান। সফরকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতি, ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণ ও পরিচালনায় জাপানের সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

এ ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো ও জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে জাপানের ৫ হাজার কোটি ইয়েন বা প্রায় ৩১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের জরুরি সহায়তা ঋণের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা—জাইকার প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকার সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জাপানের অর্থায়নে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে সহজ শর্তে অর্থায়ন অব্যাহত রাখা এবং কারিগরি সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

ভবিষ্যৎ ঋণ ও অর্থায়নের শর্ত প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎসের অর্থায়ন বিকল্প তুলনা করে সিদ্ধান্ত নিতে চায়। ঋণের ব্যয়, সাশ্রয়যোগ্যতা ও অর্থনৈতিক সুফল বিবেচনা করেই ভবিষ্যৎ অর্থায়ন কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।

শিল্পায়ন ও দক্ষ মানবসম্পদে জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর উদ্যোগ

প্রধানমন্ত্রীর সফরে বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এ লক্ষ্যে জাপানের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ফাস্ট রিটেইলিং, মারুবেনি করপোরেশন, মিতসুবিশি করপোরেশন ও টয়োটা সুশো করপোরেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।

বৈঠকগুলোতে তৈরি পোশাকশিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদনশিল্প ও অবকাঠামো খাতে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা এবং রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামের সংলাপেও অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে জাপানি ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে করব্যবস্থা, শুল্ক প্রক্রিয়া, রেমিট্যান্স ও লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

জ্বালানি ও উৎপাদন খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা

জ্বালানি অবকাঠামো ও উৎপাদনশিল্পের আধুনিকায়নেও জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপানের ফুৎসুতে জেরা (জেইআরএ)-এর এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং চিবা প্রিফেকচারের একটি লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেন।

প্রতিমন্ত্রী জানান, এসব স্থাপনা পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনায় বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কারিগরি জ্ঞান কাজে লাগানো। জাপান থেকে এলএনজি আমদানির বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।

এ ছাড়া ২৯ অক্টোবর নাগোয়া শহরে টয়োটার উৎপাদন কারখানা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বাংলাদেশে গাড়ি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি উৎপাদনের কারখানা স্থাপনে আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের উৎপাদনশিল্পে নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ছয়টি সহযোগিতা দলিল সই

সফরকালে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, ব্যবসায়িক পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, উপকূলীয় নিরাপত্তা, জলবায়ু সহযোগিতা এবং তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছয়টি সহযোগিতা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

এ ছাড়া বিনিয়োগ সহায়তা ও স্থানীয় সরকার উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যবস্থাপনাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। দুই দেশ টেকসই নগরায়ণ, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধিতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে।

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানেও জাপানের সক্রিয় ভূমিকা ও সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, নৌ ও আকাশপথে চলাচলের স্বাধীনতা, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে মতবিনিময় হয়েছে।

সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরকে কেবল দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও শিল্পায়নকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন ভিত্তি তৈরির উদ্যোগ হিসেবে দেখছে সরকার। তবে সম্ভাব্য বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়া এবং সেগুলোর সুফল দেশের অর্থনীতিতে নিশ্চিত করাই হবে এই সফরের অর্জন মূল্যায়নের মূল বিষয়।

দুই ব্যাংকের লোকসান ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়াল

০

অর্থজগত প্রতিবেদন

দেশের বেসরকারি খাতের প্রথম প্রজন্মের দুই ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও ন্যাশনাল ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অবনতি আরও গভীর হয়েছে। বিপুল পরিমাণ খেলাপি বিনিয়োগ ও ঋণ, আয় কমে যাওয়া এবং আমানতের বিপরীতে ব্যয় বৃদ্ধির চাপে চলতি ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে ব্যাংক দুটি সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক দুটির আর্থিক পরিস্থিতিতে এমন বড় অবনতি ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জকে নতুন করে সামনে এনেছে।

প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের সমন্বিত লোকসান হয়েছে ৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। একই সময়ে ন্যাশনাল ব্যাংক লোকসান করেছে ৩ হাজার ১৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ ব্যাংক দুটি শুধু মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হয়নি, বরং তাদের লোকসানের পরিমাণও কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

