অর্থজগত প্রতিবেদন
পবিত্র রমজান সামনে রেখে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণ দেখিয়ে ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে খেজুর আমদানিতে শুল্ক ছাড় এবং ফল আমদানিতে করব্যবস্থা সহজ করার দাবি জানিয়েছেন আমদানিকারকেরা। তবে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। খেজুরের শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাবটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে আলোচনা করে বিবেচনা করা হবে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রমজান সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি প্রস্তুতি, সরবরাহ পরিস্থিতি ও মূল্য পর্যালোচনায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। বৈঠকে ব্যবসায়ীরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার কারণে পণ্য পরিবহন জটিল হয়ে পড়েছে। বিকল্প পথে আমদানি করতে গিয়ে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়ছে। পাশাপাশি ঋণপত্র (এলসি) খোলার জটিলতা অব্যাহত থাকলে বাজারে পণ্য সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটতে পারে।
আমদানিকারকদের হিসাবে, খেজুর আমদানিতে বর্তমানে প্রায় ৫৫ শতাংশ শুল্ক ও কর দিতে হয়। এর সঙ্গে উচ্চ শুল্কায়নমূল্য ও পরিবহন ব্যয় যুক্ত হওয়ায় আমদানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তাদের দাবি, খেজুরের প্রকৃত মান ও বাজারমূল্য বিবেচনায় নিয়ে শুল্ক নির্ধারণ করা হলে আমদানি ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।
বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, মিসর, সৌদি আরব, ইরাক ও আলজেরিয়াসহ প্রায় এক ডজন দেশ থেকে বিভিন্ন মানের খেজুর আমদানি হয়। ফলে সব ধরনের খেজুরের জন্য একই শুল্কায়নমূল্য নির্ধারণ করলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। জাত, মান ও দামের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ ও যৌক্তিক শুল্ক কাঠামো নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। খেজুর আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক ছাড়ের সুবিধা দ্রুত কার্যকরের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
রমজানের পণ্য আমদানি বেড়েছে
বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বেড়েছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ২৩ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার টন। এ সময়ে ভোজ্যতেল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৮ লাখ ৫ হাজার টনের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ লাখ ৩১ হাজার টন বেশি।
একই সময়ে চিনি আমদানি হয়েছে ৬ লাখ ৮৭ হাজার টন, যা আগের বছরের তুলনায় ১ লাখ ৫৩ হাজার টন বেশি। চিনি আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৮ লাখ ১০ হাজার টনের।
রমজানে ইফতারের অন্যতম প্রধান উপকরণ ছোলার আমদানিতে আরও বড় প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ছোলা আমদানি হয়েছে ৮২ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল মাত্র ১২ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৭০ হাজার টন। এ সময়ে ছোলা আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার টনের।
এ ছাড়া মসুর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৪ হাজার টন বেশি। মসুর ডাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার টনের। অন্যদিকে খেজুর আমদানি হয়েছে ১১ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের ৪ হাজার টনের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।
ছোট ডাল মিল নিয়ে উদ্বেগ
রমজানে ছোলা ও মসুর ডালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দাম স্থিতিশীল রাখতে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে বড় ব্যবসায়ীদের প্রভাবের কারণে ছোট ডাল মিলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না বলে অভিযোগ করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বাংলাদেশ ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী নেসার উদ্দিন জানান, দেশে ছোলার চাহিদা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। অন্যদিকে মসুর ডালের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানি করে পূরণ করতে হয়। বড় ব্যবসায়ীদের কারণে সাধারণ ডাল মিলগুলোর ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ সমস্যা সমাধানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বৈঠকে জানানো হয়, বর্তমানে ছোলা ও মসুর ডাল আমদানিতে কোনো শুল্ক-কর নেই। তবে চিনি ও ফল আমদানির বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো যৌক্তিকভাবে সমন্বয় করা গেলে বাজারে দাম সহনীয় রাখতে সহায়তা হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল ও ছোলার দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও মসুর ডালের দাম কমেছে বলে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
ডিম-মুরগির সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার আশা
বৈঠকে পোল্ট্রি খাতের প্রতিনিধিরা জানান, দেশে ডিম ও মুরগির উৎপাদন পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে। খামার পর্যায়ে ডিমের দাম কিছুদিন আগের প্রতিটি সাড়ে ১১ টাকা থেকে কমে ১০ টাকার নিচে নেমেছে, যা উৎপাদন খরচের কাছাকাছি। খামারগুলোতে রোগবালাইয়ের উল্লেখযোগ্য প্রাদুর্ভাব না থাকায় উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা করছেন না তারা।
তবে রমজানে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে ডিমের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। ঈদের পর মুরগির চাহিদা বাড়লে বাজারদরেও প্রভাব পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিদ্যমান আমদানি নীতি অনুযায়ী, সরকারের বিশেষ অনুমতি ছাড়া ডিম ও মাংস আমদানি করা যায় না।
রমজানে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল, খেজুর, মুরগি ও ডিমের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে ইফতারসামগ্রী তৈরিতে ছোলা, চিনি ও ভোজ্যতেলের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। এ কারণে আগাম আমদানি, পর্যাপ্ত মজুত ও নির্বিঘ্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছে সরকার।
বৈঠকে ব্যবসায়ীদের সময়মতো পণ্য আমদানি এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার আহ্বান জানানো হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছে সরকার। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠন, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন, এনবিআর, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, এফবিসিসিআইসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
রমজানের আগে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব
উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানিতে এগোচ্ছে বাংলাদেশ
অর্থজগত প্রতিবেদন
আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর কাছে উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পোশাকের নির্ভরযোগ্য উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে। সাধারণ টি-শার্ট, শার্ট ও ট্রাউজারের মতো মৌলিক পোশাকের পাশাপাশি এখন জ্যাকেট, স্যুট, ব্লেজার, বিয়ের পোশাক এবং টেকনিক্যাল অ্যাপারেল তৈরি করছেন দেশের রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো। গত কয়েক বছরে বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কার্যাদেশ বৃদ্ধি পাওয়ায় পোশাকশিল্পের এ নতুন সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একসময় কম দামের পোশাকের উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ এখন প্রিমিয়াম পণ্যের বাজারেও অবস্থান শক্ত করছে। জার্মানির উচ্চমূল্যের পোশাকের ব্র্যান্ড হারকো গত ছয় মাস ধরে টিম গ্রুপের একটি কারখানায় পোশাক তৈরি করছে। একই সময়ে ডেনমার্কের বেস্টসেলার গ্রুপের মালিকানাধীন স্পেনভিত্তিক ব্র্যান্ড বালমোহকও বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় কারখানায় বটম প্যান্টসহ বিভিন্ন পণ্যের কার্যাদেশ দিয়েছে।
শুধু নতুন ব্র্যান্ড নয়, আগে থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা করছে—এমন আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও উচ্চমূল্যের পোশাকের কার্যাদেশ বাড়াচ্ছেন। রপ্তানিকারকদের তথ্যমতে, গত চার-পাঁচ বছরে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বাজারে এ ধরনের পোশাকের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের উৎপাদকদের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহও বেড়েছে। এনগেলবার্ট স্ট্রস, শোফেল, স্কট, কারহার্ট, মন্টবেল, ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট ও ৫.১১ ট্যাকটিক্যালের মতো ব্র্যান্ড সরাসরি কিংবা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বাংলাদেশের কারখানা থেকে পোশাক সংগ্রহ করছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক শেখ মুস্তাফিজের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে উচ্চমূল্যের পোশাকের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত অন্তত ২০টি নতুন ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে কার্যাদেশ দেওয়া শুরু করেছে। তবে ব্যবসায়িক গোপনীয়তার কারণে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ডের কার্যাদেশের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয় না।
বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানিতে উচ্চমূল্যের পণ্যের প্রকৃত অংশ কত, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে শিল্পোদ্যোক্তাদের ধারণা, গত এক দশকে এ ধরনের পোশাকের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিজিএমইএর সহসভাপতি মিজানুর রহমানের মতে, এক দশক আগে দেশের মোট পোশাক রপ্তানিতে প্রিমিয়াম পণ্যের হিস্যা ছিল প্রায় ৩ শতাংশ, যা বর্তমানে প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, কয়েকজন উদ্যোক্তার হিসাবে এ হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ, এমনকি ২০ শতাংশের কাছাকাছি হতে পারে।
বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণে দেখা যায়, আউটারওয়্যার, ড্রেসেস, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল ওয়্যার ও স্যুটের মতো উন্নত পোশাক ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ ছিল। অথচ একই সময়ে আন্তর্জাতিক তৈরি পোশাক বাজারে এসব পণ্যের সম্মিলিত হিস্যা ছিল ৩০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ, বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যের পোশাকের যে চাহিদা রয়েছে, তার তুলনায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো অনেক কম।
শেখ মুস্তাফিজের হিসাবে, এক দশক আগে বাংলাদেশ প্রায় ২০০ কোটি ডলারের উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানি করত। বর্তমানে সেই অঙ্ক ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট পোশাক রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৩৮৭০ কোটি ডলার। এর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ উচ্চমূল্যের পোশাকের হিস্যা হলে এ খাত থেকে আয় দাঁড়ায় প্রায় ৩৮৭ কোটি থেকে ৫৮১ কোটি ডলার।
উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে দেশের বেশ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী ইতিমধ্যে সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। টিম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বছরে প্রায় ১২ কোটি ডলারের জ্যাকেট ও বিভিন্ন ধরনের আউটারওয়্যার রপ্তানি হয়। এর প্রায় ৬০ শতাংশই প্রিমিয়াম পণ্য। গ্রুপটির মোট বার্ষিক রপ্তানি আয় ৩০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। টমি হিলফিগার, কেলভিন ক্লেইন, এনগেলবার্ট স্ট্রস, শোফেল, স্কট, কারহার্ট ও মন্টবেলের মতো ব্র্যান্ডে তাদের কারখানায় তৈরি পোশাক সরবরাহ করা হয়।
আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে অবস্থিত ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেড মূলত বিয়ের পোশাক তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটির তৈরি ব্রাইডাল ড্রেসের আন্তর্জাতিক খুচরামূল্য ৪০০ থেকে ১০০০ ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি পোশাক রপ্তানি করেছে, যার প্রায় পুরোটাই উচ্চমূল্যের পণ্য।
অন্যদিকে, এনার্জি প্যাক ফ্যাশনস লিমিটেডের বার্ষিক প্রায় ১০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানির ৯০ শতাংশই স্যুট ও ব্লেজার। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হুমায়ুন রশীদের তথ্যমতে, তাদের তৈরি কোনো কোনো ব্লেজারের খুচরামূল্য ৯০০ ইউরো পর্যন্ত। ইতালির ক্রেতারাও নিজস্ব নকশা ও কাপড় ব্যবহার করে বাংলাদেশের কারখানায় বিশেষায়িত পোশাক তৈরি করাচ্ছেন।
এ ছাড়া ইয়ংওয়ান করপোরেশন, ডিবিএল গ্রুপ, স্নোটেক্স, এপিলিয়ন, এসকিউ গ্রুপ, স্কয়ার, উর্মি, ইউনিভার্সাল, ফকির গ্রুপ ও অনন্ত গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠান উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে যুক্ত রয়েছে। দেশে প্রায় তিন হাজার রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা থাকলেও এর মধ্যে কতটি উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরি করে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, এ ধরনের কারখানার সংখ্যা ১০০-এর বেশি হতে পারে।
উদ্যোক্তাদের মতে, উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে ব্যবসায়িক মুনাফার চাপ। শ্রমিকের মজুরি, কাঁচামাল, জ্বালানি ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ পোশাকে প্রতিযোগিতামূলক দামে ব্যবসা করা কঠিন হচ্ছে। অনন্ত গার্মেন্টসের পরিচালক রিজওয়ান জাহির খানের মতে, সাধারণ পোশাকে মুনাফার হার ২ থেকে ৩ শতাংশে ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিপরীতে, প্রিমিয়াম পোশাকে ১০ শতাংশ বা তার বেশি মুনাফার সুযোগ রয়েছে।