গত বৃহস্পতিবার ব্যাংক দুটির পরিচালনা পর্ষদের সভায় তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল অনুমোদন করা হয়। পরবর্তী সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী নয় মাসের আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করা হলেও পূর্ণাঙ্গ প্রান্তিক প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি।

ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক ফলাফলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে ব্যাংকটি সমন্বিতভাবে প্রায় ১০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। কিন্তু চলতি বছরের একই সময়ে এসে প্রতিষ্ঠানটি বড় অঙ্কের লোকসানে পড়েছে। বিশেষ করে জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে একাই লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৯৭০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। সহযোগী প্রতিষ্ঠানের আয় বাদ দিয়ে এককভাবে হিসাব করলে নয় মাসে ব্যাংকটির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩০২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।

ব্যাংকটির ব্যাখ্যায় উঠে এসেছে, বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যাওয়া এবং আমানতের বিপরীতে মুনাফা পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়াই এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ। অতীতে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কিছু ঋণ ও বিনিয়োগ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ফলে এসব বিনিয়োগের বিপরীতে অর্জিত অর্থ আয় হিসেবে দেখানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, মেয়াদ শেষে মোট আমানতের পরিমাণ কমলেও আমানতের বিপরীতে মুনাফা ব্যয় বেড়েছে। এতে ব্যাংকটির আয়-ব্যয়ের ব্যবধান আরও প্রকট হয়েছে।

শুধু মুনাফার হিসাবেই নয়, ব্যাংকটির নগদ প্রবাহেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ৩৬ টাকা ৫৪ পয়সায় নেমে এসেছে। ব্যাংকটির ভাষ্য অনুযায়ী, তৃতীয় প্রান্তিকে অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় নগদ প্রবাহে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মূলধন শক্তিশালী করা, সম্পদের গুণগত মান উন্নয়ন, বিনিয়োগ আদায় বাড়ানো এবং নতুন আমানত সংগ্রহে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্যাংকটি।

অন্যদিকে, ন্যাশনাল ব্যাংকের আর্থিক সংকটও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ব্যাংকটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের ১ হাজার ৪৪৮ কোটি ৪২ লাখ টাকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকটির লোকসান ছিল ২ হাজার ২৮৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ফলে তৃতীয় প্রান্তিকে মাত্র তিন মাসে নতুন করে আরও ৭৩৩ কোটি ৪ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।

ন্যাশনাল ব্যাংকের মতে, খেলাপি হয়ে পড়া কিছু ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে অর্জিত সুদ আয় হিসেবে দেখানো সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি আমানত ও অন্যান্য উৎস থেকে নেওয়া অর্থের বিপরীতে সুদ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। তবে গ্রাহকদের আস্থা কিছুটা ফিরে আসায় আগের বছরের তুলনায় আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা কমেছে বলে জানিয়েছে ব্যাংকটি।

ব্যাংকটির সংকটের গভীরতা বোঝা যায় দীর্ঘমেয়াদি লোকসানের চিত্রে। ২০২২ সাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে বড় অঙ্কের লোকসান করছে ন্যাশনাল ব্যাংক। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার বছর নয় মাসে ব্যাংকটির পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৯১৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চার বছরে লোকসান হয়েছে ৮ হাজার ৮৯৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা।

এদিকে, দীর্ঘদিনের তারল্য সংকট কাটিয়ে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে ফেরার চেষ্টা করছে ন্যাশনাল ব্যাংক। গ্রাহকদের আমানত জমা ও উত্তোলন এবং আমদানি-রফতানি কার্যক্রমের জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্যাংকটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এই অর্থ ব্যবহারে কঠোর শর্ত রয়েছে। বিশেষ করে সাবেক ও বর্তমান পরিচালকদের আমানত ফেরত দেওয়া কিংবা নতুন ঋণ বিতরণে এই তহবিল ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়নি।