উচ্চমূল্যের পোশাকের ক্ষেত্রে উন্নত মানের কাপড়, বিশেষায়িত উপকরণ, জটিল সেলাই, উন্নত ফিনিশিং ও নিখুঁত টেইলারিংয়ের প্রয়োজন হয়। ফলে এসব পণ্য উৎপাদনে কারিগরি দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কোনো বিশেষায়িত জ্যাকেটে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক ফাইবারের দাম প্রতি কেজিতে ১২০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যেখানে সাধারণ ফাইবারের দাম অনেক কম।
শুধু উৎপাদনমূল্য দিয়ে অবশ্য কোনো পোশাককে উচ্চমূল্যের বলা যায় না। ব্র্যান্ডের পরিচিতি, বাজারে পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং উৎপাদনে প্রয়োজনীয় শ্রমঘণ্টাও বিবেচনায় নেওয়া হয়। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রচলিত ধারণায়, আন্তর্জাতিক বাজারে ৫০ ডলারের বেশি খুচরামূল্যের পোশাককে অনেক ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে ব্র্যান্ডভেদে এ সংজ্ঞা ও মানদণ্ডে পার্থক্য রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে চীন, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ উচ্চমূল্যের পোশাকের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। তবে এসব দেশে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল গ্রহণ বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনতে গিয়ে ক্রেতারা এখন বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র খুঁজছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি রাজনৈতিক সমাবেশে পরা স্যুট বাংলাদেশের অনন্ত গ্রুপের কারখানায় তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কারখানার মালিকপক্ষ দাবি করেছে। একইভাবে, গত এপ্রিলে চাঁদ প্রদক্ষিণ করা মার্কিন নভোচারীদের পোশাকও বাংলাদেশের একটি কারখানায় তৈরি হয়েছিল বলে মালিকপক্ষ জানিয়েছে। এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিশেষায়িত পোশাক তৈরির সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।
তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। উচ্চমানের কাঁচামালের জন্য আমদানিনির্ভরতা, দক্ষ জনবলের ঘাটতি, উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের কম দামের পোশাক উৎপাদনকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ভাবমূর্তি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলতে মান নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো পণ্য সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখাও জরুরি।
রপ্তানিকারকদের মতে, বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে পরীক্ষামূলক কার্যাদেশ দিয়ে সন্তুষ্ট হওয়া আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের একটি অংশ এখন ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে। এতে ভবিষ্যতে উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সাধারণ পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিশেষায়িত ও প্রিমিয়াম পণ্যে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প শুধু রপ্তানি আয়ই বাড়াবে না, বৈশ্বিক বাজারে নিজের অবস্থানও আরও শক্তিশালী করতে পারবে।
বাংলাদেশে ৬৩৫ কোটি ডলারের জাপানি বিনিয়োগের উদ্যোগ
অর্থজগত প্রতিবেদন
বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে ৬৩৫ কোটি মার্কিন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিয়েছে জাপান। এ বিনিয়োগের আওতায় গাড়ি উৎপাদন, অন্যান্য শিল্প খাত এবং জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রগুলো গুরুত্ব পেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণের আলোচনায় এ উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
জাপানের সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার গত ২২ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ১ লাখ কোটি ইয়েনের বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করার বিষয়ে সম্মত হতে পারে জাপান। বর্তমান হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৬৩৫ কোটি মার্কিন ডলার। তবে বিনিয়োগ পরিকল্পনার চূড়ান্ত রূপরেখা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
চার দিনের সরকারি সফরে সোমবার সকালে টোকিও পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এ সফরে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রস্তাবিত বিনিয়োগ পরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশের গাড়ি উৎপাদন ও অন্যান্য উৎপাদনশিল্পে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণেও বিনিয়োগ আসতে পারে। বাংলাদেশে জাপানের সংশ্লিষ্টতায় গড়ে ওঠা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণও এ উদ্যোগের অংশ হতে পারে।
বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে জাপানি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সুমিতোমো করপোরেশনসহ বিভিন্ন পক্ষ যুক্ত রয়েছে। এসব অঞ্চলে নতুন বিনিয়োগ এলে শিল্পকারখানা স্থাপন, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য পণ্য তৈরির সুযোগ সম্প্রসারিত হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে বিনিয়োগ গুরুত্ব পাবে
সফরসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠক শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে যৌথ বিবৃতি দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া মধ্যাহ্নভোজেও অংশ নেবেন তিনি।
বৈঠকে দুই দেশের বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং উন্নয়ন সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও আলোচনায় স্থান পেতে পারে।
সফরকালে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। মিতসুই অ্যান্ড কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন ও জেরা-সহ জাপানের বড় শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তার আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এসব বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা, অর্থায়ন, শিল্প অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থায়ন ও নীতিগত সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে প্রস্তাবিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ সুগম হতে পারে।
ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়াতে অর্থনৈতিক ফোরাম
টোকিওতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এতে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা অংশ নেবেন। এ আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ, উৎপাদনশিল্পের সম্ভাবনা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়গুলো তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
বুধবার ইউনিক্লোর প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন এবং প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সফরের শেষ দিন বৃহস্পতিবার নাগোয়া শহরে টয়োটা মোটর করপোরেশনের মোটোমাচি কারখানা পরিদর্শন করবেন তিনি। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাপানের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সই হওয়া অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিও (ইপিএ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চুক্তিটির কার্যকর বাস্তবায়ন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার করা এ সফরের অন্যতম লক্ষ্য।