সামগ্রিকভাবে ইসলামী ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকের আর্থিক ফলাফল দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, দুর্বল সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জকে স্পষ্ট করেছে। তারল্য সহায়তা কিংবা সাময়িক ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে খেলাপি ঋণ ও বিনিয়োগ আদায়, অনিয়মের দায় নির্ধারণ, মূলধন পুনর্গঠন এবং সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে। অন্যথায় এসব ব্যাংকের আর্থিক সংকট শুধু শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতির কারণ হবে না, আমানতকারী ও সামগ্রিক ব্যাংক খাতের ওপরও দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি করতে পারে।

যুদ্ধের শঙ্কায় ছয় মাসের সর্বোচ্চ দামে তেল

০

অর্থজগত প্রতিবেদন

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার উদ্বেগে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। এক দিনের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে জ্বালানি মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ার পাশাপাশি ইরানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনা তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরান যুদ্ধ আরও তীব্র হতে পারে—এমন আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে সরবরাহ পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে।

সর্বশেষ লেনদেনে ডিসেম্বর মাসে সরবরাহের জন্য ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৭ দশমিক ৬৪ ডলারে উঠেছে। লেনদেনের একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক বাজারের এই প্রধান তেলসূচকের দাম ১১৮ ডলারও ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৪ দশমিক ১২ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুধু সাম্প্রতিক এক দিনের লেনদেনেই সীমাবদ্ধ নয়। গত অক্টোবর মাসজুড়েই জ্বালানি পণ্যের বাজারে উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। মাস শেষে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়েছে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে, একই সময়ে ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়েছে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা দীর্ঘ সময় ধরে তেলের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী চাপ বজায় রাখছে।

বাজারের অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হয়। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা বা নৌযান চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) দাবি, এক দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী সুপারট্যাংকারকে কেন্দ্র করে চারটি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ইরানি কর্তৃপক্ষের নিষিদ্ধ ঘোষিত পথে চলাচলের সময় দুটি ট্যাংকার মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এসব ঘটনার স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ ধরনের দাবি আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি পরিবহনে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে পরিবহন ব্যয়, বিমা প্রিমিয়াম ও সরবরাহ খরচ বেড়ে যাবে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের দামেও পড়তে পারে।

তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি বাণিজ্য ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতের ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে। সংঘাতের বিস্তার এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে তেলের বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এলডিসি উত্তরণ পেছাল তিন বছর, প্রস্তুতির বড় পরীক্ষা এখন

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের এতদিনের বিশেষ সুবিধা একসময় আর থাকবে না—এ বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার আগে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে আরও তিন বছর। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা পিছিয়ে দিয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। ফলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর উত্তরণ ঘটবে বাংলাদেশের। বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা, রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতার মধ্যে এ সিদ্ধান্ত কিছুটা স্বস্তি দিলেও একই সঙ্গে সামনে এনেছে সংস্কার বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, সীমিত রপ্তানি পণ্যের পরিসর, উচ্চ ব্যবসায়িক ব্যয়, দুর্বল আর্থিক খাত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিতে পিছিয়ে থাকার বিষয়গুলো বাংলাদেশের উত্তরণ-প্রস্তুতিকে কঠিন করে তুলেছে। ফলে বাড়তি তিন বছর শুধু সময়ক্ষেপণের সুযোগ নয়; বরং অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা পুনর্গঠনের শেষ গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ২৯ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। বাংলাদেশের পক্ষে উরুগুয়ে প্রস্তাবটি উত্থাপন করে। ব্যতিক্রমী এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে উত্তরণের জন্য অতিরিক্ত তিন বছর সময় পেল দেশটি। একই অধিবেশনে নেপালের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য সময় বাড়ানোর আবেদনটি এসেছে দীর্ঘ পর্যালোচনা ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে। চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তন এবং দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (ইউএন-সিডিপি) কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করে সরকার। পরে কমিটি আবেদনটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার সুপারিশ করে। গত ২১ জুলাই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদও (ইকোসক) বিষয়টি সাধারণ পরিষদে পাঠায়।