প্রস্তাবিত বিনিয়োগ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উৎপাদনশিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে গাড়ি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়লে শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক উৎপাদন নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ জনশক্তি, উন্নত অবকাঠামো এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে। জাপানের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পেলে তা বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়াচ্ছে বাংলাদেশ
অর্থজগত প্রতিবেদন
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে বাংলাদেশ। সংস্থাটির হিসাব বলছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৮৮৬ ডলার, যেখানে ভারতের ক্ষেত্রে তা হতে পারে ২ হাজার ৭৪৯ ডলার। তবে মাথাপিছু আয়ের এই অগ্রগতি সত্ত্বেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকে বাংলাদেশের সামনে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ।
মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে বাংলাদেশের এই অগ্রগতি গত দুই দশকে দেশের অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের প্রতিফলন। স্বাধীনতার পর নানা সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক পরিসরে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশ, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং শ্রমবাজারে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ এ অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সামগ্রিক অর্থনীতির আকারে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড়। কিন্তু জনসংখ্যার ভিত্তিতে গড় অর্থনৈতিক উৎপাদনের হিসাব করলে বাংলাদেশ এবার প্রতিবেশী দেশটির চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারে। তবে মাথাপিছু জিডিপি কোনো দেশের মানুষের প্রকৃত আয় কিংবা জীবনযাত্রার মানের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে না। এ ক্ষেত্রে আয়বণ্টন, পণ্য ও সেবার মূল্য, কর্মসংস্থান এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে অবশ্য দুই দেশের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। চলতি বছর ভারতের অর্থনীতি ৭ শতাংশ হারে বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিপরীতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে। অর্থাৎ মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও অর্থনীতির সামগ্রিক গতি ধরে রাখার ক্ষেত্রে দেশটি চাপের মুখে রয়েছে।
মূল্যস্ফীতিও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। প্রায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতির চাপে খাদ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবার মূল্য বিবেচনায় ভারতের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি। ফলে মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অগ্রগতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সমানভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দুই দেশের অবস্থানে ওঠানামার পর ২০২৯ সালের দিকে মাথাপিছু আয়ে ভারত আবারও বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
দুই দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত পার্থক্যও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের রফতানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে। পাশাপাশি রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। অন্যদিকে ভারতের অর্থনীতি প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা, শিল্প উৎপাদন এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর ভিত্তি করে তুলনামূলকভাবে বহুমুখী হয়ে উঠেছে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে দুই দেশের ওপর প্রভাবও ভিন্নভাবে পড়তে পারে।
এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে বিঘ্ন দুই দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক নৌপথে অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও পণ্য পরিবহনে ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তৈরি পোশাকের চালান পরিবহন ব্যয়বহুল হয়ে উঠলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও চাপে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের কাছে মাথাপিছু জিডিপি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এটি গড় হিসাবনির্ভর। দেশের সম্পদ ও আয় কতটা সুষমভাবে বণ্টিত হচ্ছে, কত মানুষের আয় বাড়ছে কিংবা মূল্যস্ফীতির কারণে কতটা ক্রয়ক্ষমতা কমছে—এসব বিষয় এই সূচক থেকে সরাসরি বোঝা যায় না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছানোও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
তাই মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক অর্জন হলেও একে অর্থনৈতিক সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং আয়বৈষম্য কমানোর ওপরই নির্ভর করবে এই অগ্রগতি সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা স্বস্তি নিয়ে আসবে।
জাপানে পোশাক রফতানিতে চার বছরের রেকর্ড
অর্থজগত প্রতিবেদন
জাপানের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিতে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক অর্থবছর ধরে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানিতে জাপানের অংশ প্রায় ৩ শতাংশের আশপাশে সীমাবদ্ধ থাকলেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তা বেড়ে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছেছে। গত চার বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ অংশ। সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান বলছে, জাপানের পোশাক আমদানির বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হলেও এ অগ্রগতি ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে জাপানে ৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছে বাংলাদেশ। এ সময়ে দেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৮ কোটি ডলার। এর মধ্যে জাপানের বাজারে রফতানির অংশ দাঁড়ায় ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ধারাবাহিকভাবে বাড়েনি। বরং কখনো প্রবৃদ্ধি, কখনো পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে এ খাত। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জাপানে ১১৫ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছিল বাংলাদেশ। পরের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ১০৯ কোটি ডলারে নেমে আসে।
তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রফতানিতে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চিত্র দেখা যায়। ওই অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১১৯ কোটি ডলারে পৌঁছায়। কিন্তু এ প্রবৃদ্ধি পরবর্তী অর্থবছরেও অব্যাহত থাকেনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাপানে পোশাক রফতানি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ১১৩ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।
একই সময়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক তৈরি পোশাক রফতানিতেও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলারে নেমে আসে। এর ফলে মোট রফতানিতে জাপানের অংশ কমে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৯৩ শতাংশে। সেই তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জাপানের বাজারের অংশ বেড়ে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছানোকে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের পোশাক রফতানির পাশাপাশি জাপানের সামগ্রিক আমদানিবাজারের আকারও দেশটির গুরুত্ব তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্রের (আইটিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে জাপান ২ হাজার ৪৯৬ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছিল।
পরবর্তী এক বছরে দেশটির পোশাক আমদানি ৭ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ২ হাজার ৩১৪ কোটি ডলারে নেমে আসে। তবে এরপর থেকে আমদানিতে পুনরুদ্ধারের প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাপানের পোশাক আমদানি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৩৯০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৪১৯ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে জাপান ৪০৫ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। অর্থাৎ, এক বছরের পতনের পর দেশটির পোশাক আমদানির বাজারে পুনরায় প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্য নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
তবে জাপানের সামগ্রিক পোশাক আমদানি বাড়লেই বাংলাদেশের রফতানি সমান হারে বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। দেশটির আমদানিবাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব বাড়াতে হলে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ, ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং রফতানি সক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, জাপানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির অংশ চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে একটি প্রান্তিকের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। আগামী প্রান্তিকগুলোতেও রফতানির এ ধারা বজায় থাকে কি না, সেটিই হবে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।
ঋণাত্মক জীবন তহবিলে ছয় বীমা কোম্পানি
অর্থজগত প্রতিবেদন
দেশের জীবন বীমা খাতে আর্থিক সংকট ও গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধে ব্যর্থতার চিত্র ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। চলতি ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ছয়টি জীবন বীমা কোম্পানির লাইফ ফান্ড বা জীবন তহবিল ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির জীবন তহবিলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১২০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, পুরো জীবন বীমা খাতে বকেয়া বীমা দাবির পরিমাণ ৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় গ্রাহকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে খাতটির আর্থিক দুর্বলতার এমন চিত্র। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
জীবন বীমা কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো লাইফ ফান্ড। পলিসি গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রিমিয়ামের অর্থ থেকে নির্ধারিত ব্যয় ও অন্যান্য দায় সমন্বয়ের পর ভবিষ্যতের বীমা দাবি পরিশোধের জন্য যে তহবিল সংরক্ষণ করা হয়, সেটিই জীবন তহবিলের মূল ভিত্তি। এ তহবিল ঋণাত্মক হয়ে পড়লে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়। বিশেষ করে মেয়াদপূর্তির অর্থ ও অন্যান্য বীমা দাবি পরিশোধে পর্যাপ্ত সম্পদ আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, জীবন তহবিলে সবচেয়ে বড় ঘাটতিতে রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির ঘাটতির পরিমাণ ১ হাজার ১২০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ঘাটতি ৩২৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৫৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা, শান্তা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা এবং যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৯৪ লাখ টাকা ঘাটতি রয়েছে।
এই হিসাব থেকে স্পষ্ট, সংকটটি কেবল একটি কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ছয়টি প্রতিষ্ঠানের জীবন তহবিল ঋণাত্মক পর্যায়ে পৌঁছানো খাতটির সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রক তদারকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের বিপুল ঘাটতি পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বকেয়া বীমা দাবির বড় বোঝা ফারইস্টের
জীবন তহবিলের ঘাটতির পাশাপাশি গ্রাহকদের বীমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থতাও খাতটির বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে জীবন বীমা খাতে মোট অনাদায়ী বা বকেয়া বীমা দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৩১০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের গ্রাহকদের। অর্থাৎ, পুরো খাতের বকেয়া দাবির প্রায় ৭৫ শতাংশই আটকে আছে কোম্পানিটির কাছে।
বিপুল পরিমাণ অর্থ দীর্ঘদিন আটকে থাকায় গ্রাহকদের দুর্ভোগ বাড়ছে। অনেকেই জীবনের সঞ্চয় দিয়ে বীমা পলিসি গ্রহণ করেছিলেন ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা, সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা অবসরকালীন প্রয়োজন মেটানোর আশায়। কিন্তু মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরও অর্থ না পাওয়ায় সেই প্রত্যাশা অনিশ্চয়তায় পড়েছে। দীর্ঘসূত্রতার কারণে গ্রাহকদের আর্থিক পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বীমার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও দুর্বল হচ্ছে।
বীমা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় গ্রাহককে সুরক্ষা দেওয়া। অথচ পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও পাওনা অর্থ না পেলে সেই সুরক্ষার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে কোনো কোম্পানির কাছে বিপুল পরিমাণ দাবি দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকলে নতুন গ্রাহক সংগ্রহ এবং পুরো খাতের ব্যবসায়িক পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
গ্রাহকদের আটকে থাকা অর্থ ফেরত দিতে আইডিআরএ বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। তিনটি ধাপে মোট ১৬ হাজার ৫৮ জন গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৬৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ৪ অক্টোবর তৃতীয় ধাপে ছয়টি বীমা কোম্পানির ৭ হাজার ৬৪১ জন গ্রাহকের অনুকূলে ২৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা হস্তান্তর করা হয়। এর আগে প্রথম দুই ধাপে ৮ হাজার ৪১৭ জন গ্রাহককে দেওয়া হয়েছিল ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