বাংলাদেশের এ উদ্যোগের পেছনে মূল উদ্বেগ ছিল উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধার পরিবর্তন। এলডিসি হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জাপানসহ বিভিন্ন বাজারে বাংলাদেশ অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা পেয়ে আসছে। এসব সুবিধা কমে গেলে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর শুল্কের চাপ বাড়তে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান—দুটিই প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ করে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাকশিল্প এ পরিবর্তনের বড় চাপে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প উৎপাদনকারী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকলে বাংলাদেশের বাজার হিস্যা ধরে রাখাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের ২০২৫ সালের এক বিশ্লেষণে বাণিজ্য সুবিধা হারানোর সম্ভাব্য প্রভাবে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি প্রায় ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। যদিও এটি একটি প্রাক্কলন, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ চিত্র নয়; তবু রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ঝুঁকির মাত্রা বোঝাতে যথেষ্ট।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান মনে করেন, বাড়তি সময় রপ্তানি খাতের জন্য ইতিবাচক। দীর্ঘদিন ধরেই প্রস্তুতির স্বার্থে উত্তরণের সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন তাঁরা। তাঁর মতে, এ সময়ের মধ্যে অবকাঠামো ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

তবে ব্যবসায়ীদের স্বস্তির পাশাপাশি অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এ সময়ের ব্যবহার। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ফাহমিদা খাতুনের মতে, উত্তরণের তারিখ পেছালেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মৌলিক দুর্বলতাগুলো দূর হবে না। বাণিজ্য, রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং ও অবকাঠামো খাতে কার্যকর সংস্কার ছাড়া বাড়তি সময়ের সুফল পাওয়া কঠিন। একই সঙ্গে প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর সঙ্গে আগেভাগে আলোচনা এবং নতুন বাজার তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা আবিদ খানও মনে করেন, এ সময়কে বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে লাগানো জরুরি। বিশেষ করে মেধাস্বত্বসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাঁর মতে, বাংলাদেশ এখনো কোনো দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে পারেনি। এ অবস্থায় বিদ্যমান বাণিজ্য কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে উত্তরণের পর নানা ধরনের সুবিধা হারানোর ঝুঁকি থেকেই যাবে।

বাংলাদেশের উত্তরণের ইতিহাস অবশ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতিরই প্রতিফলন। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে এলডিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর কৃষি, শিল্প, তৈরি পোশাক রপ্তানি, প্রবাসী আয় এবং সামাজিক খাতের অগ্রগতির মধ্য দিয়ে দেশটি ধীরে ধীরে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে। ২০১৮ ও ২০২১ সালের পর্যালোচনায় মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচক—তিনটি মানদণ্ডেই প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে বাংলাদেশ। ২০২১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ইউএন-সিডিপি উত্তরণের সুপারিশ করে। একই বছরের ৮ জুন ইকোসক এবং ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ তা অনুমোদন করে।

কোভিড-১৯ মহামারির অর্থনৈতিক অভিঘাত বিবেচনায় বাংলাদেশকে প্রচলিত তিন বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর উত্তরণের তারিখ নির্ধারিত ছিল। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও প্রস্তুতির ঘাটতি বিবেচনায় নতুন সিদ্ধান্তে তা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়া হলো।

উত্তরণ-পরবর্তী ঝুঁকি শুধু তৈরি পোশাক খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের সম্ভাবনাময় ওষুধশিল্পও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারে। এলডিসি হিসেবে আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব বিধিমালার আওতায় বাংলাদেশ কিছু বিশেষ ছাড় পেয়ে থাকে। উত্তরণের পর এসব সুবিধার পরিবর্তন হলে পেটেন্টযুক্ত ওষুধ উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও গবেষণার ব্যয় বাড়তে পারে। ফলে এ শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরির প্রস্তুতি প্রয়োজন।

উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ কিছু বিশেষ অনুদান, সহজ শর্তের ঋণ ও কারিগরি সহায়তা পেয়ে থাকে। উত্তরণের পর এসব সুযোগের কিছু পরিবর্তিত হতে পারে। যদিও উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে সব ধরনের উন্নয়ন সহায়তা বন্ধ হয়ে যাবে না, তবে ভবিষ্যতে অর্থায়নের জন্য নিজস্ব রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী তিন বছরে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রগতি ছাড়া উত্তরণ-পরবর্তী চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে। প্রথমত, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত রাখা বা বিকল্প সুবিধা নিশ্চিত করতে আলোচনা এগিয়ে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, তৈরি পোশাকের বাইরে ওষুধ, চামড়া, পাটজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো খাতের রপ্তানি বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, বন্দর ব্যবস্থাপনা, শুল্ক প্রক্রিয়া, পরিবহন ও জ্বালানি সরবরাহে দক্ষতা বাড়িয়ে উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে।

এর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক সুবিধা কমে গেলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রধান ভিত্তি হবে উৎপাদনশীলতা, পণ্যের গুণগত মান, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরবরাহব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা।

সিপিডির বিশেষ ফেলো ফাহমিদা খাতুনের পরামর্শ, বর্ধিত সময়ের জন্য সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট সংস্কার কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। সেখানে প্রতিটি খাতের লক্ষ্য, বাস্তবায়নের সময়সীমা ও অগ্রগতি পরিমাপের ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রতি ছয় মাস অন্তর সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা ও প্রকাশের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে স্বস্তির পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু এ সুযোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত, সংস্কারের গতি এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের বাস্তব উন্নয়নের ওপর। আগামী তিন বছরে যদি রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বাণিজ্য কূটনীতি ও অর্থনৈতিক সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসে, তাহলে ২০২৯ সালের উত্তরণ অনেক বেশি প্রস্তুত অবস্থায় মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। অন্যথায় সময় বাড়লেও অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা কাটবে না, বরং উত্তরণ-পরবর্তী প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

৩২ কোম্পানির ডিভিডেন্ডে বড় বৈষম্য, শীর্ষে ইউনাইটেড পাওয়ার

০

অর্থজগত প্রতিবেদন

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩২টি কোম্পানির সর্বশেষ আর্থিক ফলাফল ও ডিভিডেন্ড ঘোষণায় বড় ধরনের বৈষম্য দেখা গেছে। এর মধ্যে ২৩টি কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে। বাকি ৯টি কোম্পানি কোনো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেনি। সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। তবে আগের অর্থবছরের তুলনায় কোম্পানিটির ডিভিডেন্ডের হার কমেছে। অন্যদিকে, লোকসানে থাকা চারটি কোম্পানিও নামমাত্র ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মূল্যসংবেদনশীল তথ্য এবং লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্সিয়াল পোর্টালে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনায় এসব চিত্র পাওয়া গেছে। ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত কোম্পানিগুলোর ঘোষণায় মূলত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আর্থিক ফলাফল উঠে এসেছে। তবে জিএসপি ফাইন্যান্সের তথ্য ২০২৫ সালের সমাপ্ত অর্থবছরের, যা অন্য কোম্পানিগুলোর তথ্যের সঙ্গে তুলনার ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

ইউনাইটেড পাওয়ার ৩০ জুন ২০২৬ সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য ৬০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে এর পরিমাণ ৬ টাকা। কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ১৫ টাকা ৯৪ পয়সা। আগের অর্থবছরে ৬৫ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। অর্থাৎ মুনাফার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য থাকলেও এবার শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ডিভিডেন্ডের হার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোম্পানিটি।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ডের সুপারিশ করেছে এমজেএল বাংলাদেশ। এ কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় ১১ টাকা ৪ পয়সা। তমিজউদ্দিন টেক্সটাইল ১৩ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে; কোম্পানিটির ইপিএস ৪ টাকা ২৯ পয়সা। এই তিন প্রতিষ্ঠানের ডিভিডেন্ডের হার তুলনামূলক বেশি হলেও বাকি কোম্পানিগুলোর মধ্যে মুনাফা ও ডিভিডেন্ডের অনুপাত এক নয়।