গ্রাহকদের পাওনা ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও বকেয়ার তুলনায় অর্থ পরিশোধের পরিমাণ অত্যন্ত কম। মার্চ শেষে বকেয়া দাবির পরিমাণ ৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকা ধরে হিসাব করলে বিতরণ করা ৬৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা মোট বকেয়ার মাত্র ১ দশমিক ৪৫ শতাংশের সমান। ফলে এই উদ্যোগে কিছু গ্রাহক তাৎক্ষণিক স্বস্তি পেলেও সামগ্রিক সংকট নিরসনে আরও বড় পরিসরে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বকেয়া দাবির বিপুল পরিমাণ এবং জীবন তহবিলের ঘাটতি বিবেচনায় শুধু ধাপে ধাপে সীমিত অর্থ বিতরণ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, প্রকৃত সম্পদ, দায় এবং বিনিয়োগের অবস্থা পর্যালোচনা করে অর্থ পরিশোধের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বীমা খাতের সংকট মোকাবিলায় প্রথমেই কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থার নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করতে হবে। কাগজে-কলমে দেখানো সম্পদ এবং বাস্তবে নগদায়নযোগ্য সম্পদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গ্রাহকদের দায় মেটানোর জন্য কোম্পানিগুলোর হাতে কী পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ রয়েছে, তার স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, আর্থিক অনিয়ম, জালিয়াতি কিংবা অব্যবস্থাপনার অভিযোগ থাকলে সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকটের দায় যেন শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকদের ওপর গিয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অন্যতম দায়িত্ব।
তৃতীয়ত, বকেয়া বীমা দাবি পরিশোধে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কোন কোম্পানি কত টাকা, কত সময়ের মধ্যে এবং কী প্রক্রিয়ায় পরিশোধ করবে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা হলে গ্রাহকেরা অন্তত তাঁদের পাওনা ফেরতের বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাবেন। পাশাপাশি নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ ও তদারকির মাধ্যমে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
বীমা খাতের এই সংকট শুধু কয়েকটি কোম্পানির হিসাবের ঘাটতি নয়; এটি সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। গ্রাহকদের অর্থ সময়মতো ফেরত দিতে ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে বীমার প্রতি আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে। তাই সাময়িক উদ্যোগের পাশাপাশি আর্থিক অনিয়ম প্রতিরোধ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গ্রাহকের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথম শর্তই হচ্ছে—গ্রাহকের পাওনা অর্থ ফেরত দেওয়া এবং সেই অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
আইপিওতে অনিয়মের অভিযোগ, বন্ধ ১৪ টেক্সটাইল কারখানা
অর্থজগত প্রতিবেদন
শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেও উৎপাদন ধরে রাখতে পারেনি দেশের একাধিক টেক্সটাইল কোম্পানি। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদনের সময় আর্থিক তথ্য যাচাই, স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কিছু কোম্পানি মুনাফার অতিরঞ্জিত তথ্য ও অসংগতিপূর্ণ আর্থিক বিবরণী উপস্থাপন করে শেয়ার বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পেয়েছিল। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা, দুর্বল হয়েছে বাজারের ওপর আস্থা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে ১৬টি টেক্সটাইল কোম্পানি মোট ২ হাজার ২০১ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০টির উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থাৎ, বাজার থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বড় একটি অংশ তাদের শিল্পকারখানার কার্যক্রম সচল রাখতে পারেনি।
শুধু নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোই নয়, সামগ্রিকভাবে টেক্সটাইল খাতের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। ডিএসইর ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী, শেয়ার বাজারে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া ৩৭টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে ১৪টিই টেক্সটাইল খাতের। বর্তমানে তালিকাভুক্ত ৫৮টি টেক্সটাইল কোম্পানির মধ্যে ১৪টির কারখানা পুরোপুরি বন্ধ। এ ছাড়া আরও ২৮টি প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকট ও অনিয়মের কারণে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে।
শেয়ার বাজারে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত হওয়া কোনো কোম্পানির আর্থিক ও পরিচালনাগত দুর্বলতার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। সাধারণত টানা দুই বছর লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হওয়া, নির্ধারিত সময়ে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজন না করা, ছয় মাসের বেশি সময় কারখানা বন্ধ থাকা কিংবা পরিশোধিত মূলধনের তুলনায় সঞ্চিত লোকসান বেশি হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে কোম্পানিকে এ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হয়। ফলে টেক্সটাইল খাতের ২৮টি প্রতিষ্ঠানের এ অবস্থান বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের অভিযোগ, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তালিকাভুক্ত হওয়া অনেক টেক্সটাইল কোম্পানি বাজারে আসার সময় প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন মুনাফা ও আর্থিক বিবরণী উপস্থাপন করেছিল। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যকর স্থায়ী কারখানা না থাকার অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানির তালিকাভুক্তির সময়কার নথি পর্যালোচনা করা হলে আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়ার দুর্বলতা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদের মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কিছু দুর্বল টেক্সটাইল কোম্পানি মূলত শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, তৎকালীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই এসব কোম্পানিকে অনুমোদন দিয়েছিল। এ ধরনের অনিয়মের কারণে উৎপাদন সক্ষমতা ও আর্থিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পায়।
একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন ডিএসইর চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিগত সরকারের সময়ে ডিএসইর পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো এবং কয়েকটি কোম্পানির দুর্বল আর্থিক বিবরণী সম্পর্কে সতর্ক করা হলেও তৎকালীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেগুলোকে তালিকাভুক্তির অনুমতি দিয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক দুর্বল পারফরম্যান্স বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো নয়, সামগ্রিক শেয়ার বাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে আইপিও অনুমোদন ও তালিকাভুক্তির নিয়মে সাম্প্রতিক সময়ে সংস্কার এবং তদারকি বাড়ানোর ফলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তবে টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে শুধু তালিকাভুক্তির সময়কার অনিয়ম বা দুর্বল ব্যবস্থাপনাই দায়ী নয় বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) এক কর্মকর্তার ব্যাখ্যায়, কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্পের যন্ত্রাংশের উচ্চমূল্য, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দা উৎপাদন কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এসব কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চলতি মূলধনের সংকট। কাঁচামাল কেনা, শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ, জ্বালানি ব্যয় নির্বাহ এবং নিয়মিত উৎপাদন চালিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সংকুচিত হচ্ছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও ঋণের দায়, সুদ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করতে হওয়ায় সংকট আরও গভীর হচ্ছে। ফলে যেসব কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি আগে থেকেই দুর্বল ছিল, তাদের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরকার বন্ধ ও নিষ্ক্রিয় শিল্পকারখানা পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ তহবিলের ঘোষণা দিলেও বাস্তবে এর সুবিধা পাওয়া নিয়ে জটিলতা রয়েছে। ব্যাংকগুলোর কঠোর ঋণশর্ত এবং অর্থায়নে অনীহার কারণে অনেক উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় ঋণ পাচ্ছেন না। অথচ পর্যাপ্ত চলতি মূলধন ও কার্যকর পুনর্বাসন সহায়তা ছাড়া বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা এবং উৎপাদন সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা কঠিন।
বিশ্লেষকদের মতে, টেক্সটাইল খাতের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দুটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, অতীতে যেসব কোম্পানির আইপিও অনুমোদন ও তালিকাভুক্তি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর আর্থিক বিবরণী, তহবিল ব্যবহারের তথ্য এবং প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতা রয়েছে কিন্তু জ্বালানি, কাঁচামাল ও অর্থায়ন সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত—এমন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আইপিও অনুমোদনের আগে কোম্পানির সম্পদ, উৎপাদন সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ, ঋণের পরিমাণ, নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ও সংগৃহীত অর্থের সম্ভাব্য ব্যবহার কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে।
টেক্সটাইল খাতের সংকট তাই কেবল কয়েকটি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুঁজি বাজারের জবাবদিহি, শিল্পায়নের টেকসই ভিত্তি এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার প্রশ্ন। অতীতের অনিয়মের কার্যকর তদন্ত, তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাস্তবসম্মত অর্থায়ন নিশ্চিত করা না গেলে এ খাতের সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নিরাপত্তা ঝুঁকি কাটিয়ে চালু হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট
অর্থজগত প্রতিবেদন
পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষার দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর সম্ভাব্য সাইবার হামলার ঝুঁকি এড়াতে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট পুনরায় চালু করা হয়েছে। রোববার (২৫ অক্টোবর) সকাল ৮টা থেকে ওয়েবসাইটটি সচল হয়। নিরাপত্তাঝুঁকি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পর এটি চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, জরুরি নিরাপত্তাজনিত কারণে বৃহস্পতিবার থেকে ওয়েবসাইটটি বন্ধ রাখা হয়েছিল। ঝুঁকি বিশ্লেষণ শেষে রোববার সকালে এটি আবার চালু করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত করা এবং তা সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিবিদরা কাজ করছেন। পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষায় শনাক্ত হওয়া ত্রুটির কারণে শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক নয়, একই প্রযুক্তিতে তৈরি আরও কয়েকটি ব্যাংকের ওয়েবসাইটও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিএইচপির এই নিরাপত্তা ত্রুটিগুলো কাজে লাগিয়ে সাইবার অপরাধীরা পাসওয়ার্ড ছাড়াই দূর থেকে সার্ভারে অননুমোদিত নির্দেশনা কার্যকর করার সুযোগ পেতে পারে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট সার্ভারের ফাইল, ডেটাবেজ এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অননুমোদিত ব্যক্তিদের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এমনকি নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে ইউরোপের কয়েকটি দেশও। ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্য সাইবার হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে বলে এএফপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশের সরকারি ওয়েবসাইটগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে অ্যাসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই) প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ন্যাশনাল পোর্টাল ফ্রেমওয়ার্কের আওতাধীন প্রায় ৩৬ হাজার ৫০০টি ওয়েবসাইট পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষায় তৈরি নয়। ফলে পিএইচপির এই নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে ওই ওয়েবসাইটগুলো সরাসরি ঝুঁকিতে পড়ার কথা নয়।
তবে প্রযুক্তিবিদদের মতে, কোনো ওয়েবসাইট নির্দিষ্ট একটি নিরাপত্তা ত্রুটির আওতামুক্ত হলেই সেটিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করার সুযোগ নেই। নিয়মিত সফটওয়্যার হালনাগাদ, সার্ভারের নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং অননুমোদিত প্রবেশ ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
এ কারণে বিজিডি ই-গভ সার্ট সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহৃত পিএইচপি সংস্করণ যাচাই, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা হালনাগাদ এবং ঝুঁকি বিবেচনায় সার্ভারে প্রবেশাধিকার সীমিত করার পরামর্শ দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইটে নিরাপত্তার ঘাটতি তৈরি হলে শুধু অনলাইন সেবা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিই থাকে না, বরং গ্রাহকের তথ্য ও প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল অবকাঠামোও হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই সাময়িকভাবে ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা কিংবা পুনরায় চালু করার পাশাপাশি নিরাপত্তার দুর্বলতা স্থায়ীভাবে দূর করা এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, টানা তৃতীয় সপ্তাহে বাড়ল তেলের দাম
অর্থজগত প্রতিবেদন
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাতের বিস্তার এবং সৌদি আরবে হুথিদের ধারাবাহিক হামলার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এর প্রভাবে টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো বেড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এশিয়ার পাশাপাশি ইউরোপের অর্থনীতি ও পুঁজি বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের সরবরাহ আরও বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শুক্রবার বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম অন্তত ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৬ দশমিক ৭২ ডলার ছাড়িয়ে যায়। আগের সপ্তাহে এ জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ, যা দুই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ সাপ্তাহিক বৃদ্ধি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, তেলের এ দাম গত মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
চলমান সংঘাতের প্রভাবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে যৌথ হামলা শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অপরিশোধিত তেলের প্রধান মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। শুক্রবার এ তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৩ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা জ্বালানি সরবরাহের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবে হুথিদের ধারাবাহিক হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এ অঞ্চলে সংঘাত বিস্তৃত হলে তেল উৎপাদন, পরিবহন ও রফতানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রেও। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার পরিচালন ব্যয় এবং পণ্য উৎপাদনের খরচ বেড়ে যায়। এর ফলে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে, কারণ বাড়তি দামে তেল কিনতে তাদের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হবে।
এদিকে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে ইউরোপের পুঁজি বাজারেও। দ্য আইরিশ টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার লেনদেনের শুরুতে ইউরোপের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক স্টক্স ৬০০ দশমিক ১৩ শতাংশ কমে যায়। এর আগের দিন বৃহস্পতিবারও সূচকটিতে তিন সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন হয়েছিল। ধারাবাহিক দরপতনের কারণে সপ্তাহজুড়ে ইউরোপের শেয়ারবাজারে দুর্বল প্রবণতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ইউরোপের শিল্প ও পরিবহন খাতের ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়ে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন।
অন্যদিকে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দেশটির সরকারের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স জানিয়েছে, রাশিয়ায় পেট্রল ও ডিজেলের উৎপাদন বেড়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানির মজুতও বাড়ছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি দেশটির জ্বালানি খাতে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ও ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান বিওকে ফাইন্যানশিয়াল সিকিউরিটিজের ট্রেডিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেনিস কিসলারের মতে, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ইরানে আরও তীব্র হামলার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অন্যতম বড় অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হলে তেলের সরবরাহে নতুন বাধা সৃষ্টি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে আমদানিনির্ভর অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যয় ও পুঁজি বাজারে। তাই আগামী দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের গতিপ্রকৃতি অনেকাংশেই নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বিস্তার এবং সরবরাহ পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক থাকে তার ওপর।
ফোন স্লো হলেই বারবার রিস্টার্ট নয়
অর্থজগত ডেস্ক
স্মার্টফোন ধীরগতিতে কাজ করলে বা হ্যাং হয়ে গেলে অনেকেই দ্রুত রিস্টার্ট করেন। এতে সাময়িকভাবে সমস্যার সমাধানও হতে পারে। তবে বারবার রিস্টার্ট করলেই যে ফোনের গতি বাড়বে, এমন নয়। বরং স্টোরেজের ঘাটতি, পুরোনো সফটওয়্যার, ব্যাটারির সমস্যা কিংবা হার্ডওয়্যারের ত্রুটির কারণে ফোন ধীরগতির হলে রিস্টার্টে স্থায়ী সমাধান পাওয়া যায় না।
অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোন—উভয় ক্ষেত্রেই রিস্টার্টের মাধ্যমে অপারেটিং সিস্টেম নতুন করে চালু হয়। এ সময় চলমান অ্যাপ ও সাময়িক সিস্টেম প্রক্রিয়াগুলো বন্ধ হয়ে আবার শুরু হয়। ফলে কোনো অ্যাপ আটকে গেলে, ফোনের স্ক্রিন অস্বাভাবিক আচরণ করলে কিংবা সাময়িক সফটওয়্যার ত্রুটি দেখা দিলে রিস্টার্ট কার্যকর হতে পারে। কিন্তু এটি ফোনের প্রসেসরের ক্ষমতা বাড়ায় না কিংবা সব ধরনের সমস্যার সমাধান করে না।
ফোনের গতি কমে গেলে প্রথমেই এর স্টোরেজ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ছবি, ভিডিও ও অপ্রয়োজনীয় ফাইলের কারণে জায়গা কমে গেলে অ্যাপ চালানো এবং বিভিন্ন সিস্টেম প্রক্রিয়ায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া অতিরিক্ত মেমোরি ব্যবহারকারী অ্যাপ, পুরোনো সফটওয়্যার এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে ব্যাটারির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়াও ফোনের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পুরোনো মডেলের ফোনে আধুনিক ও ভারী অ্যাপ ব্যবহারের সময় ধীরগতি বেশি অনুভূত হতে পারে।
ফোনের কার্যক্ষমতা স্বাভাবিক রাখতে অপ্রয়োজনীয় ফাইল মুছে পর্যাপ্ত স্টোরেজ খালি রাখা, অব্যবহৃত অ্যাপ আনইনস্টল করা এবং অপারেটিং সিস্টেম ও অ্যাপ নিয়মিত হালনাগাদ করা জরুরি। কোনো নির্দিষ্ট অ্যাপ ব্যবহারের সময় ফোন ধীর হয়ে গেলে সেটি আপডেট করা বা অ্যাপের ক্যাশ পরিষ্কার করেও উপকার পাওয়া যেতে পারে। তবে ক্যাশ পরিষ্কার করার সঙ্গে অ্যাপের সব ডেটা মুছে ফেলার পার্থক্য রয়েছে, তাই সেটিংস পরিবর্তনের আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
সাধারণভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী ফোন রিস্টার্ট করলে ক্ষতির আশঙ্কা নেই। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ফোন রিস্টার্ট করতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। কোনো সমস্যা দেখা দিলে একবার রিস্টার্ট করে দেখা যেতে পারে। কিন্তু এরপরও ফোন বারবার হ্যাং করলে বা ধীরগতির সমস্যা অব্যাহত থাকলে ব্যাটারি, সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের অবস্থা পরীক্ষা করা উচিত। প্রয়োজনে অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
মূল কথা, রিস্টার্ট সাময়িক সফটওয়্যার সমস্যা কাটাতে সহায়তা করে, কিন্তু ফোন ধীরগতির হওয়ার সব কারণ দূর করতে পারে না। তাই বারবার রিস্টার্ট না করে সমস্যার উৎস শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই স্মার্টফোনের কার্যক্ষমতা বজায় রাখার কার্যকর উপায়।