১০ শতাংশ বা তার বেশি ডিভিডেন্ডের তালিকায় রয়েছে আমান ফিড, সামিট পাওয়ার, আনোয়ার গ্যালভানাইজিং, এডিএন টেলিকম, বিডিকম অনলাইন, আরগন ডেনিমস, আমান কটন ও প্রিমিয়ার সিমেন্ট। এর মধ্যে আমান ফিড ও সামিট পাওয়ার ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ করে এবং অন্য কোম্পানিগুলো ১০ শতাংশ করে ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে। আনোয়ার গ্যালভানাইজিংয়ের ইপিএস ৮ টাকা ২৬ পয়সা হলেও ডিভিডেন্ডের হার ১০ শতাংশ। বিপরীতে আমান ফিডের ইপিএস মাত্র ২৪ পয়সা, অথচ সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোম্পানিটি ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ ডিভিডেন্ডের সুপারিশ করেছে।

অন্যদিকে, কয়েকটি কোম্পানি তুলনামূলক কম হারে ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে। শাশা ডেনিমস ও সোনারগাঁও টেক্সটাইল ৫ শতাংশ করে, ন্যাশনাল পলিমার ও ইফাদ অটোস ৩ শতাংশ করে, ইভিন্স টেক্সটাইল ও জেএমআই হসপিটাল ২ দশমিক ৫০ শতাংশ করে এবং বিডি অটোকারস ২ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ডের সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া আলহাজ্ব টেক্সটাইল ও গোল্ডেন হার্ভেস্ট ১ শতাংশ করে, বিবিএস কেবলস ও ওরিজা অ্যাগ্রো শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ করে এবং ড্রাগণ সোয়েটার শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

তালিকার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, লোকসানে থাকা চারটি কোম্পানিও ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে। আলহাজ্ব টেক্সটাইলের শেয়ারপ্রতি লোকসান ২ টাকা ৮৫ পয়সা, গোল্ডেন হার্ভেস্টের ৫৭ পয়সা, বিবিএস কেবলসের ৫ টাকা ৮ পয়সা এবং ড্রাগণ সোয়েটারের ৪৫ পয়সা। লোকসানের মধ্যেও এসব কোম্পানি নামমাত্র ডিভিডেন্ডের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ মানেই কোম্পানির আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ ক্ষেত্রে নগদ প্রবাহ, সঞ্চিত মুনাফা, ঋণের বোঝা ও পরিচালন আয় বিশ্লেষণ করা জরুরি।

অন্যদিকে, কোনো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেনি আজিজ পাইপস, জিলবাংলা সুগার, শ্যামপুর সুগার, জিএসপি ফাইন্যান্স, উসমানিয়া গ্লাস, বিবিএস, ইনফরমেশন সার্ভিসেস, জাহিন স্পিনিং ও পেনিনসুলা চিটাগাং। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত ইপিএস ঋণাত্মক। এর মধ্যে জিলবাংলা সুগারের শেয়ারপ্রতি লোকসান ৭২ টাকা ৩২ পয়সা এবং শ্যামপুর সুগারের ৪২ টাকা ৯৪ পয়সা। জিএসপি ফাইন্যান্সের লোকসান ৮ টাকা ৮৯ পয়সা, উসমানিয়া গ্লাসের ৪ টাকা ৭৯ পয়সা এবং আজিজ পাইপসের ৩ টাকা ৭৭ পয়সা।

কোম্পানিগুলোর ঘোষণায় আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ডিভিডেন্ড সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য প্রযোজ্য; স্পনসর ও পরিচালকেরা এর বাইরে রয়েছেন। ফলে ঘোষিত ডিভিডেন্ডের হার দেখার পাশাপাশি কারা এর সুবিধা পাবেন, সেটিও বিনিয়োগকারীদের যাচাই করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, ডিভিডেন্ডের এই চিত্রে একদিকে শক্তিশালী মুনাফা করা কোম্পানির উচ্চ ডিভিডেন্ড দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে লোকসান ও দুর্বল আয় থাকা প্রতিষ্ঠানের নামমাত্র ডিভিডেন্ড কিংবা ডিভিডেন্ড না দেওয়ার সিদ্ধান্তও সামনে এসেছে। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু ডিভিডেন্ডের হার নয়, কোম্পানির আয় কতটা টেকসই, নগদ প্রবাহ কেমন, ঋণের পরিমাণ কত এবং বাজারদরের তুলনায় ডিভিডেন্ড থেকে প্রকৃত রিটার্ন কত—এসব বিষয় একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।